সেনেগাল-আরেকটি রূপকথার অপেক্ষায়?

সেনেগাল-আরেকটি রূপকথার অপেক্ষায়?

২০০২ বিশ্বকাপে রূপকথার গল্পের রূপকার সেনেগালকে আপনাদের মনে আছে? ১৯৯৮ সালের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ছিল ফ্রান্স।বর্তমান রিয়াল মাদ্রিদ কোচ জিনেদিন জিদান তখন ফ্রান্সের অধিনায়ক। ২০০২ বিশ্বকাপের অন্যতম ফেভারিট দল ছিল ফ্রান্স। র‍্যাংকিংয়ের ১ নম্বর তো বটেই, ইউরো ও বিশ্বকাপ দুটো ট্রফিই তখন তাদের অধীনে। জিদান, অরি, থুরাম, রবার্তো পেরেজের মত প্লেয়ার সহ গোলবারে ফ্যাবিয়ান বার্থেজের মত কিপারের হাত। এই শক্তিশালী ফ্রান্সের বিরুদ্ধেই সেনেগালের প্রথম খেলা।

শক্তিশালী ফ্রান্স কিছুক্ষণ পরপরই আক্রমণ করতে থাকে অপেক্ষাকৃত দুর্বল দল সেনেগালের রক্ষণভাবে। কিন্তু গোল আদায় করতে ব্যর্থ হয়। ভাগ্যদেবীও হয়ত সুপ্রসন্ন ছিল না ফ্রান্সের সাথে। তাদের এত আক্রমণের ভীড়েও একটি গোল দিয়ে নিজেদের বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচটি জয় করে নেয় সেনেগাল। গোলটি করেন পাপা বুবা দিওপ যা মাঠে হাজার হাজার ফ্রেন্ঞ্চ সমর্থককে কান্নায় ভাসায়। সেখান থেকেই তাদের রূপকথার উপাখ্যানের যাত্রা শুরু। ফ্রান্স বিদায় নেয় বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকেই। পরবর্তী দুই ম্যাচ ছিল উরুগুয়ে এবং ডেনমার্কের বিরুদ্ধে। ডেনমার্কের বিরুদ্ধে স্যালিফ দিয়াও এর গোলে ম্যাচটি ১-১ গোলে ড্র করতে সমর্থ্য হয় তারা। পরবর্তী ম্যাচে উরুগুয়ের বিপক্ষেও ৩-৩ গোলের ড্র নিয়ে মাঠ ছাড়ে তারা। এতেই বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে জায়গা করে নিয়ে রূপকথার জন্ম দেয় সেনেগাল।

১ম বিশ্বকাপ খেলতে আসা দল সরাসরি নক আউট পর্বে জায়গা করে নেবে তা অনেকেই ভাবতেও পারে নি! তবে হ্যা, তাদের রূপকথার গল্প এখানেই শেষ নয়! সেই সময়ের বেশ শক্তিশালী দল ছিল সুইডেন। সুইডেনকে ২-১ গোলে হারিয়ে শেষ আটে জায়গা করে নেয় তারা। তবে কোয়ার্টার ফাইনালে তুর্কির কাছে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয় তাদের। যেই গোল্ডেন গো্লে ফ্রান্সের বিদায়ঘন্টা বেজেছিল তুরস্কের বিপক্ষে সেই গোল্ডেন গোলের খাঁড়ায় বিদায়ঘন্টা বেজে যায় আফ্রিকান প্রতিনিধিদের। তবে ততদিনে রেকর্ড বইয়ের অনেক কিছুই উল্টেপাল্টে ফেলেছে তারা। আফ্রিকা মহাদেশের ইতিহাসে মাত্র তিনটি দেশ এখন পর্যন্ত কোয়ার্টার ফাইনাল খেলতে পেরেছে। ১৯৯০বিশ্বকাপে ক্যামেরুন, ২০০২ বিশ্বকাপে সেনেগাল এবং ২০১০ বিশ্বকাপে ঘানা খেলেছে শেষ আটে। গর্ব করার মতই ব্যাপার সেনেগালবাসীর জন্য। সেই বিশ্বকাপের পর সেনেগালের ২১ জন খেলোয়াড় খেলেছে ফ্রেন্ঞ্চ লীগের বিভিন্ন দলে। দিউফ এবং দিয়াও যোগ দেন লিভারপুলে। এছাড়া ফাদিগা যোগ দেন ইন্টার মিলানে। বছরটি সেনেগালীয় বছর বললেও ভুল হবে না।


যাহোক সেই বিশ্বকাপের পর দেখতে দেখতে ষোলটি বছর পার হয়ে গিয়েছে। ২০১০ সালে নিজ মহাদেশে আয়োজিত বিশ্বকাপে খেলতে না পারার আক্ষেপ তো রয়েছে। বাছাইপর্বে তাদের গ্রুপে ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা, বুর্কিনা ফাসো। গ্রুপ পর্ব থেকে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে রাশিয়ার টিকেট কেটেছে সেনেগাল। আবারো ষোলো বছর পর ফুটবল মহারণের মূলপর্বে খেলছে তারা। আরেকটি রূপকথার আশাতো করা যেতেই পারে!


পশ্চিম আফ্রিকার দেশ সেনেগাল। সেনেগাল নদীর তীরে অবস্থিত এই দেশ। লেস লায়ন্স দে লা তেরানগা (লায়ন্স অব তেরানগা) নামে খ্যাত এই দেশটি খেলবে এবার বিশ্বকাপের এইচ গ্রুপে। তাদের অন্য তিন প্রতিপক্ষ দল হলো জাপান, পোল্যান্ড এবং কলম্বিয়া। হয়তবা আপনি ভাবতে পারেন পোল্যান্ড এবং কলম্বিয়ার পারফর্মেন্স বিচারে এই দুটি দলই এই গ্রুপ থেকে শেষ ষোলোতে জায়গা করে নেবে কিন্তু সেনেগাল কিন্তু ছেড়ে কথা বলবে না। এবারের সেনেগাল দলটি বেশ চমৎকার। বেশিরভাগ প্লেয়ারই ইউরোপের বিভিন্ন দলে খেলছেন। যথেষ্ট ব্যালেন্সড দল বলে মনে হচ্ছে। একই সাথে অনেকদিন ধরে খেলছে সবাই যার কারণে বোঝাপড়াটাও চমৎকার। দলটির প্লেয়ারদের গড় বয়স ছাব্বিশ থেকে সাতাশের মধ্যে। বলতে গেলে তারুণ্য আর অভিজ্ঞতার এক অপূর্ব সমন্বয়। ডিফেন্স থেকে স্ট্রাইক সবজায়গায় প্রতিভাবান প্লেয়ার রয়েছে এছাড়া র‍্যাংকিংয়ের তেইশতম দল সেনেগাল যা আফ্রিকান দেশগুলোর মধ্যে সবার আগে।


ইতোমধ্যেই তেইশ সদস্যের দল ঘোষণা করে ফেলেছে সেনেগাল।দেখে নেওয়া যাক দলটি:
সেনেগালের প্রাথমিক স্কোয়াডঃ
গোলরক্ষকঃ আবদোলাই দিয়ালো, আলফ্রেড গোমিস, খাদিম দিয়াই।

ডিফেন্ডারঃ লামিন গাসামা, সালিউ সিস, কালিদু কুলিবালি, কারা বোদি, ইউসুফ সাবালি, সালিফ সানে, মুসা ওয়াগ।

মিডফিল্ডারঃ ইদ্রিসা গুইয়ে, চেইখো কোয়েত, আলফ্রেড দিয়াই, বাদো দিয়াই, চেইখ দোয়ে, ইসমাইলা সার।

ফরোয়ার্ডঃ কেইটা বালদে, মামে বিরাম দিউফ, মুসা কোনাতে, সাদিও মানে, এমবায়ে নিয়াং, দিয়াফ্রা সাখো, মুসা সো।


প্রথমেই এক প্রাচীরের কথা দিয়ে শুরু করি। নাপোলির ডিফেন্ডার কালিদু কুলিবালি। উচ্চতায় ছয় ফুট পাঁচ ইন্ঞ্চি। ডাকনাম ডিফেন্সিভ টাইনান। ফ্রান্সে জন্ম নিয়েছেন তবে দেশ হিসবে বাছাই করেছেন পিতৃভূমি সেনেগালকে, বর্তমানে খেলছেন নাপোলিতে। ফুটবল ঈশ্বর ম্যারাডোনা তার প্রশসংসায় পন্ঞ্চমুখ। এছাড়া সাথে আছে গাজামা, সানা ও সাবালির মত ডিফেন্ডার।


এবার কথা বলা যাক মিডফিল্ড নিয়ে। মিডফিল্ড পুরোটাই ইংলিশ লীগে খেলা প্লেয়ারদের দ্বারা সমৃদ্ধ। এভারটন, ওয়েস্ট হ্যাম, বার্মিংহাম সিটি, উলভারহ্যাম্পটন ও স্টোক সিটিতে খেলার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন প্লেয়ার রয়েছে সেনেগালে। দলের মাঝমাঠের প্রাণ তাদের দলনেতা কাওয়াতে। ওয়েস্টহ্যামের এই মিডফিল্ডার সমর্থকদের কাছে বেশ প্রিয়। এছাড়া বলের যোগানে সহায়তা করতে রয়েছে ইদ্রিস গানা। এছাড়া বাকিরাও রয়েছে সহায়তা করার জন্য।


সেনেগালের সবচেয়ে বড় পোস্টারবয় রয়েছে তাদের ফরোয়ার্ড লাইনে।যারা নিয়মিত ফুটবল খেলা দেখেন তাদের সাদিও মানেকে অবশ্যই চেনার কথা। লিভারপুলের প্রাণভোমরা এবার দেশের মানুষের প্রত্যাশা কতটুকু পূরণ করতে পারে সেটিই এখন দেখার বিষয়। প্লেয়ার হিসেবে দলের হয়ে ৫১ ম্যাচে ১৪ গোল করেছেন এই ফরোয়ার্ড। সবশেষ ইউসিএলে লিভারপুলের হয়ে একমাত্র গোলটি করেছিলেন সাদিও মানে। সদ্য শেষ হওয়া প্রিমিয়ার লীগ এবং ইউসিএলে সবমিলিয়ে ২০ গোল এবং ৮টি অ্যাসিস্ট করেছেন তিনি। ড্রিবলিংয়ে যথেষ্ট শক্তিশালী মানে। তাকে সঙ্গ দেয়ার জন্য রয়েছে অভিজ্ঞ সও, তুরিনোর নিয়াং, স্টোক সিটির দিউফ সহ আরো অনেকে।সবমিলিয়ে একটি ভালো এবং প্রতিদ্বন্দিতাপূর্ণ লড়াইয়েরই আভাস দিচ্ছে সেনেগাল।


আগেই বলেছি সেনেগালের বর্তমান দলটি বেশ ব্যালেন্সড। কিন্তু ২০০৭-২০১০ সময়কাল ছিল বেশ সংকটপূর্ণ সেনেগালের জন্য।সেই ক্রান্তিকালটি পার করে তারা আরেক রোমান্ঞ্চের পথে দাড়িয়ে আছে। তাদের বর্তমান কোচের নাম অ্যালিও সিসেই যিনি দায়িত্ব নিয়েছেন ২০১৫ সালে। সেই আলোচিত বিশ্বকাপের হাজি দিওফদের গোল্ডেন টিমের অধিনায়ক ছিলেন সিসেই। খেলোয়াড়ি জীবনে দেশের হয়ে সর্বোচ্চ অঙ্গনে যেভাবে লড়ে গেছেন,কোচ হিসেবে এই দলটাকেও ঠিক সেভাবেই নিজের সবকিছু দিয়ে এক সূতোয় বেধে রেখে আরেকটি রূপকথার উপাখ্যান তৈরির প্রচেষ্টায় থাকবেন তিনি। সম্ভবত ৪-৩-৩ ফর্মেশনেই দলকে খেলাবেন তিনি। যথেষ্ট জ্বালানীও রয়েছে তার কাছে।  কোচ হিসেবে ২০০২ সালের পর আরেকটি সেরা প্রজন্ম তার হাতে।

তবে কিছু দুর্বলতা রয়েছেই।ভালো একজন সেট পিস টেকারের অভাব সহ মাঝমাঠের দুর্বলতা লক্ষণীয়। দেখা যাক সেসব কাটিয়ে উঠতে পারে নাকি তারা। তবে দেশটি এখন ফুটবল জ্বরে কাঁপছে। সবাই নানাভাবে খোঁজ খবর রাখছে এবং মিডিয়াও বেশ নিয়মিত সরব তাদের ব্যাপারে। তবে অন্তত হলেও গ্রুপ পর্ব পেরুতে পারবে তারা এমনটাই বিশ্বাস করে সেনেগালের ফুটবল বোদ্ধারা।দেখা যাক কি আছে সামনে। বিশ্বকাপ শুরু হতেও খুব বেশি দিন বাকি নেই। সেনেগাল পারবে তো আরেকটি রূপকথার জন্ম দিতে? অপেক্ষায় রইল পুরো বিশ্ব।

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন