বিশ্বকাপ স্কোয়াড এনালাইসিসঃ সুইডেন

বিশ্বকাপ স্কোয়াড এনালাইসিসঃ সুইডেন

বর্তমান র‍্যাংকিং এর ২৩ নং দল। ২০০৬ এর পর বিশ্বকাপ খেলছে তারা, দলে নেই ইব্রাহিমোভিচের মতো তারকা। কিন্তু ইব্রা দলের বাইরে থাকার পর যেন দল আরো উজ্জীবিত হয়েছে। হ্যামসেনের আন্ডারে এক বয়স্ক দল নিয়ে স্লো , স্ট্রাগল করা দল আর নেই, এখন তারা তারুন্য আর টিমস্পিরিটে উজ্জীবিত চকচকা একটা দল। তাই ইব্রা যখন ঘটা করে তার অবসর ভেঙ্গে ফেরার ঘোষণা দেন কোচ ইয়ান অ্যান্ডারসন সাফ জানিয়ে দেন যে তার সিদ্ধান্ত কাকে তিনি দলে নেবেন আর কাকে বাইরে রাখবেন, তাই ইব্রাকে এখন ভিসার ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর হয়েই ওয়ার্ল্ড কাপে থাকতে হচ্ছে।

 

ইব্রাকে ছাড়াই সাজানো গোছানো একটা দল। দলে আছেনঃ

গোল্কিপারঃ রব ওলসেন(কোপেনহেগেন), কার্ল জোহান জোহানসন(গুইঙ্ক্যাম্প, ফ্রান্স), ক্রিস্টফ নর্ডফেল্ডট(সোয়ান্সি)

ডিফেন্ডারঃ মাইকেল লুস্তিগ(সেল্টিক), ভিক্টর লিন্ডেলফ(ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড), আন্দ্রেয়াস গ্রাঙ্কভিস্ট( ক্রাস্নোডার,রাশিয়া), মার্টিন ওলসন( সোয়ান্সি) , লুডভিগ অগাস্টিন্সন( ভার্ডার ব্রেমেন), ফিলিপ হেলান্ডার(বোলোনিয়া), পন্টাস ইয়ানসন( লীডস ইউনাইটেড), এমিল ক্রাফথ( বোলোনিয়া)

 

মিডফিল্ডারঃ এমিল ফোর্সবার্গ( রেডবুল লাইপজিগ), আল্বিন একদাল(হাম্বুর্গ), ভিক্টর ক্লেসন(ক্রাস্নোডার, রাশিয়া), গুস্তাভ সভেনসন( সিয়াটল সাউন্ডার্স, আমেরিকা), সেব লারসন(হাল সিটি), জিমি ডুরমাজ(টুলোজ), অস্কার হিলিয়েমার্ক( জেনোয়া), মার্কাস রোডেন( ক্রোটন)

 

ফরোয়ার্ডঃ মার্কাস বার্গ(আল আইন, ইউএই), ওলা তোইভোনেন(টুলোজ), জন গিডেট্টি(সেল্টা ভিগো), আইজাক কিসেথেলিন( ওয়াসল্যান্ড বেভেরেন), বেলজিয়াম

প্রথমে গোল্কিপিং। খুব একটা আশাব্যাঞ্জক নয়। কারণ ফার্স্ট চয়েস গোল্কিপার ইঞ্জুরি থেকে ফিরেছেন। কিন্তু এই ৬ ফুট ৬ ইঞ্চের বিশালদেহীকেই গোলবারের দায়িত্ব নিতে হবে। নর্ডফেল্ডট এবার সোয়ান্সি এর হয়ে ম্যাচ পাননি খুব একটা।

রাইটব্যাকে লুস্তিগ স্টার্টার, কিন্তু তার গরম মাথা কিছু পুওর জাজমেন্ট এর কারণ হতে পারে। তার ব্যাকাপ হয়ে থাকবেন এমিল ক্র্যাফথ।

লেফটব্যাকে অগাস্টিনসন অটো চয়েজ। রেগুলার স্টার্ট করেন। বুন্দেসলীগায় খেলেন বলে জার্মান দর্শন সম্পর্কে আইডিয়া আছে তার। এ পজিশনে সোয়ান্সির ওলসেনও আছেন। সোয়ান্সির হয়ে মাঝ সিজনে রেগুলার ছিলেন।

 

সেন্টারব্যাকে একজন নেতা আছেন, গ্রাঙ্কভিস্ট। অ্যান্ডারসনের যেকোনো ট্যাক্টিক্স এর সাথে মানিয়ে নিতে প্রস্তুত। ইতালীকে প্লেঅফে বাদ করানোর জন্য ইনি আংশিক দায়ী। লিন্ডেলফকে নিয়ে একটা ডিফেন্সিভ দূর্গ দাঁড় করেন, ইতালীয়ানদের সাথে ইতালীয়ান ট্যাকটিক্স খাটান অর্থাৎ কাতানেচ্চিও ধারায় খেলিয়ে অ্যান্ডারসন ইতালিয়ান অ্যাটাককে অকেজো করে দিয়েছিলেন। তার ক্রেডিট গ্রাঙ্কভিস্টকেই নিতে হবে , পজেশন ডোমিনেট আর রাফ ট্যাকল আর পজেশন ধরে রেখে শেষ পর্যন্ত ১-১ সমতায় রেখেছিলেন। ম্যাচ এক্সট্রা টাইমে সুইডেন জিতে নেয় ২-১ গোলে। নেদারল্যান্ডের সাথেও ড্র করে তারা ,পুরো ম্যাচে পজেশন রেখে আর সুইডেনের থেকে বেশি শট নিয়েও লাভ হয়নি নেদারল্যান্ডস এর। গ্র্যাঙ্কভিস্টই বিশ্বকাপে দলকে নেতৃত্ব দিবেন।

 

ডিফেন্সের আরেক সেনা লিন্ডেলফ। সলিড ইন ডিফেন্স, বেনফিকার হয়ে নজরকাড়া লিন্ডেলফ ম্যানইউ এর হয়ে দুঃস্বপ্নের একটা ডেব্যু সিজন কাটান। দলে নিয়মিত হতে পারেননি কিন্তু সুইডেনের হয়ে তার ফর্ম সমুজ্জ্বল। এই দুইজনের ব্যাকাপ হেলান্ডার আর ইয়ানসন। হেলান্ডার এর কথা আলাদা ভাবে বলতেই হয়। হেলাস ভেরোনার হয়ে ভালো খেলে বোলোনিয়াতে সুযোগ পেয়েছেন। লম্বা এবং ওয়েল ডিসিপ্লিন্ড, যেকোন বিপদ ঠান্ডা মাথা হ্যান্ডেল করেন। তবে এ বিশ্বকাপে লিন্ডেলফকে টপকিয়ে দলে সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা কম।

এবার আসি মিডফিল্ডের কথায়। সুইডেনের মূল শক্তি মিডফিল্ডে। They have the Force, Emil Forsberg । অ্যান্ডারসন সাধারণত ৪-৪-২ ফরমেশন বেশি খেলান, যেটাতেই তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। দলের মূল তারকা ফোর্সবার্গ। দারুন টেকনিকাল আর ক্রিয়েটিভ এবং সেট পিস স্পেশালিস্ট। লেফট এর থেকে কাটইন করেন আর কিছু কিলার পাস দিয়ে ডিফেন্স ভেদ করতে ওস্তাদ। গত সিজনে বুন্দেসলীগায় ২২ এসিস্ট আছে তার।

 

সেন্টার মিডফিল্ডে স্টার্ট করবেন অ্যালবিন একদাল, আর সেব লারসন। দলের আরেক স্তম্ভ সেব লারসন, ইএফেল কাপে হাল সিটির হয়ে ২ গোল ৫ এসিস্ট আছে তার ।ওয়েল ডিসিপ্লিন্ড, ঠান্ডা মাথায় পজেশন ধরে খেলেন, আর সেট পিসে ফোর্সবার্গের পাশাপাশি ইনিও আরেক অপশন। একদাল একটা বক্স টু বক্স মিডফিল্ডার, খুবই ভার্সেটাইল।খেলা শুরু হলে ডিফেন্সের থেকে বল নিয়ে এগুবেন, এটাকের সময় প্লেমেকিং করতে সামনে যাবেন ডিফেন্সের সময় বল আটকাবেন, এই কাজটা ভালো পারেন। চাইলে তাকে রাইটমিডেও খেলানো যাবে। কিন্তু তার দরকার হবে না। রাইটমিডে ফোর্সবার্গের ব্যাকাপ হিসেবে দাড়াতে পারেন রোডেন । একদালে যদিও কিছুটা ইঞ্জুরিপ্রবণ, জুভেন্টাস ক্যারিয়ার খুব বেশি লম্বা হয়নি এই কারনে। তবে কোয়ালিফাইং এর ৭ ম্যাচ খেলেছেন। রাশিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচ খেলতে পারেননি ইঞ্জুরি এর কারণে। সেন্টারমিডে সভেনসন সুযোগ পেলে একদালের বদলে পাবেন । আর লারসনের ব্যাকাপে সুযোগ পাবেন হিলিয়েবার্গ।

লেফটমিডে ফিক্সড চয়েজ ক্লেসন। এসিজনে প্রিমিয়ার লীগায় ক্রাসনোডারে হয়ে ১০ গোল ৮ এসিস্ট আছে তার। তার ব্যাকাপে থাকবেন ডুরমাজ। টুলোজের হতে ৩ গোল ১ এসিস্ট।

 

এটাকে ইব্রাহিমোভিচ নেই। তাই শক্তি কম বলাই যায়। ৩১ বছর বয়সী মার্কাস বার্গ তার প্রথম বিশ্বকাপ খেলছেন, তবে কোয়ালিফাইং এ ৮ গোল করেছে। তার পাশে দাড়াবেন ওলা তোইভোনেন। খুব বেশি ভরসা জাগানিয়া এটাক নয়, তবে এই তোইভোনেনই ইতালীর বিপক্ষে ইঞ্জুরিটাইমে গোল করে জয় তুলে নেন , সুতরাং বিপদ ঘটাতে দেরী করবে না এই এটাক।

 

তোইভোনেনের জায়গায় দলে আসতে পারেন গিডেট্টি,সেল্টাভিগোর হয়ে ৩ গোল ৩ এসিস্ট আছে তার এই সিজনে।

যেহেতু কোচ অ্যান্ডারসন একই ফর্মেশন খেলান তাই লাইনাপ অনুমান করা খুব একটা কঠিন না।

 

প্রজেক্টেড লাইনাপ(৪-৪-২): ওলসেন-লুস্তিগ-লিন্ডেলফ-গ্রাঙ্কভিস্ট-অগাস্টিনসন-ফোর্সবার্গ-লারসন-একদাল-ফোর্সবার্গ-তোইভোনেন-বার্গ

 

বারবার একই ফর্মেশনে খেলা হলে প্রেডিক্টেবল হয়ে যাওয়া স্বাভাবিক। ফ্রেন্ডলি ম্যাচে এই পর্যন্ত ২-১ এর চিলির কাছে এবং ১-০ গোলে রোমানিয়ার কাছে তারা হেরেছে, ডেনমার্কের সাথে ১-১ গোলে ড্র করেছে।

 

যেহেতু দলে টপ কোয়ালিটি ট্যালেন্ট কম অন্যান্য দলের তুলনায়,তাই দলটা ফোর্সবার্গের উপর অনেক বেশি নির্ভরশীল, তাই তার ইঞ্জুরি বা খারাপ ফর্মের জন্য অনেক ভুগতে হবে সুইডেনকে। দলের ডেপথও নেই , স্ট্রাইকার বার্গ এই সিজনেই গ্রীক ক্লাব পানাথিয়াকোস ছেড়ে এমিরাতস এর ক্লাব আল আইনে এসেছেন যার জন্যে তাকে অনেক কথা শুনতে হচ্ছে। স্ট্রাইকে ইব্রাহিমোভিচ নেই।

কিন্তু ইব্রাইমোভিচ নেই বলেই হয়তোবা টিম কেমিস্ট্রি এতো ভালো। এই টিম স্পিরিট নিঃসন্দেহে তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।

মেক্সিকোর বিপক্ষে কেমন খেলে এটাই পূর্বাভাস দিবে গ্রুপ পর্বের বাকি ম্যাচ এবং বাকি বিশ্বকাপে কেমন খেলবে তারা। ১৯৫৮ সালে তারা নিজ দেশের ওয়ার্ল্ডকাপে ফাইনাল পর্যন্ত গিয়ে ব্রাজিলের কাছে হেরে যায়। এটাই ছিলো তাদের বেস্ট এচিভমেন্ট। এই বিশ্বকাপেই সেই এচিভমেন্ট করা হয়তো যাবেনা, কিন্তু কোচ অ্যান্ডারসন এই টিম স্পিরিট নিয়ে কন্টিনিউ করলে সেই স্বর্নযুগ এর আশা করাই যায়।

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন