বিশ্বকাপ স্কোয়াড এনালাইসিসঃ মরক্কো

বিশ্বকাপ স্কোয়াড এনালাইসিসঃ মরক্কো

আফ্রিকার দেশটি ২০ বছর পরে বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ পাচ্ছে, তাও গ্রুপ পর্বে আনডিফিটেড থেকে।

কোচ হার্ভ রেনার্ড ফ্রেঞ্চ হলেও সে আফ্রিকান স্পেশালিস্ট। আফ্রিকান কাপ অফ নেশন্স জিতেছেন দুটো ভিন্ন ভিন্ন দলের হয়েঃ জাম্বিয়া(২০১২) এবং আইভরিকোস্ট (২০১৫)। তার কোচিং স্টাইল হিসেবে বলা যায় সে কখনো একটা সিঙ্গেল প্লেয়ার ভিত্তিক গেমপ্লে সাজান না। আর পুরো দলকেই বলেন ফ্রিকুয়েন্টলি ফর্মেশন চেঞ্জ করতে, এটাকের সময় এটাকিং ফর্মেশন, ডিফেন্সের সময় ডিফেন্সিভ। কিন্তু সে পটেনশিয়াল সম্পন্ন দলকে এক সুতোয় গাঁথতে পারদর্শী, আইভরিকোস্ট দলে যা করেছেন।

তবে তার দলেও রয়েছে পটেনশিয়ালের ছড়াছড়ি , নিজেদের সিস্টেমের পাশাপাশি এমন অনেক প্লেয়ার পাচ্ছেন যারা ইউরোপের টপ টপ ক্লাবে খেলেন। আর মরোক্কোর খেলোয়াড় যারা কোয়ালিফাইং খেলেছেন তাদের মধ্যে ৬২ পারসেন্টই মরক্কোর বাইরে জন্ম নিয়েছেন।

মরক্কোর ২৩ জনের ফাইনাল স্কোয়াডে যারা আছেনঃ

গোল্কিপারঃ মুনির আল কাজাই(নুমান্সিয়া,স্পেন), ইয়াসিন বনু (জিরোনা) , আহমাদ রেদা তাগ্নাউতি( ইত্তিহাদ)

ডিফেন্ডারঃ মেহদি বেনাতিয়া( ইয়ুভেন্তাস), রোমেইন সাইস(উল্ভারহ্যাম্পটন), মানু দা কস্তা (বাসাকসেহির, তুর্কী), বাদ্র বেনুন( রাহা কাসাব্লাঙ্কা) , নাবিল দিরার( ফেনারবেস,তুর্কী) , আশরাফ হাকিমি( রিয়াল মাদ্রিদ), হামযা মেন্দিল( লিল,ফ্রান্স)

মিডফিল্ডারঃ মুবার্ক বুসুফা ( আল জাজিরা,ইউএই), করিম এল আহমাদি(ফেয়েনুর্দ, হল্যান্ড), ইউসুফ বেনাসের( সিয়েন,ফ্রান্স) , সুফিয়ান আমরাবাত( ফেয়েনুর্দ) , ইউনুস বেলহান্দা ( গ্যালাতাসারাই) , ফায়কাল ফাজর( গেতাফে) , আমিন হারিত ( শাল্কা)

ফরোয়ার্ডঃ খালিদ বুতাইব (মালাতিয়াস্পোর,তুর্কী), আজিজ বুহাদ্দুজ( সেন্ট পলি,জার্মানি) , আয়ুব এল কাবি(রেনেসা) , নরদিন আমরাবাত(লেগানেস) , মেহদি কারসেলা( স্ট্যান্ডার্ড লিজ, বেলজিয়াম), হাকিম জাইয়েখ(আয়াক্স)

এবার আলোচনা শুরু করা যাক।

গোলকিপিং পজিশনটা যাবে নিঃসন্দেহে মুনির কাজাই এর কাছে। কোয়ালিফাইং এর প্রত্যেকটি ম্যাচ খেলেছেন, সব ম্যাচেই ক্লীনশীট রেখেছেন। তার ব্যাকাপ হিসেবে বনুকে দেখা যেতে পারে, ক্লাব ফ্যাক্ট। তবে গোল্কিপিং পজিশন প্রশ্নবিদ্ধ হবে কারণ মুনির স্পেন এর টপ ফ্লাইটের কোন ম্যাচ খেলেননি।

মরক্কোর ডিফেন্স কোয়ালিফাইং ম্যাচে কোন গোল কন্সিড করেনি। দলের নির্ভরতার প্রতীক বেনাতিয়া, একটা সলিড সেন্টারব্যাক, যার অসাধারণ গেম রীডিং এবিলিটি আর শারীরিক সক্ষমতা আছে। তাছাড়া গুরুত্বপূর্ন ম্যাচে গোল করার দারুন অভ্যাস আছে তার। তার সাথে দাঁড়াবেন সাইস। উল্ভারহ্যাম্পটন এর হয়ে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডে খেলা সাইস জাতীয় দলে এসে সেন্টারব্যাকেও প্রুফ করেছেন নিজেকে । ডীপ থেকে তার লং পাস যখন তখন কাউন্টার এটাক লঞ্চ করে। বেনুন আর দা কস্তা থাকবেন ব্যাকাপ হিসেবে। দুইজনেই মিডফিল্ডে ডিস্ট্রয়ার রোলটাও প্লে করতে পারেন। তবে যদি রেনার্ড থ্রী ম্যান মিডফিল্ড খেলাতে চান দা কস্তা ভালো একটা অপশন হয়ে দাঁড়াবে। কোয়ালিফাইং এর কয়েকটা ম্যাচ (উদাহরণস্বরূপ আইভরীকোস্টের ম্যাচে ) এই ফর্মেশন খেলিয়েছেন।

রাইটব্যাকে হাকিমিই স্টারটার হতেন, রিয়ালের হয়ে ৯ ম্যাচে ২ গোল করেছেন, যেটা তার এটাকিং দিকটা তুলে ধরে । কিন্তু দিরার থাকার কারণে চান্স পেতে কষ্ট হতে পারে, তাছাড়া তার বয়সও কম। অন্যদিকে দিরার গতসিজনে মোনাকোর ডিফেন্সের একটা কী পার্ট ছিলেন। এই বিশ্বকাপেও তাকে দেখা যেতে পারে রাইটব্যাকে।

লেফটব্যাকে মেন্দিল চান্স পাওয়ার মতো একজন প্লেয়ার। হাকিমি লেফটব্যাকেও খেলতে পারেন, কিন্তু ইয়াং বলে তাকে খুব বেশি এক্সপেরিমেন্টে ফেলা হবেনা আশা করা যায়। মেন্দিল খুব ডাইনামিক, ওভারল্যাপিং প্লে যদি করতে চান সেক্ষেত্রে রাইটব্যাকে হাকিমিই হবে বেটার চয়েস, অথবা ৩-৪-২-১ ফর্মেশন, যেখানে মেন্দিল লেফটমিডে থাকবেন।

এবার মিডফিল্ড। যদি ধরি রেনার্ড ৪-২-৩-১ এই খেলাবে, তবে দুইজন হোল্ডিং মিডফিল্ডার খেলানো হবে। প্রাক্তন অ্যাস্টন ভিলা প্লেয়ার এল-আহমাদি ডিফেন্স আর মিডফিল্ডের মধ্যে কানেকশন হিসেবে কাজ করেন। বুসুফা লং পাস দিয়ে খেলা নিয়ন্ত্রন করেন।

৪-২-৩-১ এ খেলার একটা যুক্তি দেখি আমি, কারণ রেনার্ড অনেক এটাকিং মিডফিল্ডার নিয়েছেন। বেলহান্দা, ফাজর, আমিন হারিত , জাইয়েখ, নর্দিন আমরাবাত, মেহদি কারসেলা । তবে রিলাইয়েবল অপশন হতে পারে জাইয়েখ্‌ , নর্দিন আমরাবাত আর বেলহান্দা । বেলহান্দা ওয়াইড থেকে ক্রস আর ভেতরে পুশ-ইন করা উভয়েই পারেন তাই তাকে উইঙ্গে খেলানোই বেটার হবে। আমরাবাত কোয়ালিটি সম্পন্ন অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার তবে ফুলব্যাকের ওভারল্যাপ লাগবে । আর জাইয়েখ তো মরক্কো দলের প্লেয়ার টু ওয়াচ। আয়াক্সের হয়ে ৩৪ ম্যাচে ৯ গোল আত ১৫ এসিস্ট তার পটেনশিয়াল সম্পর্কে বলবে, মরক্কোর হয়েও ৮ গোল আছে তার ।অসাধারণ পাসার আর বল প্লেয়ার,আর মরক্কো দলের ফার্স্ট চয়েজ পেনাল্টি টেকার, তার উপরেই মরক্কোর এটাক নির্ভর করবে। আমিন হারিত কেও বাদ দেওয়া যায় না। যদিও বয়স ২০, ফ্রান্সে জন্ম এবং ইতোমধ্যেই ফ্রান্স ইয়ুথ লেভেলে খেলেছেন। এই সিজনে বুন্দেসলীগার রুকি অব দ্যা সিজন নির্বাচিত হয়েছেন। এসিজনে ১১৫ টা ড্রিবল করেছেন তিনি। অ্যাটাকিং মিড পজিশনে তাকে দেখা যেতে পারে সাব হয়ে।

রেনার্ড আরো দুটো চয়েজ করেছেন যেটা দেখে মনে হচ্ছে সে ৪-৩-৩ ও খেলাতে পারে। বুহাদ্দুজ আর আয়ুব আল কাবি কেউই স্ট্রাইকার নন, ফরোয়ার্ড উইঙ্গার। তাই জিয়েখ কে লেফট উইঙ্গে রেখে মেহদি কারসেলা, বুহাদ্দুজ অথবা আল কাবিকে রাইটউইঙ্গে খেলানো যেতে পারে। তবে ওয়ার্ল্ড কাপের মতো বড় আসরে রেনার্ড তার বিগ গানদের খেলাবেন আশা করা যায়।

কোয়ালিফাইংএ মরক্কো গোল খায় নি, কিন্তু এটাকের পারফর্মেন্স আশাব্যাঞ্জক নয়। ৪ ম্যাচে ড্র। তুর্ক লীগে ২৬ ম্যাচে ১২ গোলের পর বুতাইবের ধার নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। মুনির আল হাদ্দাদিকে পেলে অবশ্যি ফলস নাইন খেলানো হতো।। কিন্তু তার মরক্কোর হয়ে খেলার আবেদন ফিফা ফিরিয়ে দিয়েছে কারণ সে কোয়ালিফাইংএ স্পেনের হয়ে খেলে ফেলেছে। যাইহোক, গ্যাবনের বিপক্ষে বুতাইবের হ্যাট্ট্রিকে ৩-০ গোলের জয় পায় মরক্কো, যেটা তাকে এবং সমর্থকদের কনফিডেন্স দিবে।

তাহলে ফর্মেশন দাঁড়াচ্ছে ৪-২-৩-১ ; মুনির-দিরার/হাকিমি -বেনাতিয়া-সাইস-মেন্দিল-বুসুফা-এল আহমাদি-নরদিন আমরাবাত-জাইয়েখ-বেলহান্দা-বুতা

মিডফিল্ডে আরো আছেন সুফিয়ান আমরাবাত আর ইউসুফ আইত বেনাসের, এই চয়েজ থেকে মনে হতে পারে রেনার্ড ৩-৪-২-১ খেলাতে পারেন। কেননা তিনি ফুলব্যাক খুব বেশি নেননি, তার মধ্যে মেন্দিল আবার মিডফিল্ডেও খেলতে পারেন। রাইটব্যাকে সুফিয়ান আর মিডফিল্ডে এল আহমাদি আর বুসুফার ব্যাকাপে বেনাসের হতে পারে ভালো কম্বিনেশন। সেক্ষেত্রে বেলহান্দা কিংবা নরদিন আর জিয়েখ এটাকিং মিডফিল্ডেই যাবে। কিন্তু খুব দ্রুত অবস্থা বুঝে নরদিন কে সাব করে সুফিয়ানকে নামালেই ৪-২-৩-১ ফর্মেশন বদলে ৩-৪-২-১ হয়ে যাবে। এটাই রেনার্ডের ট্রিক।

সেক্কত্রে ফর্মেশন দাঁড়াচ্ছে ৩-৪-২-১; মুনির-সাইস-বেনাতিয়া-দা কস্তা-সুফিয়ান আমরাবাত-এল আহমাদি-বুসুফা-মেন্দিল-জাইয়েখ-বেলহান্দা/নরদিন-বুতাইব

মরক্কোর ডিফেন্স অসাধারণ এবং এইটাকেই তারা হাইলাইট করবে আশা করা যায়। প্রথমে ডিফেন্স করে পরে গতি দিয়ে হার মানাবে , দলের ভারসেটিলিটি হতে পারে সবচেয়ে বড় শক্তি, যদি না ইন্ডিভিজুয়াল পারফরমেন্স খারাপ হয়।

তাদের গ্রুপে পড়েছে পর্তুগাল , স্পেন আর ইরান। পর্তুগালের মতো মরক্কোরও একই সমস্যা, বয়স। বুসুফা, এল আহমাদি, নরদিন আমরাবাত, বুহাদ্দুস, দিরার,দা কস্তা , মেহদি আল কারি সবার বয়স ৩০ এর উপরে। পাশাপাশি বুতাইব যদি ক্লিক না করে খালি হাতে ফিরে যেতে হতে পারে। কেননা Attack wins matches । বুতাইব যদি ফিনিশিং না করতে পারে তাহলে এত সম্ভাবনাময় মরক্কো এটাক একটা স্কোপবিহীন রাইফেলের মতো হয়ে যাবে।

কিন্তু ইরানের সাথে ম্যাচটা যদি তারা জিতে যায় তাহলে যেকোন বড় অঘটন ঘটানোর সবচেয়ে বড় অস্ত্র পেয়ে যাবে তারা,যেটা হচ্ছে কনফিডেন্স । দেখা যাক এবার মরক্কো ২য় রাউন্ড পার হয়ে ইতিহাস করতে পারে কিনা।

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন