সাদাকালো যুগের ফুটবল ০৫ - দ্যা জয় অব দ্যা পিউপেল: গ্যারিঞ্চা

সাদাকালো যুগের ফুটবল ০৫ - দ্যা জয় অব দ্যা পিউপেল: গ্যারিঞ্চা

আজকাল অনেকেই মেসিকে ভিন্ন গ্রহের বানিয়ে দেয়। আজ এমন একজনের গল্প বলব যাকেও প্রথম এরকম ভীন গ্রহের মনে করা হত। তার ডাক নাম বলে শেষ করা যাবে না। " দ্যা জয় অব দ্যা পিউপেল " , 'দ্যা এঞ্জেল উইথ বেন্ট লেগ " এরকম অনেক কিছু বলেই তাকে সম্বোধন করা হত। তবে সবাই তাকে গারিঞ্ছা বলেই চিনে । কোন এক নাটকের মতই তার জীবনের কাহিনীটা ।

পাউ গ্রান্দে ( Pau Grande) তে গারিঞ্ছা ১৯৩৩ সালের ২৮ অক্টোবর জন্ম নেয়। তার দাদা দাদি দাস ছিল । গারিঞ্ছা নামের অর্থ ছোট পাখি। আসলেও ছেলে বেলায় তার স্বভাব ঐ রকমটাই ছিল ।
নামের সার্থকতা সে রেখেছিল।তার ছোটবেলায় সে দিন কাটিয়েছে নদীতে ঝাঁপিয়ে কিংবা পাখিদের পিছে ছুটে । খালি পা নিয়েই সারাদিন ছুটে বেড়াতো। ছোট বেলা থেকেই স্পাইনের সমস্যার জন্য তার ডান পা টা বাইরের দিকে বাঁকানো ছিল ও বাঁ পা -টি ডান পা থেকে একটু খাট ও ভিতরের দিকে বাঁকানো ছিল।

গল্পটা আমি অন্যান্য গল্পের মত করব না আজকে। তার জন্ম মৃত্যু এবং অর্জন অনেকেই জানে , না জানলেও ইন্টারনেট আছে ।আমি না হয় বলি কেন তাকে চিলির সংবাদপত্রে -" সে কোন গ্রহ থেকে এসেছে ?" বলা হয়েছে। আমি না হয় বলি কেন সে যাদুকর ছিল খেলার। আমি না হয় বলি কেন তাকে সর্বকালের সেরা ড্রিবলার বলা হয় ।

'দ্যা এঞ্জেল উইথ বেন্ট লেগ "- ছোট বেলাতেই ফুটবলের প্রতি তার ভালবাসা জন্মায়। নোংরা মাঠে সে এলাকার ছেলেদের সাথে সারাদিন খেলত। কে জানতো সেই বাঁকা পায়ের , শারীরিক ভাবে অক্ষম ছেলেটি একদিন ফুটবলের মাঠ দাপটের সাথে রাজত্ব করবে ?
তার খেলা ছিল অসাধারণ।মানুষ হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে রিওতে তার খেলা দেখতে আসত। সে নিজের আনন্দের জন্য খেলত। তার খেলাটা অসাধারণ হলেও সেটা মারাত্মক বিপদজনক ছিল বটে - তবে তা শুধু প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের জন্য , দর্শকদের জন্য আনন্দেরই ছিল বটে। প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডাররা কুকুর বিড়ালের পিছে যে ভাবে দৌড়ায় সে ভাবে তার পিছে দৌড়াতো আর দিন শেষে নাকানিচুবানি খেত। সে হুট করেই তার দিক পরিবর্তন করত কোন আলামত না দিয়েই , কখনও কখনও শর্ট নেবার নকল অভিনয় করত আবার কখনও কখনও শর্ট না মারার ভণিতা করে শর্ট মেরে বসত। তার মত করে এই খেলাটাকে কেও এতটা আনন্দের সাথে খেলত না । পুরো বিশ্বের কাছে শারীরিক ভাবে অক্ষম হলেও এই খেলাটায় সে সবার থেকে বেশি পারদর্শী ছিল।

গোল করা , রেকর্ড গড়া কিংবা টাকার জন্য সে ফুটবল খেলত না । ফুটবল ছিল তার আনন্দের উৎস, মাধ্যম। ১৯৫৮ সালের সুইডেনের
সাথে ফাইনালের আগে ওয়ার্ম আপ (প্রস্তুতি) ম্যাচ হিসাবে ফিওরেন্তিনা ( Fiorentina ) এর সাথে খেলে ব্রাজিল। সেই ম্যাচে দ্বিতীয় হাফের শেষ দিকে গারিঞ্ছা ভিয়োলা প্লেয়ার, Robotti (রোবত্তি) , Magnini(মাগনিনি) , Cervato (সারভাতো) কে কাটিয়ে যখন সে সামনে গোলরক্ষক Sarti (সার্টি) কে সামনে পেলো তখন সে ডামী মুভ করে । সামনে তখন শুধু খালি গোলবার । কিন্তু সে শর্ট নেয় নি । শর্ট না নিয়ে সে বরং অপেক্ষা করল Robotti (রোবত্তি) এর । রোবত্তি দৌড়িয়ে বারের সামনে জেতেই যে বল পাস করল বারের ভেতর। আনন্দ নেবার নতুন কোন রাস্তা তখন হয়তো পায় নি বলে । এবার বুঝুন আনন্দ তা কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ ছিল তার কাছে । ৪-০ গোলে পিছিয়ে পড়েও তখন তাদের সাপোর্টারা গারিঞ্ছা এর এই ম্যাজিক উপভোগ করেছিল ও তালী দিচ্ছিল।

এখনকার যুগের সবাই এমনকি প্রতিপক্ষ দলের সাপোর্টারাও যেমন রোনাল্ডিনহোর খেলা কে উপভোগ করত , গারিঞ্ছা এর খেলাও সবাই উপভোগ করত । এমনকি প্রতিপক্ষ দলের খেলোয়াড়রাও।

১৯৫৮ সালের সেমি-ফাইনাল। প্রতিপক্ষ তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন। তাদের দল তখন অনেক শক্তিধর ছিল ।দলের প্রান ছিল তখন তাদের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ এবং একমাত্র গোলরক্ষক জিনি ব্যালন ডি'অর পেয়েছিলেন লেভ ইয়াসিন(Lev Yashin)।
এই ম্যাচেই পৃথিবী দেখেছিল ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসের সবথেকে সেরা ৩ মিনিট। মাত্র ১৮০ সেকেন্ড সময়ের মধ্যেই গারিঞ্ছা কুটনেটভ (Kutnetzov) কে ৪ বার বিট করেছিল ও সাথে ভইনোভ (Voinov) কে পিছে ফেলিয়ে গটেনবার্গ (Gothenburg) - এর ৫০,০০০ উপস্থিত দর্শকদের হাসির উল্লাসে মাতিয়েছিল । ফ্রেঞ্চ লেজেন্ড গ্যাব্রিয়েল হ্যানোট পরে বলেছিল এটা ছিল ফুটবল ইতিহাসের সেরা তিন মিনিট।

এমনকি গারিঞ্ছা এমন একজন ছিলেন যিনি জানতেনও না তার প্রতিপক্ষ কে ? এমনকি কোন কোন ম্যাচ শেষে জিজ্ঞাসা করতেন ম্যাচ কি শেষ ? এমনকি এরকমটা ১৯৫৮ বিশ্বকাপের ফাইনালেও হয়েছিল সুইডেন এর সাথে ম্যাচে । তিনি জানতেনও না তার প্রতিপক্ষ কে আজকের ম্যাচে । ম্যাচ শেষে জিজ্ঞাসা করেছিলেন ম্যাচ কি শেষ? তিনি শুধু খেলেটা উপভোগি করে যেতেন।

 

১৯৫৮ সালে তিনি ব্রাজিলের হয়ে প্রথম বিশ্বকাপ জিতেন। এমনকি ১৯৬২ এর বিশ্বকাপও ব্রাজিলের হয়ে জেতেন কিন্তু এবার বলতে গেলে একলাই জিতিয়েছেন। পেলে ১৯৬২ সালে বিশ্বকাপের মাঝে আহত হবার পর পুরো দলকে একলাই টেনেছেন। সবাই এখন এরকম কথা ম্যারাডোনাকে নিয়ে বলে । কিন্তু কাজটা তিনি অনেক আগেই করে দেখিয়েছেন। পুরো বিশ্বকাপটাই ছিল গারিঞ্ছাময় । ১৯৬২ বিশ্বকাপের "গোল্ডেন বল " ও " গোল্ডেন বুট" দুটোই তিনি পান।

ইউরোপ থেকে অনেক প্রলোভন অফার আসার পরও তিনি বটাফিগো এর প্রতি লয়াল ছিলেন । তাদের হয়ে তিনি তিনটি "Campeonato Carioca" ট্রফি জিতেন । এছাড়াও তাদের হয়ে ৫৭৯ ম্যাচে ২৪৯ টি গোল করেন।

পেলে গারিঞ্ছাকে নিয়ে বলেছিল - “Garrincha was an incredible player, one of the best there has ever been. He could do things with the ball that no other player could do and without Garrincha, I would have never been a three-times world champion.”

ব্রাজিলের ঐতিহাসিক স্টেডিয়াম "মারাকানা" এর পুরনো লকার রুম (পরিচর্যা করা হয়েছে পরে ) এর একটির নাম "পেলে" অপরটির নাম রাখা হয় "গারিঞ্ছা "। তবে "গারিঞ্ছা" নামটা রাখা হয় হোম লকার রুম এর । ব্রাজিলিয়ান ও রিও বাসির এতটাই পছন্দের এক নাম।

১৯৮০ সালের রিও কার্নিভাল এ অংশ গ্রহণের জন্য তাঁকে অনুরোধ করা হলে তাঁকে সেদিন প্রদর্শনীর ভাসমান যানে মাতাল ও বোধশক্তিহীন অবস্থায় পাওয়া যায়। যেটা দেখে লক্ষ লক্ষ মানুষ চমকে যায়। সেদিন সেখানে পেলেও ছিলেন কিন্তু ভিআইপি বক্সে। পেলে তাঁকে ফুলের তোড়া ছুড়ে মাড়লেও সে সেটা পর্যন্ত খেয়াল করেননি। এতটাই মাতাল ছিলেন। গারিঞ্ছা এর এমন দশা দেখে পেলেকে টেলিভিশনে মাথা নাড়তে দেখা যায়।

তার মৃত্যুর দিন লক্ষ মানুষের লাইন লেগেছিল তার লাশের পিছনে ।
পরিবার , অপরিচিতদের ( মাতাল অবস্থায় অনেকেই তাঁকে চিনতে পারত না) দ্বারা তিনি অবজ্ঞিত হলেও পুরো ব্রাজিলবাসির ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এই গারিঞ্ছা।

তার কবরের উপরের পাথরে খুদাই করে লিখা আছে - “Here rests in peace the one who was the Joy of the People – Mané Garrincha.” (এখানে শান্তিতে শুয়ে আছে সে ,যে ছিল মানুষের আনন্দ ।"

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন