নিকো কোভাচঃ ভবিষ্যৎ বায়ার্নের রূপকার?

নিকো কোভাচঃ ভবিষ্যৎ বায়ার্নের রূপকার?

বায়ার্ন মিউনিখের নেক্সট কোচ হতে যাচ্ছেন সাবেক ক্রোয়েশিয়ান অধিনায়ক নিকো কোভাচ। তাহলে কি কোভাচই হতে যাচ্ছেন হেইকেন্সের যোগ্য উত্তরসূরি? চলুন, একটু দেখে নেওয়া যাক।

কোনো ম্যানেজারের ট্যাক্টিকাল ফিলোসফি এবং কোচিং সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার আগে তার পাস্ট হিস্টোরি একটু জেনে নেওয়া দরকার। নিকো কোভাচের জন্ম ১৯৭১ সালে ওয়েস্ট বার্লিন, জার্মানিতে।পজিশনে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার হিসেবে খেলা এই ভদ্রলোক ক্লাব ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বেশি সময় খেলেছেন হার্থা বার্লিনে। বায়ার্ন মিউনিখে ছিলেন কিছুদিন। জাতীয় দল ক্রোয়েশিয়ার হয়ে ৮৩ ম্যাচে গোল পেয়েছেন ১৪টি। ২০০৯ সালে ৪৯১ টি ক্লাব ফুটবল অ্যাপেয়ারেন্স আর ক্রোয়েশিয়ার জাতীয় দলের অধিনায়কত্ব করার গর্ব নিয়ে বুটজোড়া তুলেন রাখেন জার্মানিতে জন্ম নেওয়া এই ভদ্রলোক।

ক্লাব ক্যারিয়ারে ম্যানেজিং শুরু করেন রেডবুল স্যালসবুর্গের একাডেমী কোচ হিসেবে। এরপর ক্লাবটির মূলদলের দায়িত্ব নেন। ২০১২ সালে ক্রোয়েশিয়া অনূর্ধ্ব-২১ দলের ম্যানেজার হন। ২০১৩ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত ছিলেন ক্রোয়েশিয়া জাতীয় দলের ম্যানেজার। ২০১৪ সালে, ব্রাজিল বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার ডাগআউটে ম্যানেজার হিসেবে দাঁড়িয়েছিলেন কোভাচ।

২০১৬ সালে ক্রোয়েশিয়ার দায়িত্ব ছেড়ে জার্মানক্লাব এইথেন ফ্রাঙ্কফুর্টের দায়িত্ব নেন ৪৬ বছর বয়সী এই ম্যানেজার।
এবার আসি, ফ্র‍্যাঙ্কফুর্টে তার কোচিং ফিলোসফি এবং ট্যাক্টিকাল বিষয়গুলো নিয়ে। এর জন্য, সবার আগে জেনে নিতে হবে যে কোভাচের ফ্র‍্যাঙ্কফুর্ট স্কোয়াডে আছেন কে কে। তারা হলেনঃ

গোলকিপারঃলুকাস হ্রাডেচি,জেন জিমারম্যান,লিওন বাটগে।

ডিফেন্ডার: কার্লোস সালসেদো, ডেভিড আব্রাহাম, সিমন ফালেতে, তালেব তাওয়াথা, ম্যাকতো হাসেভে, মার্কো রুস, নয়েল ক্নথে, দিয়েজ বিরুথার।

মিডফিল্ডার: কেভিন প্রিন্স বোয়াটেং, ওমর ম্যাস্ক্রেল, মিজাত গ্যাকিনোভিচ, মারিয়াস উলস, যেত্রো উইলিয়ামস, টিমোথি চ্যান্ডলার, ম্যাক্স ফ্যাবিয়ান, স্টেন্ডেরা, ড্যানি কস্তা, আয়মেন বার্কোক, গ্যালসন ফার্নান্দেজ, জোনাথেন ডি গুজম্যান, দায়িচি কামাদা, ম্যারিজান কাভার।

স্ট্রাইকার: সেবাস্তিয়ান হ্যালার, আনতে রেবিচ, ব্রানিমির, ড্যানি ব্লুম, অ্যালেক্সেন্ডার মিয়ের।

সত্যি বলতে, এদের মধ্যে মিয়ের, বোয়াটেং, গুজম্যান আর জিমারম্যান বাদে কারো নামই শুনি নাই কোনোদিন। এই ৪জন প্লেয়ারও যে একদম ওয়ার্ল্ডের টপ ক্যালিবারের প্লেয়ারদের সমতূল্য, তাও না।জার্মানির বুন্দেসলিগাকে,"এক ঘোড়ার রেস" বলা হয়। কথা সত্য। বায়ার্ন টানা ৭ বার গোল প্লেটটা জিতে নিজেদের সম্পত্তিই বানিয়ে ফেলেছে। তবে বায়ার্ন বাদে, অন্য দলগুলোর মধ্যে কম্পিটিশন ভালোই হয়।ডর্টমুন্ড, লেভারকুজেন, উলফবুর্গ,  লাইপজিগের মতো দলগুলোর মধ্যে কম্পিটিশন থাকে দলকে ইউরোপিয়ান স্টেজে তোলার। এর মধ্যেই, এমন আনকোরা এক একাদশ নিয়ে কিন্তু ঠিকই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন কোভাচ। এই সিজনের বেশ অনেকটা সময় টেবিলের ৪ নম্বরে থাকা দলটা এখন আছে ৭ নম্বর। আগের তিন সিজনে ৯ম, ১৬তম এবং ১১তম হওয়া ফ্রাঙ্কফুর্ট এর জন্য কিন্তু মোটেও খারাপ না। এ দিকে ডিএফবি পোকাল কাপের ফাইনালে উঠেছে কোভাচের জন্য। এমন স্কোয়াড নিয়ে এতো কিছু করা সত্যিকার অর্থে কৃতিত্বই।

এভারেজ ক্যালিবারের একটা স্কোয়াড নিয়ে লিগে ফাইট দিতে হলে আপনার চাই দারুণ মাস্টারপ্ল্যান, দুর্দান্ত টিম কম্বিনেশন, নিজের ট্যাক্টিক্সে অটল থাকার মানসিকতা এবং প্লেয়ারদের ইতিবাচক মনোভাব।কোভাচের ফ্রাঙ্কফুর্টে এগুলোর সবই বর্তমান।

নিকো কোভাচ, নিজের দলকে ৩-১-৪-২ অথবা ৩-৪-১-২ ফর্মেশনে মাঠে নামান। তার ফিলোসফি অনেকটাই প্রেসিং নির্ভর। ওয়াইড সাইডেড প্রেসিং এবং একজন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের উপস্থিতি তার ট্যাক্টিক্সকে করে তোলে আরো বেশি কার্যকর। এর ফলে, প্রতিপক্ষ সেন্ট্রালি এটাক করতে পারে না, তাদের ওয়াইড থেকে আক্রমণ করতে বাধ্য করা হয়।

 


প্রতিপক্ষ আক্রমনে গেলে অনেকটা ৫-৩-২ ফর্মেশনে চলে যায় ফ্রাঙ্কফুর্ট। দুই উইঙ্গার এবং সিএএম ডিফেন্সিভ ডিউটির জন্য নিচে চলে আসেন। নিচের তিন ডিফেন্ডারের সাথে ডিফেন্সিভ মিডও একদম ডিপলাইনে নেমে আসেন। ক্রসিং নির্ভর ম্যাচে কিছুটা হাইলাইনে থাকেন কোভাচের ডিফেন্ডাররা। এর ফলে হয় কি, প্রতিপক্ষের নাম্বার নাইন প্রায়শই অফসাইডের ফাঁদে ধরা পড়েন।
একবার বল রিগেইন করতে পারলেই ফ্রাঙ্কফুর্ট প্লেয়ারদের কাজ হলো হয় বলটা ডিফেন্স মিডিকে দিয়ে দেওয়া অথবা ডিফেন্স ছেড়ে ওয়াইডে চলে যাওয়া দুই উইঙ্গারের একজনকে বল প্রোভাইড করা। ওয়াইড উইঙ্গাররা অনেক সময় বল কেড়ে নিয়ে হলো সলো রান দিয়ে ক্রস তোলেন, অথবা একদম আনমার্কড ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারকে বলটা দিয়ে দেন। ডিফেন্স মিডি বলটা চিপ, লব, লং বল হিসেবে স্ট্রাইকে থাকা প্লেয়ারকে দেয় নতুবা নিজেই সলো রান নিয়ে উপরে আসে এবং অন্য কাউকে খুঁজে নেয় পাস দেওয়ার জন্য।

এটা তো গেলো ফ্রাঙ্কফুর্ট ডিফেন্সের কাহিনী। স্ট্রাইকে কি হয়? স্ট্রাইকে আরো বেশি প্রেসিং হয়। একজন সেন্ট্রাল এটাকিং মিডফিল্ডার আর দুইজন স্ট্রাইকার কখন মাঠে থাকে বুঝতে পারছেন?
হ্যাঁ, যখন দলটা হাইপ্রেসিং হয় তখন। ম্যানেজার এমন ফর্মেশনে দল সাজান যাতে প্রতিপক্ষের ডিফেন্সের মেন্টালিটিতে একটু হলেও নার্ভাসনেস ঢুকে পড়ে।

প্রতিপক্ষ দলের ডিফেন্স ডুয়োর সাইড পসিং লেন অফ করে দেন ফ্রাঙ্কফুর্টের দুই স্ট্রাইকার, ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের সাথে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন সেন্ট্রাল এটাকিং মিডফিল্ডার। অপনেন্ট ডিফেন্স ডুয়ো অথবা গোলকিপারের কাছে বল থাকার সময় জার্মান ক্লাবটির দুই ওয়াইড উইঙ্গার অনেকটা উপরে চলে এসে দুই ফুলব্যাককে মার্ক করেন। এতে, অপনেন্ট সেন্টারব্যাকদের পাস দেওয়ার আর কোনো সুযোগ থাকে না এবং তারা লং বল খেলতে বাধ্য হন। পজেশন ফিরে পায় ফ্রাঙ্কফুর্ট।

 


এই প্রেসিংয়ের আরেকটা বড় সুবিধা হলো, লো মোরালের বা বয়সে তরুণ অনেক ডিফেন্ডার এরর করে বসে। এতে ভয়াবহ জায়গায় বল পেয়ে যায় ফ্রাঙ্কফুর্ট স্ট্রাইকাররা এবং তারা গোলের সুযোগ পেয়ে যান।

কাউন্টার অ্যাটাকিং ফিলোসফিকে সম্মান করে বায়ার্নের পরবর্তী কোচ। দুই ওয়াইড উইঙ্গার প্রায়ই বল নিয়ে উপরে উঠে আসেন ডিফেন্স থেকে এবং পেনাল্টি বক্সে থাকা ফ্রাঙ্কফুর্ট প্লেয়ারকে বল প্রোভাইড করেন। আবার সেন্টার এটাকিং মিড থেকেও বলের জোগান পেয়ে থাকেন হ্যালার,রুবিচরা।

বায়ার্ন মিউনিখ ফ্যানদের জন্য খুশির ব্যাপার হলো, তাদের খেলার ফিলোসফি অলমোস্ট সেইম। এবং বায়ার্ন ফ্যানদের সৌভাগ্যের ব্যাপার হলো, তাদের স্পোর্টিং ডিরেক্টর হিসেবে আছেন ক্লাবটির সাবেক একজন লিজেন্ড যিনি নিজ দলের খেলা এবং ওয়েল্ফেয়ার, দুইটাই খুব ভালো বুঝেন। নিকো কোভাচকে আপোয়েন্ট করা সেটারই জানান দেয় আরেকবার।

 

 

বায়ার্ন মিউনিখ,হেইকেন্সের অধীনে ৪-৩-৩ অথবা ৪-১-৪-১ ফর্মেশনে খেলে থাকে। ওয়াইড সাইডে ভয়াবহ প্রেসিং করার সামর্থ্য রাখেন রোবেন ও কোম্যান। নিচে এই কাজটা পারেন ওয়ার্ল্ডের অন্যতম সেরা দুই ফুলব্যাক কিমিচ ও আলাবা। সেন্ট্রালি এটাক করার জন্য আছেন লেভান্ডাস্কি, মুলারের মতো দুর্দান্ত প্লেয়ার। মিডে থেকে খেলা কন্ট্রোল করার জন্য ভিদাল, থিয়াগো আছেন। সেন্টার এটাকিং পজিশনে, কোভাচ পাচ্ছেন হামেসকে। ডিফেন্সে বোয়াটেং, হামেলস আর মার্টিনেজ কোভাচের ট্যাক্টিক্সে ইজিলি মানিয়ে নেওয়ার কথা, কেননা এদের হাইপ্রেসিং খেলার অভ্যাস আছে। আর নয়্যারের কথা আলাদা করা বলার দরকার নাই, ইঞ্জুরীতে যাওয়ার আগে তিনিই ছিলেন ওয়ার্ল্ডের নাম্বার ওয়ান।

তো কেমন হতে পারে কোভাচের বায়ার্ন? আমার মতে ফর্মেশন হবে ৩-১-৪-২ অথবা ৪-১-৪-১।কোভাচের ৩-১-৪-২ এ ফর্মেশন হবে:

নয়্যার

মার্টিনেজ-বোয়াটেং-হামেলস

ভিদাল

কিমিচ-থিয়াগো-হামেস-আলাবা

মুলার-লেভান্ডস্কি

 

সেক্ষেত্রে হয়তোব কোম্যান,রোবেন বেঞ্চড হবেন।আমার কে জানে, ৪-১-৪-১ এ সবাই একসাথেও খেলতে পারেন।

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন