বিশ্বকাপ স্কোয়াড এনালাইসিসঃ স্পেন

বিশ্বকাপ স্কোয়াড এনালাইসিসঃ স্পেন

এই বিশ্বকাপে কাগজে কলমে অন্যতম হট ফেবারিট স্পেন। ভিন্ন ভিন্ন পজিশনে তাদের ওয়ার্ল্ড ক্লাস প্লেয়ার আছে।

গত বিশ্বকাপেও তারাই ফেবারিট ছিলো । কিন্তু কিছুটা লজ্জাজনক ভাবেই গ্রুপ স্টেজ থেকেই বিদায় নিতে হয়। দেল বস্কের আন্ডারে ইউরোতেও আশানুরূপ পারফর্মেন্স হয়নি স্পেন এর। তাই দেল বস্ক দায়িত্ব ছাড়েন এবং দায়িত্ব দেওয়া হয় ইউথ টিম বিশেষজ্ঞ জুলেন লপ্তেগুই। তিনি নিজে খেলোয়াড়ি জীবনে স্পেন এর গোল্কিপার ছিলেন। পূর্বে স্পেনের  আন্ডার-১৯,২০,২১ দলের ম্যানেজার ছিলেন তিনি যা তার স্কোয়াড সিলেকশনে প্রতিফলিত হয়েছে ইয়াং ট্যালেন্টকে সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে।  স্পেনের সেই চিরাচরিত  পজেশন বেজড প্লেয়িং স্টাইলকেই তিনি কন্টিনিউ করেন।  কিন্তু তার দায়িত্ত্ব নেওয়ার পরের থেকে স্পেন একটা ম্যাচও হারেনি। প্রথম ১৬ গেমে ১২ জয় ।

এই ভয়ংকর স্ট্যাট দেখে যখন স্পেনের প্রতিপক্ষ হয়ে মাঠে নামবেন, তখন আরো আতংকের কারণ হবে স্পেনের গোলকিপার ডেভিড ডে হেয়া। তার ব্যাকাপ হয়ে থাকবেন নাপোলির পেপে রেইনা যিনি ওয়ার্ল্ড কাপ উইনিং স্কোয়াডেও ছিলেন,আর কেপা । রেইনার সিরিয়াতে এই সিজনে ১৭ টি আর ডে হেয়ার ইপিএলে আছে ১৫ টি, তাও ম্যানইউ এর মতো ডিফেন্সে।

স্পেনের ডিফেন্স অসাধারণ। সেন্টারব্যাকে থাকবেন পিকে আর রামোসের মতো লীডার। কিন্তু রামোসকে যখন আপনি খেলাবেন তার র‍্যাশ চ্যালেঞ্জ করে গেমের শুরুতেই লাল কার্ড খেয়ে বিদায় নেওয়ার রিস্কটা থেকেই যায়। সেক্ষত্রে পিকে বেশি রিলাইএবল । তাদের ব্যাকাপে থাকবে নাচো আর এজপিলিকুয়েতার মতো ভার্সেটাইল কিছু ডিফেন্ডার।

স্পেন লেফটব্যাকে জর্দি আলবা। অসাধারণ পেস আর গেম রীডিং এবিলিটি আছে তার   । সুতরাং  খুব দ্রুত ওভারল্যাপ করে প্লে বিল্ডআপে অংশ নিতে পারবে আর কাউন্টার এটাকে খুব দ্রুত ফলব্যাক করে ডিফেন্সে হাত দিতে পারবে। আর স্পেন এর পজেশন বেজড ফুটবলে ডিফেন্স নিয়ে চিন্তা করার প্রয়োজন পড়ে না।কিন্তু রাইটব্যাকে কারভাহাল সময়মতো সুস্থ না হলে  দলে ডাক পেতে পারেন আরসেনালের বেলেরিন। কারভাহাল বর্তমানের অন্যতম সেরা রাইটব্যাক , রবার্তোকে ভালো কমপ্লিমেন্ট করতে পারবেন।। বেলেরিনও তেমন ডাইনামিক রাইটব্যাক,তবুও লোপেতেগুই আরো ডিফেন্সিভ অপশন চাইলে রবার্তোকে সুযোগ দিতে পারেন।   স্পেনের ফুলব্যাকে ব্যাকাপ নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্নবিদ্ধ হতে হয়েছে।  প্রথমত লেফটব্যাকে মনরিয়ালকে নেওয়া হলো। মনরিয়াল একটা ডিফেন্সিভ মাইন্ডেড ফুলব্যাক যেখানে মার্কোস আলন্সো হচ্ছে চেলসির আরেকটা মারসেলো। ডিফেন্সিভ ফ্লেয়ার তার কম, সম্ভবত এই কারনেই তিনি বাদ পড়েছেন। আর রাইটব্যাকে কেনো সোসিয়েদাদ এর  অদ্রিজোলাকে পিক করা হলো , সার্জি রবার্তোকে কেন নয়। কিন্তু লোপেতেগুই ইয়াং ট্যালেন্টকে প্রিফার করেন এবং মাত্রাতিরিক্ত ভালো পার্ফরমেন্স না থাকলে সে ইয়াং অপশন টাকেই প্রিফার করবে। তাই অদ্রিওজোলার ব্যাপারে তার সাথে তর্কে না যাওয়াই ভালো।

মিডফিল্ডে এত অপশন আছে যে দুইটা ওয়ার্ল্ড ক্লাস মিডফিল্ড তৈরী করা যাবে অনায়াসে । রেগুলার স্টার্টার করবেন ইনিয়েস্তার সাথে বুস্কেটস তার প্রশ্ন থাকেনা। তবে তাদের মিডফিল্ডের প্রশ্নবিদ্ধ হবে বয়সের কারণে। দুইজনেই বয়সের সাথে লড়ছেন । তবুও তারা স্পেন এর গোল্ডেন এজ এর ফুটবলার, বয়সের প্রভাব নেই তাদের খেলায় । ইনিয়েস্তা এখনো গেম কন্ট্রোল করেন । আর বুস্কেটস দলের অ্যাংকর। তাই সে মার্কিং কাটা, বা প্রেস ভাঙ্গা, বা পাস করে প্রেসার রিলিজ করা, এই কাজগুলো অসাধারণভাবে করতে পারেন। তাদের সাথে নাম্বার সিক্স মিডফিল্ডার হয়ে খেলবে থিয়াগো আলকান্তারা । দারূন একটা সিজন কাটিয়েছেন। তিনি ড্রিবল করে মার্কার কে পেছনে ফেলতে পারেন, স্পেস কাজে লাগাতে পারেন আর এসিজনে ৯১ পারসেন্ট পাসিং একুরেসি তো আছেই, তাকে প্রেসিং করেও আটকানো যাবেনা। 

বুস্কেটস যখন ইঞ্জুরড ছিলেন দলের হাল ধরেছেন কোকে । জার্মানি আর আরজেন্টিনার বিপক্ষে সার্জির অভাব বুঝতে দেননি। জার্মানির বিপক্ষে ফ্রেন্ডলির কথা বিশেষভাবে বলা, যায়, জার্মানির মিডফিল্ডে ওইদিন ছিলেন ক্রুজ আর খেদিরা। ওইদিন খেদিরা ক্রুজকে ঠিকভাবে সাপোর্ট দিতে পাচ্ছিলো না, কারণ খেদিরা একজন ডেস্ট্রয়ার, এটা তার কাজও না। এই দূর্বলতা কাজে লাগিয়েছে ইনিয়েস্তা, থিয়াগো আর কোকে। মিডফিল্ডে প্রায় অচল হয়ে যাচ্ছিলো, মুলারকে ফরোয়ার্ডে রাখায় রক্ষা হয়। খেদিরার এক্সপারটিস কাজে লাগিয়ে যদি লংবলে খেলা যেত তাহলে হয়তো জার্মানি জিততো। পজেশনকেই যারা শিল্পের রূপ দিয়েছেন, তাদের সাথে পজেশন দিয়ে লড়াই খুব এফেক্টিভ হবেনা ।

বুস্কেটসকে দিয়ে যদি লোপেতেগুই কম্ফোর্টেবল না হন সাউল নিগেজকে ওই রোল দিতে পারেন। কোকেও স্টার্ট করতে পারেন অথবা ইনিয়েস্তাকে সাব করতে পারেন। আবার লোপেতেগুই যদি ৪-৪-২ ফর্মেশন ট্রাই করেন তবে দুই উইঙ্গে অ্যাসেন্সিও আর ভাস্কেজকে রাখতে পারেন। অ্যাসেন্সিও হচ্ছে রিয়ালে এসিজনের ব্রেকআউট স্টার। ইস্কোর মতো আরেকটা প্লেয়ার যে ড্রিবলিং , প্লেমেকিং আর ফিনিসিংএ পারদর্শী যাকে আপনি প্রেস অথবা মার্কিং করেও সহজে আটকাতে পারবেন না। আর ভাস্কেজ এসিজনে নাচোর মতোই নিজের পার্ফরমেন্স দিয়েই চান্স পেয়েছে। খুব সহজেই প্রতিপক্ষের ডিফেন্সকে ওপেনআপ করতে পারেন আর প্রয়োজন হলে ডিফেন্সেও সাহায্য করতে পারেন। মাঠে তার ওয়ার্করেট অসাধারণ। এদের দুইজনকে দিয়ে যতরকম এক্সপেরিমেন্ট করা যায় সব এই সিজনে রিয়াল বস জিদান ট্রাই করেছেন। আর এটা ভুললে চলবে না এরা সুসো , পারেহোর মতো মিডফিল্ডারদের পেছনে ফেলে এসেছে। হতে পারে এটা কোচের ইয়ুথ প্রীতি কিংবা ফরমেশনজনিত কারণ। 

কিন্তু মিডফিল্ডে এতো পটেনশিয়াল রেখে ৪-৪-২ লোপেতেগুই এপ্লাই করবেন না সম্ভবত।  ৪-৩-৩ খেলার আরেকটা কারণ ইস্কো আর সিলভা যাকে যথাক্রমে লেফট আর রাইট উইঙ্গে ডিপ্লয় করা হবে। এটার একটা চিন্তা হলো যদিও  ইস্কো স্পেনের হয়ে আগুন ফর্মে আছেন , স্পেন এক্ষেত্রে কোন ট্রেডিশনাল উইঙ্গার ছাড়াই খেলবে।   ইস্কোর ভালো ফর্মের কারণ তিনি যেই রোল চাচ্ছিলেন সেই রোলই পেয়েছেন। খেলা শুরু হলেই উইং থেকে ড্রপ করে একটা ফাইভ ম্যান মিডফিল্ড তৈরী করবে এরা। বল নিয়ে ডিবক্সে কাট ইন করবেন বা ড্রিব্লিং করে ফিনিস করবেন। আবার ইনভারটেড উইংগার রোল প্লে করে ফ্রিউয়েন্টলি পজিশন ইন্টারচেঞ্জ করবেন । ইস্কো আসলে এই পজিশনেই শাইন করে । আর চান্স বাড়ানোর জন্য দুই ফুলব্যাক তো আছেই। সুতরাং একে ৪-৩-৩ না বলে ৪-৩-২-১ বা ৪-৫-১ বলাই ভালো। 

কিন্তু মেইন সমস্যা এটাকে ।  মোরাতা দলে সুযোগ পাওয়ার জন্য মাদ্রিদ ছেড়ে চেলসি গিয়ে সিজনশেষে তারই দলে জায়গা হয়নি। ২৩ ম্যাচে ১৩ গোল করা মোরাতাকে আস্পাস পেছনে ফেলেছেন  এই সিজনে ৩২  ম্যাচে ২০ গোল করে। রদ্রিগো ও এই সিজনে ভালো পার্ফরমেন্স করেছেন। রদ্রিগো আর কস্তা ফ্রেন্ডলি ম্যাচে গোল করেছেন। কিন্তু ফ্যান আর অ্যানালিস্টরা এই এটাকে আশা পাচ্ছেন না। বিগ নেমস নেই তাই কি?

আমি মনে করি এটাই একটা শক্তি হতে পারে স্পেন এর । লোন স্ট্রাইকার খেলানো মানে ডিফেন্ডারদের সামনে একটা মূলা ঝুলিয়ে দেওয়া। এরা সারাদিন লোন স্ট্রাইকারকে চেজ করে বেড়াবে আর দিন শেষে ইস্কো এসে হ্যাট্ট্রিক করে যাবে। সাম্প্রতিক কোন বিশেষ ম্যাচের কথা মনে পড়ে কি ? 

তবে স্পেন এর একটা সেলেকশন প্রবলেম আছে। আমরা আগেই দেখেছি ইস্কো আর সিল্ভা কে স্টার্ট করালে স্পেন কোন ট্রেডিশনাল উইঙ্গার ছাড়াই খেলবে। ফিনিশিং এর দায়িত্ব পড়বে স্ট্রাইকার এর কাধে। এই জায়গায় যদি আস্পাস খেলালে অ্যাাটাকিং এ সমস্যা হবে কারন আস্পাস স্ট্রাইকার কম ফলস নাইন হিসেবে বেশি স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন। অ্যাসেন্সিও-আস্পাস-ভাস্কেজ এর একটা ফ্রন্ট থ্রি ক্লিক করবে আশা করা যায়। আরজেন্টিনার বিপক্ষে আস্পাস এক গোল করেছেন সুতরাং লোপেতেগুই তাকে তার রোল এডজাস্টও করতে পারেন। 

আর যদি ৪-৪-২ এ খেলাতে চান লোপেতেগুই সেক্ষেত্রে কস্তা কিংবা রদ্রিগোর সাথে সেকেন্ড স্ট্রাইকার হিসেবে আস্পাস কে খেলানো যাবে। তবে গ্রুপ পর্বেই এই এটাককে মুখোমুখি হতে হবে ইরান আর মরক্কোর রক সলিড ডিফেন্সের। 

স্পেনকে থামানোর পার্ফেক্ট ফরমেশন হলো ৩-৫-২ যেখানে দুইজনকে মার্কিংএ রাখার পরেও এক্সট্রা ডিফেন্ডার থাকবে বিপদ প্রতিরোধের জন্য। আর একজন হোল্ডিং মিডফিল্ডার থাকবে লং বল খেলে মিডফিল্ডকে অকেজো করে দেওয়ার জন্য। স্পেন পুরো ম্যাচে পজেশন নিয়ে থাকলেও শেষ পর্যন্ত ডিফেন্স ব্রেক করতে পারবে না। 

তাহলে ফর্মেশন দাড়াচ্ছে ৪-৩-৩ : ডে হেয়া-কারভাহাল-রামোস-পিকে-আলবা-ইনিয়েস্তা-বুস্কেটস-থিয়াগো-সিলভা-রদ্রিগো/কস্তা/আস্পাস-ইস্কো

কাগজে কলমে ওয়েল ব্যালেন্সড একটা দল। আর কোচ লপেতেগুই প্রচন্ড ভেবেই দল পিক করেছেন ।

তাদের প্রথম ম্যাচটা পর্তুগালের বিপক্ষে। হাইভোল্টেজ ম্যাচ দিয়েই ফেভারিটদের যাত্রা শুরু হবে।

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন