বিশ্বকাপ টিম প্রিভিউঃ জার্মানি

বিশ্বকাপ টিম প্রিভিউঃ জার্মানি


"ফুটবল এমন এক খেলা যেখানে ২২ জন খেলোয়াড় পুরো মাঠ দাপিয়ে বেড়ায়। আর দিনশেষে জার্মানির জয় হয়" 

গ্যারি লিনেকারের সেই বিখ্যাত উক্তিটি বিশ্বকাপ এলে আরোও বেশি সত্য প্রমাণিত হয়।

প্রতিবারই প্রতিপক্ষকে ধুমড়ে-মোচড়ে দেয় বিশ্বকাপের সবচেয়ে ধারবাহিক এবং সফল দলটি। বিশ্বকাপে সফল দল শোনে চমকে উঠলেন? চলুন দেখেনেই কেনো জার্মানি বিশ্বকাপের সফল দল।
বিশ্বকাপে জার্মানির রেকর্ডগুলা।

 

  •  ২০টি আসরের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক ১৮ বার বিশ্বকাপ খেলা (দুইবার বিশ্বকাপ বর্জন)
  • দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৪ বার চ্যাম্পিয়ন।
  •  সর্বোচ্চ বেশি ৪ বার রানার্সআপ।
  •  সর্বোচ্চ ১৩ বার সেমিফাইনাল।
  •  সর্বোচ্চ ৪ বার তৃতীয় স্হান।
  •  সর্বোচ্চ ১৬ বার কোয়ার্টার ফাইনাল।
  •  এক আসরে সর্বোচ্চ গোল।
  •  বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ম্যাচ।
  •  ব্যাক্তিগত সর্বোচ্চ গোল।

পরিসংখ্যান দেখে কি মনে হচ্ছে?

শিরোপার বিচারে অবশ্যই ব্রাজিল এগিয়ে তবে সর্বপরি চিন্তা করলে বিশ্বকাপে অবশ্যই জার্মানি সেরা,আর কেনো সেরা সেটা পরিসংখ্যানই বলে দেয়।

চলুন দেখে নেই জার্মানির বিশ্বকাপ স্কোয়াড।
২০১৮ বিশ্বকাপে জার্মানির ২৭ সদস্যের প্রাথমিক স্কোয়াডঃ


গোলরক্ষক : বার্নড লেনো, ম্যানুয়েল ন্যুয়ার, মার্ক আন্দ্রে টার স্টেগান, কেভিন ট্র্যাপ।


ডিফেন্ডার : মাথিয়াস জিনটার, জোনাস হেক্টর, জেরোম বোয়েটেং, ম্যাটস হামেলস, নিকলাস শুলে, জসুযা কিমিচ, মারভিন প্ল্যাটেনহার্ডট, আর্ন্তোনিও রুডিগার, জোনাথান তাহ।


মিডফিল্ডার/ফরোয়ার্ড : জুলিয়ান ব্র্যান্ডট, জুলিয়ান ড্রেক্সলার, মারিও গোমেজ, লিওন গোরেৎজা, ইকেই গান্ডোগান, লেরও সানে, সামি খাদিরা, টনি ক্রুস, থমাস মুলার, সেবাস্তিয়ান রুডি, মেসুত ওজিল, নিলস পিটারসেন, মার্কো রিউস, টিমো ওয়ের্নার।

তরুন আর অভিজ্ঞার মিশ্রনে পারফ্যাক্ট এক স্কোয়াড।
পঞ্চম শিরোপা তুলে নিতে কতটা নিজেরা কতটা সংবদ্ধ আর হট ফেভারিট সেটা বাছাইপর্বের রেজাল্ট দেখলেই বুঝার কথা।

বাছাইপর্বের ১০টি ম্যাচের সবকটিতেই জয়লাভ এবং সাথে ৬টি ক্লিনশীট!
১০ ম্যাচে ৪৩ গোল করার বীপরীতে গোল হজম করেছেন মাত্র ৪টি!
কেমন হতে পারে বিশ্বকাপে জার্মানি শুরুর একাদশ? 

ইয়াখিম লো ৪-২-৩-১ ফর্মেশনেই খেলাতেই পছন্দ করেন।


দেখে নেই ৪-২-৩-১ ফর্মেশনে কে কে হতে পারে লোর প্রথম পছন্দ।

গোলকিপারঃ নয়্যারের ইঞ্জুরির কারনে হয়তো বিশ্বকাপে জার্মান গোলবার সামলানোর দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন এই মৌসমে বার্সার হয়ে দুর্দান্ত খেলা স্টেগান,বার্সার হয়ে এই মৌসমে ৪৭ ম্যাচে ২৩টি ক্লিনশীট রাখেন। এছাড়া কনফেডারেশন কাপেও কোচের আস্হার প্রতিদান দিয়েছিলেন, বিশ্বকাপে ২২ বছরের এই তরুনের উপর চোখ বু্ঝে ভরসা রাখতে পারেন।

রাইটব্যাকঃলামের অবসরের পর জার্মানি ও বায়ার্ন ফ্যানদের লামের অভাব তিনি বুঝতেই দেননি।
গত ইউরো কাপ ও কনফেডারেশন কাপে দুর্দান্ত খেলা এই রাইটব্যাক বায়ার্নের জার্সিতেও ছিলেন দারুন ছন্দে।
ডিফেন্স সামলানোর সাথে দুর্দান্ত গতি আর ভিশন দিয়ে এ্যাটাকেও সমান তালে পাল্লা দেন! এ যেনো সেই যাদুকরি বামনের এক প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছেন জসুয়া কিমিচ। এই মৌসুমে বায়ার্নের হয়ে ৩৯ ম্যাচে ৬ গোলের সাথে ১৩ এ্যসিস্ট!
প্রতি ম্যাচে গড়ে এরিয়াল উইন ০.৭ এবং পাসিং একুরেসি ৯০.৬%
বিশ্বকাপে জার্মান রাইটব্যাকের দ্বায়িত্ব যে সঠিক হাতেই পরছে সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।

সেন্টারব্যাকঃ

"এ্যাটাক আপনাকে ম্যাচ জিতাবে কিন্তু ডিফেন্স আপনাকে টাইটেল জিতাবে"


শিরোপা জিততে হলে আপনার টাইট ডিফেন্স লাগবে নাহয় আপনি পার পাবেন না।
জার্মান ডিফেন্সের দুই সেনা একসাথে অনেকদিন ধরে খেলছেন, বুঝাপারাটা বেশ ভালো,হ্যা ঠিকই ধরেছেন আমি হুমেলস -বোয়াটেং জুটির কথাই বলছি।
এই মৌসুমে বোয়াটেং বায়ার্নর হয়ে ৩১ ম্যাচে ৮৬.১% পাসিং একুরেসি ঠিক রেখে ১.৬ এরিয়াল উইন হয় প্রতিম্যাচে,
সাথে ২ গোল ও ৩ এ্যসিস্ট।
ম্যাট হুমেলসও বায়ার্নের হয়ে ৪৪ ম্যাচে ৮৬.৬% পাসিং একুরেসি,২.৮ এরিয়াল উইন এবং ৪ গোল ও ১ এ্যসিস্ট করেন।


বছরের পর বছর জার্মান দুর্গ সামলে আসছেন এই জুটি,কাধে কাধ মিলিয়ে রুখে দিয়েছেন কত আক্রমন তার ইয়ত্তা নেই।
জার্মানির পঞ্চম বিশ্বকাপ জয়ের জন্য এই জুটির বিকল্প নাই ইয়াখোম লো হয়তো এইটাই ভাবছেন।

লেফট ব্যাকঃ অভিষেকের পর থেকেই জার্মানির লেফটব্যাকের ভরসার নাম হয়ে ওঠেছেন হেক্টর।

এই মৌসমে কোলনের হয়ে ২৪ ম্যাচে ২ গোল দুই এ্যসিস্ট করেন, প্রতি ম্যাচে গড়ে এরিয়াল উইন ২.৫টি।
হেক্টর ডিফেন্সের পাশাপাশি এ্যাটাকেও ভালো ভুমিকা রাখেন পরিসংখ্যান তারই প্রমাণ।

বক্স টু বক্স ড্রেস্ট্রয়ারঃবক্স টু বক্স ড্রেস্ট্রয়ারের কথা ভাবলেই যে কয়টা নাম আসে তারমধ্যে সামি খেদিরা অন্যতম সেরা, তিনি দলের হয়ে তেমন গোল করেন না,গোল করাও তার কাজ না ;টিমের সবচেয়ে সাইলেন্ট কিলার বোধহয় এই খেদিরাই।

এ্যাটাকে সহায়তার সাথে সমানতালে ডিফেন্সে সহায়তা করে পুরো ম্যাচকেই তিনি নিয়ন্ত্রন করেন। জুভের হয়ে এই মৌসমে ৪০ ম্যাচে ৯ গোল ও ৫ এ্যসিস্ট করেন, এড়িয়াল উইন ০.৮, পাসিং একুরেসি ৮৭.৮%।

আধুনিক ফুটবলে একজন বক্স টু বক্স ড্রেস্ট্রয়ারের গুরুত্ব অনেক,সম্পত্তি জার্মানির সাফল্যের পিছনের অন্যতম নায়ক এই ড্রেস্ট্রয়ার খেদিরা। গত বিশ্বকাপের মত এইবারও যে লোয়ের পছন্দের তালিকায় আছে সেটা বলার অপেক্ষা রাখেনা।

বক্স টু বক্স প্লেমেকারঃবলা হয়ে থাকে মিডফিল্ড হচ্ছে খেলার ইঞ্জিন;ইঞ্জিন দ্বারাই পুরা ম্যাচ নিয়ন্ত্রন করা হয় আর সেই ইঞ্জিনের মুল কারিগড় টনি ক্রুস।
টানা ৩ চ্যাম্পিয়ন লীগ জয়ের দ্বারপ্রান্তে দাড়িয়ে দ্যা স্নাইপার।

রিয়ালের হয়ে এই মৌসুমে ৪১ ম্যাচে ৫ গোল ও ৮ এ্যসিস্ট করেছেন, পাসিং একুরেসি ৯৩.৩! শট পার গোল ১.৭%
রিয়ালের হয়ে রয়েছেন দুর্দান্ত ফর্মে,রিয়ালের মাঝমাঠের প্রধান ভরসাকে বিশ্বকাপেও দেখা যাবে জার্মান মিডফিল্ডের গুরু দ্বায়িত্বে এই নিয়ে কোন সন্দেহ নাই।

লেফট উইংগারঃ  অপ্রত্যাশিতভাবে ম্যানসিটি তারকা লেরয় সানে জাতীয় দলের হয়ে গড়পড়তা প্রদর্শনীর জন্য বাদ পড়েন, বিশেষত অস্ট্রিয়ার সাথে প্রদর্শনীটা কফিনে পেরেক ছিল। ১৪ তে দলে জায়গা হয়েও চোটের কারণে বাদ যাওয়া মার্কো রয়েসের এবার সুযোগ নিজেকে প্রমাণ করার, হয়তো তার বন্ধুকে একটা ট্রিবিউটও দেওয়া। তবে তাকে লড়তে হবে ড্রাক্সলারের সাথে।

রাইট উইংগারঃবিশ্বকাপে জার্মানির সবচেয়ে বড় আস্হার নাম মুল্যার।

মুল্যার কে বলাহয় বিশ্বকাপের তারকা;গত দুই বিশ্বকাপে ১০ গোল করে সেটা সেটার প্রমান তিনি দিয়েই রেখেছেন। দলের প্রয়োজনে এ্যাটাকের যেকোনো পজিশনে খেলতে পারেন। বাছাইপর্বে ৬ এ্যাসিস্ট সহ ৫ গোল করেন মুল্যার এবং বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে এই মৌসুমে ৯ এ্যাসিস্টের সাথে ১০ গোল করেন। সুতরাং বলাযায় প্রতিপক্ষের জাল কাপাতে প্রস্তুত মুল্যার।

আরোও একটু মুল্যারময় বিশ্বকাপ দেখতে প্রস্তুত হয়ে থাকতে পারেন।

প্লেমেকারঃ আর্সেনালে হটাৎ করে যেনো নিজেই খেই হারিয়ে ফেলেছেন ওজিল,ফর্মটা বেশি ভালো যাচ্ছেনা ওজিলের।
নিজের খারাপ মৌসুমেও ৫ গোল আর ১০ এ্যসিস্ট!
বলের উপর ওজিলের অসাধারণ কন্ট্রোল, রেঞ্জ পাসে নিখুঁত নিশানা, নিখুঁত ক্রসিং ও দুর্দান্ত ভিশন তাকে করে তুলেছে একজন পারফেক্ট প্লে-মেকার।
আর্সেনালে নিজের ছন্দ হারিয়ে ফেললেও জাতীয় দলে সবসয়ই উজ্জল এই এ্যসিস্ট মাস্টার।
কে জানে হয়তো তার ভিশন কিংবা ডিফেন্স চেরা একটা পাসেই আবার শিরোপা নির্ধারন করে দেয় নাকি!

কোচের প্লেয়িং স্টাইলের সাথে জার্মান এ্যটাকের প্রথম পছন্দ যে ওজিল সেটা বলার অপেক্ষা রাখেনা,গত কয়েকবছর এটাই হয়ে আসছে।

স্টাইকারঃকনফেডারেশন কাপের আগে রব উঠেছিলো জার্মানি পেতে যাচ্ছে পরবর্তী ক্লোজা! কনফেডারেশন কাপে ৩ গোল করে দলকে চ্যাম্পিয় করার পাশাপাশি নিজে গোল্ডেন সু জিতে প্রমান করে দিলেন ক্লোজার অভাব বুঝতে দিবেননা।

গেলো মৌসুমে লিপজিগের হয়ে ৩১ ম্যাচে ২১ গোল এবং এই মৌসমে করেছেন ১৮ গোল।বিশ্বকাপে আরেকজন ক্লোজার অপেক্ষায়।

এছাড়াও রয়েছেন মার্কো রয়্যেস,ইকেই গুন্ডাগন,লিওনেল গোরেৎজকা,জুলিয়ান ড্রাক্সলার কিংবা মারিও গোমেজের মত অভিজ্ঞরা যারা যেকোনো মুহুর্তে নেমেই ম্যাচের চেহারা পাল্টে দিতে পারেন।

ওদের ফরওয়ার্ড - মিডফিল্ড এককথায় দুধর্ষ।আছে দেয়ালের মত ডিফেন্স আর গোলমুখে আছে ন্যয়ারের/স্টেগানের মত অতন্দ্র প্রহরি।সুতরাং প্রথম পরীক্ষা শক্তিশালী মিডফিল্ড পার হয়ে আসা, এবং দ্বিতীয় পরিক্ষা প্রতিপক্ষের মুহুমুহু আক্রমন সামাল দেয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন ডিফেন্সে - এই দুটিকে অভারকাম করেই তাদের বিরুদ্ধে জিততে হবে যে কোন দলকে।

আর সবচেয়ে বড় কথাহচ্ছে মাস্টার মাইন্ড লো ২০০৬ বিশ্বকাপের পর থেকেই এই দলটার সাথেই আছেন এবং স্কোয়াডে থাকা বেশিরভাগ প্লেয়ারই গত বিশ্বকাপ জয়ি,২০১০ বিশ্বকাপও খেলেছিলেন অনেকে।
সুতরং এই জার্মানিই যে এইবার শিরোপার অন্যতম দাবীদার সেটা আপনাকে স্বিকার করে নিতেই হবে।
এটা জার্মান টিম,বুল্ডেজারের আদলে গড়া জার্মান টিম যারা প্রতিপক্ষকে ধুমড়ে- মুচড়ে দিয়েই অভ্যস্ত। 

এদের কোন সুপারস্টার নেই,জার্মানরা একজনের দিকে তাকিয়ে থাকেনা জার্মানরা দ্যা টিম।

জার্মানি প্রতি বিশ্বকাপেই অটো হট ফেভারিট তাই আমি আর ফেভারেট তত্ত্ব আনছিনা।

কথায় আছে জার্মানরা বিশ্বকাপ খেললেই সেমিফাইনাল খেলে।
নিখুত কাউন্টার কিংবা লং পাস,কখনো বা অজিলের ডিফেন্স চেরা পাস আবার কখোনো সানের ভিসন কিংবা ক্রুশের মেশিনের মত পাস বিশ্বকাপে কিভাবে অন্যদলগুলা জার্মানিকে সামলায় কিংবা কিভাবে জার্মানরা প্রতিপক্ষের উপর দিয়ে বুল্ডো্জার চালায় সেটা দেখার অপেক্ষায়।

তবে কতটা সফল সেটা দেখতে হলে অপেক্ষায় থাকতে হবে আরোও এক মাস।

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন