ইউয়েফা চ্যাম্পিয়নস লীগ ফাইনাল ২০১৭/১৮ প্রিভিউঃ রিয়াল মাদ্রিদ বনাম লিভারপুল

ইউয়েফা চ্যাম্পিয়নস লীগ ফাইনাল ২০১৭/১৮ প্রিভিউঃ রিয়াল মাদ্রিদ বনাম লিভারপুল

এক দলের সামনে হ্যাট্রিক উচল জিতে ইতিহাস রচনার সুযোগ। জিদানের নিজের-ও একটা রেকর্ড হবে। আগের মৌসুমেই যারা ব্যাক টু ব্যাক জিতে অলরেডি রেকর্ড করে ফেলসে। আরেক দলের সামনে মৌসুম শুরুতে কারো গণায় না থেকেও 'মোটামোটি' টিম নিয়েও ১৩ বছর পর উচল এর বিজয়ী হওয়ার সুযোগ। ক্লপের প্রথম বার জিতার চান্স। যে-ই জিতুক, ফাইনালের মত ফাইনাল দেখার আশা আমরা করতেই পারি।

মূল কথায় যাই।

লিভারপুলের ক্ষেত্রে ফাইনালে ফর্মেশন হতে পারে ৪-৩-৩। মিডে হেন্ডারসন পিভটে খেলে তার দুই পাশে মিলনার এবং ওয়াইনাল্ডাম। সামনে ত্রিরত্ন। এরূপ স্কোয়াড না হলেও অনেকটা সিমিলার-ই হবে। লিভারপুলের বেশ কজন প্লেয়ারের খেলার ধরন কিংবা লেভেল অল্মোস্ট এক-ই। ক্লাভান, ম্যাটিপ, লভ্রেন; এম্রে চ্যান, হেন্ডো; ওয়াইনাল্ডাম, মিলনার...

রিয়ালের দৃষ্টি তে দেখলে স্কোয়াড সিলেকশন টা একটু ডিফিকাল্ট। ৪-৩-৩ বা ৪-৪-২ (ফ্ল্যাট) বা কিছুদিন আগেই লা লিগায় দেখা ৪-৪-২ ডায়মন্ড (রন-বেল আপফ্রন্ট) হতে পারে। পারসোনালি আমার চোখে ৪-৪-২ ফ্ল্যাট-ই এগুলার ভিতর থেকে বেস্ট লাগে। কেন? আচ্ছা...

টিম শিটে দেখলে রিয়াল আর লিভারপুলের মধ্যে রিয়াল মাদ্রিদ-ই শক্তির বিচারে বেশ এগিয়ে। দুই দলের ফরওয়ার্ড লাইন কে যদি সমান সমান-ও ধরি, খেলা কিন্তু তাদের উপর ততটা নির্ভর করছে না যতটা না মিডফিল্ড আর ট্যাক্টিক্স এর উপর করবে। ফাইনাল ম্যাচ, স্রেফ এক লেগের। একটা ভুল কিংবা একটা ঠিক-ই যথেষ্ট...

লিভারপুলের ফরওয়ার্ড লাইনে সালাহ, ফিরমিনো, মানে। খেলার সময় সালাহ'র পজিশন ম্যাক্সিমাম টাইমেই ৩ জনের ভিতর সবচাইতে সামনে থাকে। সে তার উদ্দেশ্যে বল পাঠানোর জন্য অপেক্ষা করে, যা সে টেনে নিয়ে যাবে, বা নিজে পজিশন চেঞ্জ করে ফিরমিনো বা অন্য কোন এটাকিং প্লেয়ারের জন্য স্পেস ক্রিয়েট করবে। ফিরমিনোর রোল ফলস ৯। লিভারপুল ডায়মন্ড শেপে প্রেস করার সময়-ও সে প্রেস করে, আবার নিজেদের হাফে পাসিং লেন ব্লক করার মত পজিশনে থাকার সময়-ও সে ড্রপ করে (উদাহরণঃ সিটির বিপক্ষে প্রেস করা কিংবা ফারনান্দিনহো কে পেরা দেওয়া)।

আর বল জিতলে নগদে কাউন্টার এটাক শুরু করা (টেনে নিয়ে বা হোল্ড করে এটাকিং সাপোর্ট পেতে বা সালাহ/মানে'র সাথে ওয়ান-টু খেলে)। কিছু সময়ে আবার দেখা যায় সালাহ'র সাথেও পজিশন চেঞ্জ করে সে, এটা হয় প্রতিপক্ষ কে ঘাবড়ে দেবার জন্য, যাতে ডিফেন্সিভ শেইপ টা ডিজঅরগানাইজড হয়ে যায়। ফ্রন্ট ৩ এর মধ্যে মানে'র অবস্থান-ই সবচেয়ে নিচে। ৪-৩-৩ তখন অনেকটা ৪-৪-১-১ এর মত হয়ে যায়। মানে'র এগ্রেশন আর পেস এর বড় একটা কারণ।

৪-৩-৩ এ যেই সমস্যাটা রিয়াল ফেস করবে তা হচ্ছে লিভারপুলের স্ট্রেংথ কেই সরাসরি লাইসেন্স দিয়ে দেয়া। আর তা হচ্ছে উইডথ। প্রায় সবাই-ই জানে মারসেলো'র বদভ্যাস এর কথা। সালাহ'র সেখানে কপাল (পড়ুন "স্পেস") খুলে যাবে। ক্যাসেমিরো কে যদি পিছনে রাখেন-ও, সে ব্যস্ত থাকবে ফিরমিনো কে সামলাতে (আর ক্যাসে ফিরমির দায়িত্বে না থেকে একটু সামনে থাকলে এক্সট্রা পাসিং অপশন হবে ঠিক-ই কিন্তু তখন ২ অন ২ সিচুয়েশন হয়ে যাবে ইন কেইস কোন কাউন্টার হয়)। আর রামোস যদি পজিশনিং ঠিক না রেখে সামনে কোথাও থাকে সে সময়, লা লিগার টিম দের থেকেই এরকম অবস্থায় কাউন্টার এটাকে অহরহ গোল খাওয়া আছে তার। শুধু মারসেলো যে তা না, কারভাহাল-ও সামনে থাকে অনেক সময় (সেটা অবশ্য ভালো কারণেই, ওভারলোড করে সামনে এগিয়ে যায় যাতে প্লে সুইচ করে বল এ প্রান্তে আসলে ও খালি স্পেসে বল পায়)। আর ৪-৩-৩ এ ক্রুস বা মদ্রিচের হরাইজন্টাল + ভারটিকাল দূরত্ব কভার করে সালাহ/মানে কে ধরতে ধরতে ওই ২/৩ সেকেন্ডে ওরাও ফাইনাল থার্ডে ঢুকে যাবে। লিভারপুলের আরেকটি অ্যাসেট হচ্ছে মিলনার। স্ট্যামিনা'র পাশাপাশি তার বল ডিস্ট্রিবিউশন। প্রেসিং এবং ফাস্ট কাউন্টার এটাকিং টিমের জন্য পারফেক্ট। সব মিলিয়ে তাই লিভারপুল সবচেয়ে ভাল খেলে এটাকিং টিম দের বিপক্ষে। হাই ডিফেন্স লাইন পেলে ছিঁড়ে ফেলে। এর বিপরীত টাও কিন্তু ঠিক!

হাই ডিফেন্স লাইনের বিপক্ষে যেমন টা ভয়ংকর, লো লাইন, লো প্রেসিং, এবং মিড আর ডিফেন্স লাইনে কম স্পেস রাখা টিম দের বিপক্ষে ঠিক তত টাই অকার্যকরী লিভারপুলের এটাক। তাই প্রিমিয়ার লীগে বড় টিম দের হারিয়ে দিলেও, বা চ্যাম্পিয়ন্স লীগের ফাইনালে উঠলেও, প্রিমিয়ার লীগের বটম ৪ এর বিপক্ষে লিভারপুলের রেকর্ড হচ্ছে ৪ জয়, ৩ ড্র, ১ হার। ছোট টিম রা স্বাভাবিক ভাবেই লীগের সবচেয়ে বেশি গোল করা প্লেয়ারের টিমের বিপক্ষে ডিফেন্সিভ খেলবে। তবে শুধু যে ছোট টিম রাই এমন করে খেলেছে তা নয়, লিভারপুলের বিপক্ষে ২-১ এ জয় পাওয়া ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড-এর-ও অনেকটা মিল ছিল এরকম ট্যাক্টিকের সাথে। এরকম ট্যাক্টিকের বিপক্ষে আমরা ক্লপ কে তার ফুলব্যাক দের ব্যবহার করতে দেখি। সালাহ/মানে'র সাথে ওভারল্যাপ করা যাতে কম্প্যাক্ট ডিফেন্স থেকে কোন ডিফেন্ডার এগিয়ে আসে তার জায়গা থেকে। এই মুভ টা অবশ্য তুখোড় বাসপারকিং টিম বা অন্তত ৫-ম্যান ডিফেন্স এর বিপক্ষে তেমন ইফেক্টিভ হবে না কারণ জোন গুলো সব ডিফেন্ডার দিয়ে অকুপাইড, বক্সের বাইরে থেকে লং শট নেওয়া ছাড়া বা সেট পিস গুলো ছাড়া উপায় নেই।

দুটো জিনিস। রিয়ালের ফর্মেশন, আর গ্যারেথ বেল খেলবে কি খেলবে না। দলে রোনালদো আর বেল এর উপস্থিতি-ই ভিন্ন একটা প্রভাব ফেলে। নিজেদের মনোবলেও, প্রতিপক্ষের উপরেও সাইকোলজিক্যাল একটা ইফেক্ট। রোনালদো আর বেঞ্জেমা বা রোনালদো আর ইস্কো থেকে রোনালদো আর বেল-ই বেশি ইমপ্যাক্টফুল শোনায়। ৪-৪-২ এ এই দুজন কে বসিয়ে দেখা যায়।

রন-বেল সামনে। বায়ে ইস্কো/এসেন্সিও, ডানে লুকাস (মাঝের ২ জনের স্লটে ক্রুস এর সাথে যে কেউ হতে পারে এমং ক্যাসে / মদ্রিচ / কোভা) । সামনের দুজন থাকবে ভারজিল-লভ্রেন এর বিপরীতে। ৪-৪-২ হলে ওয়াইড মিড থাকার কারণে ফুলব্যাক রা কিছুটা সাপোর্ট পাবে পজেশন হারালে। আর সামনে রন-বেল এর মত স্পিডি, ফিজিক্যাল, ক্লিনিক্যাল ফিনিশিং এবং দারুণ অফ দ্যা বল মুভমেন্ট-ওয়ালা প্লেয়ার থাকায় এটাক করার ওয়ে-ও অনেক পাওয়া যাবে। মিডে ৩ জনের চেয়ে ৪ থাকায় আরও ব্যালেন্সড হবে। উইডথ কভার হবে, এটাকে আরও উইডথ ক্রিয়েট হবে। আর সামনে রন-বেল থাকায় ওদের সাথে অন্তত ২ জন (১+১) ডিফেন্ডার ফিক্সড থাকবে, এতে করে সাইড মিড দের কাট ইন করে ঢুকার-ও স্পেস থাকবে (লুকাস/ইস্কো/এসেন্সিও দের জন্য)। এরকম ম্যাচে মিডফিল্ড এর গুরুত্ব-ই বেশি, কারণ চান্স ক্রিয়েট হয় এখান থেকেই। তার সাথে তখন সাব হিসেবে এসেন্সিও নামতে পারে যে কিনা সাইড মিডেও বা ২ ফরওয়ার্ডের পেছনের পকেটেও খেলতে পারে।

লিভারপুলের বেস্ট ডিফেন্ডার হচ্ছে ভারজিল। রিয়ালের জন্য উত্তম হবে ভারজিল যে পাশের সিবি থাকবে তার উল্টো পাশ দিয়ে বারবার এটাক করা বা বেশি বেশি বল সাপ্লাই দেওয়া।

এটাকে বেশ থ্রেটেনিং হলেও লিভারপুলের জন্য রিয়ালের এটাকের বিপক্ষে খেলা বেশ বিপজ্জনক। হাই প্রেসিং এর কারণে শেষের ২০-৩০ মিনিট গ্যাস কম থাকবে (মিড আগের মত ইন্টেন্সিটি নিয়ে প্রেস করতে পারবে না + মানে'র ফল ব্যাক করার দায়িত্ব)। যে কারণে রোমা এবং সিটির বিপক্ষেও তারা টপাটপ গোল হজম করে। ভারজিলের সাথে আরেকজন ভালো সিবি'র অনুপস্থিতিও রোনালদো-বেল দের বিপক্ষে প্যারা দিবে। স্পেশালি রোনালদো যার অফ দ্যা বল মুভমেন্ট যা ওয়ার্ল্ড এর বেস্ট এবং যার নকআউট স্টেজে (বিগ ম্যাচে) টানা ১০ ম্যাচে গোল দেওয়ার রেকর্ড আছে। রিয়ালের টানা ৩ বার এবং এই ৫ বছরে ৪ বার ফাইনাল খেলার অভিজ্ঞতাও তাদের জন্য বড় অ্যাসেট এবং লিভারপুলের জন্য থ্রেট।

সে জন্যই লিভারপুলের উচিৎ হবে মিডফিল্ড ব্যাটেলে জেতা, আর প্রথম গোল টা দিয়ে ফেলা (রিয়াল এটাকিং খেলবে তখন, আর লিভারপুল তাদের স্ট্রেংথ তখনই শো করতে পারবে আরও ভাল)। ক্রুস আর মদ্রিচ, এই দুইজন কে তাদের স্বাভাবিক খেলা খেলতে না দেওয়া আর তাদের কে সেন্টার থেকে যত পারা যায় আলাদা করে রাখা। এই দুইজন-ই খেলাটা ডিক্টেট করে মোস্ট অফ দ্যা টাইম।

রিয়ালের ফরমেশন যা-ই হোক, এই দুজন কে আটকে রেখে ব্যাক ফোর যদি দাঁতে দাঁত চেপে কমপ্যাক্ট রাখা যায়, তাহলে লিভারপুলের জন্য সম্ভব হবে। ফিরমির দায়িত্ব হবে ক্যাসেমিরো কে চেক-এ রাখা। লিভারপুলের জন্য আশার কথা হচ্ছে তারা যে ট্যাক্টিক্সে খেলছে সেটা অলরেডি ক্লিক করেছে, আর তার চেয়েও বড় কথা ত্রিরত্ন ফর্মে আছে।

আশা করি আমরা একটি উপভোগ্য ফাইনাল দেখতে পারব।

প্রেডিকশন?

বার্সার সাথে ২ লেগ মিলিয়ে রোমা জিতে যাবে কে জানত? (সিরি আ ফ্যান রা হয়ত ক্লেইম করবেন এখন, কিন্তু ভাবনা পর্যন্তই হয়ত ছিল, না জিতলে ঠিক-ই আসত বার্সা-ই ডিজারভিং টিম)

স্পারস এর সাথে শুরুর দিকে উচলে হারার পর (তখন লিগেও খারাপ যাচ্ছিল) কয়জনের বিশ্বাস ছিল যে রিয়াল টানা ৩ বার ফাইনাল খেলবে? আর এটা তো এক লেগের ফাইনাল... উচলের ফাইনাল... এরকম স্টেজের ম্যাচ যে ম্যাচে ইতিহাসের সেরা কাম্ব্যাক গুলাও রচনা হয়। বিশ্বকাপের আগে রেগুলার ফুটবল ফ্যান দের জন্য শেষ একটা খোরাক।

তবে খেলা ৯০ মিনিট পার হয়ে গেলে রিয়ালের-ই জেতার চান্স বেশি থাকবে। যদি না কেউ জেরারড হয়ে...

স্ট্যাটঃ (জানা জিনিস)

  •  এই মৌসুমে উচলে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি গোল ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর। ১২ ম্যাচে ১৫ টা। এদিকে তার পরেই সালাহ, ফিরমিনো আর মানে'র অবস্থান যথাক্রমে ১০, ১০ এবং ৯ গোল নিয়ে।
  •  জিতলে এটি হবে লিভারপুলের ষষ্ঠ ইউরোপিয়ান কাপ, কিংবা রিয়াল মাদ্রিদের ত্রয়োদশতম ইউরোপিয়ান কাপ।

ইউরোপে ইংল্যান্ডের সেরা দল বনাম ইউরোপে ইউরোপের সেরা দল। স্টেজ তো রেডি... আপনি?

 

স্টেজ তো রেডি... আপনি?

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন