লিভারপুল বনাম রোমাঃ ট্যাক্টিকাল অ্যানালাইসিস

লিভারপুল বনাম রোমাঃ ট্যাক্টিকাল অ্যানালাইসিস

রোমার ঘরের মাঠ, সমর্থক, স্টেডিয়ামের আবহ সব কিছুর সমর্থন নিয়েই ঘরের মাঠ স্তাদিও অলিম্পিকোতে লিভারপুলের বিপক্ষে মাঠে নেমেছিল রোমা। আগের লেগে ৩ গোলে পিছিয়ে থাকা রোমা শুরু থেকেই নিজের সবশক্তি নিয়ে ঝাপিয়ে পড়েছিল নিজেদের মাঠে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করতে। ৪-২ গোলে জিতেও দুই লেগ মিলিয়ে ৭-৬ গোলে হেরে ১ গোলের আক্ষেপ নিয়েই বাড়ি ফিরতে হল তাদের।

প্রথমেই আসি লাইনআপ এবং ফরমেশনে। ইউসেবিও রোমাকে এদিন ৪-৩-৩ ফরমেশনে মাঠে নামান। ব্যাক ফোরে কোলারভ, ফাজিও, মানোলাস, ফ্লোরেঞ্জি। মিডে নাইনগোলান, ডি রসি, পেলেগ্রিনি। ফ্রন্ট থ্রিতে শারাওয়ে, জেকো, প্যাট্রিক।

ক্লপও লিভারপুলকে ৪-৩-৩ ফরমেশনে সাজান যেখানে ব্যাক ফোরে রবার্টসন, লভ্রেন, ভ্যান ডাইক, আর্নল্ড। মিডে মিলনার, হেন্ডারসন, উইনাল্ডাম। ফ্রন্ট থ্রিতে মানে, ফিরমিনো, সালাহ।

ক্লপ শুরু থেকেই জানতেন রোমা কিক-অফের সাথে সাথে আক্রমণ শুরু করবে। সে অনুসারে ৪-৩-৩ ফরমেশনকে সাজান যেখানে মিডফিল্ড ট্রিও একদম ডিপে নেমে বলতে গেলে ডিফেন্সের সাথেই খেলা শুরু করে রোমার এ্যাটাক নিউট্রালাইজ করার জন্য। ব্যাক ফোরে ৪ জন, মিডে ৩ জন। ফ্রন্ট থ্রি কোথায়? ফ্রন্ট থ্রি একদম উপরে রোমা ডিফেন্ডারের ঘাড়ের উপর সবসময় নিশ্বাস ফেলেছে যাতে রোমা বল হারালেই দ্রুত কাউন্টার এ্যাটাকে ওঠা যায়। আবার রোমা যখন এ্যাটাকে উঠছিল তখন সাদিও মানে কে ডিপে ড্রপ করা হয়েছিল ডিফেন্সিভ হেল্প + কাউন্টার এ্যাটাক তৈরি করার জন্য। দেখা যাবে ফার্স্ট হাফে মানে নিজেও ডিপে বল দখলে অংশ নিয়েছে আবার রোমা বল হারালে দ্রুত বল নিয়ে উপরে উঠে কাউন্টার এ্যাটাকে গিয়েছে।

 অপরদিকে রোমার স্ট্র্যাটেজি ছিল সোজাসাপ্টা। প্রতিবারই বল পেলে বলকে দুই উইংয়ে ওয়াইড পজিশনে রাখার চেষ্টা, তারপর তাদের টার্গেট্ম্যান জেকোর কাছে ওয়াইড এরিয়া থেকে ক্রস। রোমার এ্যাটাকের সময় লিভারপুলের মেইন থ্রেড ছিল অভারল্যাপ করা রোমার দুই ফুলব্যাক এবং নাইনগোলান। নাইনগোলানকে ইউসেবিও এ্যাটাকের সময় ফ্রি রোল দিয়ে দিয়েছিলেন ক্রসের সময় যাতে পজিশন সুইচ করে ডিফেন্ডারদের কনফিউশনে ফেলা যায়। প্রথম দিকে ডিফেন্ডাররা ঠিকমত মার্ক করতে পারছিলেন না কে ক্রস করবে ওয়াইড পজিশনে বল গেলে।

দুই ফুলব্যাক অভারল্যাপ করে খেলার সুফল যেমন আছে তার কুফল ও তেমন আছে। আপনার ফুলব্যাকরা যদি আক্রমণের সময় ঠিকমত ট্র্যাকব্যাক না করতে পারে গোল অবশ্যম্ভাবী। আর বিশেষ করে বিপক্ষ দলের এ্যাটাকিং ট্রিও যখন সালাহ-ফিরমিনো-মানে তখন গোল খাওয়া সময়ের ব্যাপার। প্রথম অর্ধে ঠিক এ সুযোগটাই বারবার কাজে লাগিয়েছে লিভারপুল।

প্রথম গোলের কথাই ধরুন। নাইনগোলানের বাজে পাসিং ফাজিওর কাছে যাওয়ার বদলে চলে যায় ফিরমিনোর কাছে। ফিরমিনোর পাশে সালাহ আর মানে। সামনে ফাজিও আর মানোলাস। দুই ফুলব্যাক ট্র্যাকব্যাক করতে না পারায় ৩ বনাম ২ পজিশন তৈরি হয়ে যায় মূহুর্তে। সেখান থেকে মানের গোল।

লিভারপুল ১-০ রোমা!!!!!

কিছুক্ষণ পরেই অবশ্য মিলনারের আত্মঘাতী গোলে সমতায় ফেরে রোমা।

রোমা ১-১ লিভারপুল!!!

এতক্ষণ ধরে লিভারপুলের যে ট্যাক্টিক্স দেখলাম ঠিক একই ট্যাক্টিক্স রোমাও এপ্লাই করে প্রথমার্ধে তবে আরো সুন্দর এবং গোছানোভাবে। রোমাও লিভারপুলের মত তাদের একজন উইংগারের সহায়তা নিচ্ছিল ডিফেন্ড করতে। তাদের মিডও ডিপে ড্রপ করে ডিফেন্সে হেল্প করতে, কিন্তু একটু অন্যভাবে। লিভারপুলের যখন যে পাশে বল যায়, দুইজন মিড সে পাশে প্রেস করা শুরু করে আর বাকি একজন মাঝখানে অবস্থান নেয়, যাতে বল হারালে কাউন্টার এ্যাটাক করতে পারে। আরও একটি কারণ হল তাদের উইংগারদের জন্য স্পেস দেয়া যাতে তারা লিভারপুলের ফুলব্যাকদের অভারল্যাপিং কভার দিতে পারে। 

২০ মিনিটের পর থেকে লিভারপুল নিজেদের হাফে বল উইন করলে হেন্ডারসনের কাছে বল ব্যাক করার চেষ্টা করে, হেন্ডারসন থেকে দুই ফুলব্যাকের কাছে বল ডিস্ট্রিবিউট হয় যাতে ফুলব্যাকরা দ্রুত অভারল্যাপ করে ওয়াইড পজিশনে কুইক কাউন্টার এ্যাটাক করতে পারে। দুই ফুলব্যাক এর একজন উপরে উঠলে সালাহ মিডে ড্রপ করে ডিফেন্সিভ শেপ ঠিক রাখার জন্য।

লিভারপুলের ২য় গোলটি আসে ২৫ মিনিটের সময় কর্নার থেকে। কর্নার কিক নেয়ার সময় বক্সের ভিতর রোমার খেলোয়ার মার্কিংয়ে ছিলেন ৮ জন। এর ভিতর ৬ জনই একসাথে নিজেরা জটলা পাকিয়ে রেখেছিলেন কাওকে মার্ক না করেই!! পিছে যে দুইজন লিভারপুল প্লেয়ার ছিলেন তাদের মার্কিংয়ে ছিলেন একজন রোমার খেলোয়াড় আর গোলদাতা উইনাল্ডামের কোন মার্কারই ছিলেন না।

ফলাফল লিভারপুল ২-১ রোমা!!!

২য় গোলের পর প্ল্যানে একটু বদল আনেন ক্লপ। রোমাকে এবার ডিফেন্ডিংয়ের সময় মিডফিল্ডকে ডিপে ড্রপ না করে ম্যান টু ম্যান প্রেস করাতে থাকেন যাতে কোন প্লেয়ার ফরওয়ার্ড পাস না দিতে পারে। এবং সালাহকে ডিপে নিয়ে আসেন যাতে সুইচ প্লে করা সম্ভব না হয় রোমার জন্য।

এই সিজনে লিভারপুলের যে জিনিসটা সবচেয়ে ভাল লাগে আমার তা হল তাদের ফরমেশন বজায় রাখা। কোন একজন প্লেয়ার যদি বিপক্ষকে প্রেস করতে গিয়ে আউট অফ পজিশন হয়ে যায় খুব দ্রুত তার পজিশনে ট্র্যাকব্যাক করার গাটস এই লিভারপুলের প্লেয়ারদের আছে। মাঠে খেলোয়াররা প্রচুর এনার্জিটিক বিশেষ করে কালকের ম্যাচে উইনাল্ডামের পারফরম্যান্সের কথা আলাদা করে বলতেই হয়।

হাফ টাইম এভাবেই শেষ হয়। লিভারপুল ২-১ রোমা।

 সেকেন্ড হাফেও শুরু থেকে নাইনগোলান ওয়াইড পজিশন থেকে ট্রাই করেন আগের মত জেকোকে ক্রস করার। এবার বল ওয়াইড পজিশনে গেলেই লিভারপুলের পুরো মিডফিল্ড বক্সে নেমে চেষ্টা করেছে বক্স জ্যাম করার যাতে রোমার পক্ষে ক্রসগুলো উইন করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

এল শারাওয়ে আরও ওয়াইডে খেলা শুরু করলেন যাতে আর্নল্ডকে বিট করতে পারলেই বক্সে রান দেয়া যায়। আর্নল্ড ইন্টারসেপশন মিস করলেই সামনে ব্যাক ফোরের পিছনে স্পেস ওপেন হয়ে যাচ্ছে। এল শারাওয়ে আর্নল্ডকে বিট করলেনও। সিম্পল মিস্টেক। কিন্তু ফলাফল অনেক বড়। জেকোর গোল।

লিভারপুল ২-২ রোমা!!

গোল সমান করার পর রোমা সব উজাড় করে সর্বশক্তিতে আক্রমণ শুরু করে। হাতে মাত্র ৩০ মিনিট সময়। লিভারপুলও আশ্চর্যজনক ভাবে তাদের ব্যাক ফোরে ৪ বনাম ৪ এ্যাটাক করতে দিতে থাকে। রোমা তাদের মিডফিল্ডকে আরো ডিপে ড্রপ করে দেয় যাতে আরো বেশি সময় বলের কন্ট্রোল পাওয়া যায়। ফলে লিভারপুল মিডফিল্ড এরিয়া অনেকটা নো ম্যান্স ল্যান্ডের মত দেখায়। বিরান এলাকাবলতে গেলে মূহুর্তের মধ্যে আরেকটি গোল হয়েই যাচ্ছিল।

নাইনগোলান এদিকে পজিশন সুইচ করে খেলতে থাকে যাতে কোনভাবেই তাকে ট্র্যাক করা না যায়। নাইনগোলানের পজিশন সুইচ, ৪ বনাম ৪ এ্যাটাক কোনকিছুই গোল আনতে পারছিল না। তখনই মানোলাসকে ইউসেবিও উপরে পাঠান। মানোলাসকে লিভারপুল মিডফিল্ড কোনভাবেই ট্র্যাক করতে পারছিল না। মানোলাস বক্সের সামনে থেকে মুভমেন্ট করায় মিডফিল্ড লাইনটাই এলোমেলো হয়ে যায়।

এতেও গোল না আসায় জেকো এবার নিচে নেমে এসে খেলতে থাকেন যাতে বলের যোগান বেশি করে পান। রোমা প্রেসিং বাড়াতে থাকার পরও লিভারপুল তাদের ৪-৩-৩ শেপ চেঞ্জ করেনি। ফলে জেকো নিচে নামায় মিডে অভারলোড তৈরি হয়।

ক্লপ এ  ম্যাচে শত চেষ্টা করেও ওয়াইড পজিশন থেকে ক্রস বন্ধ করতে পারেননি। রোমা একটার পর একটা উপায় বের ঠিকই করে নিয়েছে। ক্লপ এক বুদ্ধিদীপ্ত কাজ করলেন। ভ্যান ডাইককে দায়িত্ব দিলেন জেকোকে মার্ক করতে। ফলে এরিয়াল থ্রেট  একদম কমে আসল ক্রস থেকে।

৮০ মিনিটের পর ক্লপ মানে কে তুলে ক্লাভান কে নামিয়ে ৪-৩-৩ ফরমেশন থেকে ৫-৩-২ ফরমেশনে শিফট করেন যাতে লিভারপুল হাই ডিফেন্সিভ লাইন রাখতে পারে, ৫ জনের ব্যাক ডিফেন্স আরো বেশি ডিফেন্সিভ এরিয়া কভার দিতে পারবে, তার মানে এরিয়াল থ্রেট কমবে ক্রস থেকে। সামনে ৩ জনের মিডফিল্ড লাইনের কাজ হল রোমা মিডফিল্ডারদের প্রেস করে যাওয়া যাতে তারা বল নিয়ে দাড়ানোর ও সুযোগ না পায়।

ইউসেবিও ২ মিনিটের ভিতর ছোট্ট পরিবর্তন করলেন। লিভারপুল মিডের হাই প্রেসিং থেকে বাঁচতে রোমার মিডকে আরো ডিপে পাঠিয়ে দিলেন বল কন্ট্রোলের জন্য। যাদের কাজ ছিল পুলের ফ্রন্ট টু এবং মিডের মাঝে স্পেস খুজে বের করা যাতে সরাসরি বল ফ্রন্টলাইন প্লেয়ারদের কাছে চলে যায়।

এবার লিভারপুল প্লেয়াররা করলেন আরো বড় ভুল। লিভারপুল ধরেই নিয়েছিল রোমা বাকিসময় ক্রস করে গোলের চেষ্টা করবে। লিভারপুলের ব্যাক ফাইভ পুরো বক্সকে প্যাক করে ফেলে যখন রোমার প্লেয়াররা বক্সের আশেপাশে আসছিল। মিডও ক্রস ডিফেন্ড করতে নিচে নেমে যায়। ৮ জন প্লেয়ার বক্সের ভিতরে। যার ফলে নাইনগোলান বক্সের মাথায় সময় এবং স্পেস দুটোই পায় শট নেয়ার জন্য। শট......

রোমা ৩-২লিভারপুল!!!!

একই ভাবে প্রেশার রিলিজ করে শেষ মূহুর্তে পেনাল্টি উপহার দেয় লিভারপুল। ৯৪ মিনিটের পেনাল্টিতে লিভারপুল ২-৪ রোমা।

খেলা শেষে লিভারপুল ২-৪ রোমা।

লিভারপুল কোচ ক্লপ যদি ঠিক এভাবে প্ল্যান বি, সি, ডি ছাড়া ফাইনালে নামেন তাহলে ফাইনালটি লিভারপুলের জন্য হতাশায় রূপ নিলেও নিতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সিদ্ধান্ত না বদলানো, ফরমেশন চেঞ্জ, কাউন্টার ট্যাক্টিক্স সব কিছুর অভাব চোখে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে এ ম্যাচে।

ইউসেবিও সম্বন্ধে বলা যায় এ সল্প রিসোর্স নিয়ে তিনি যেভাবে চমক দেখালেন এ চ্যাম্পিয়নস লীগে, তার ট্যাক্টিক্স, মাইন্ডসেট, প্লেয়ার ম্যানেজমেন্ট, অপনেন্ট সম্পর্কে প্ল্যানিং, খেলার মাঝে ডিসিশন, অদূর ভবিষ্যতে বড় কোন দলের দায়িত্বে থাকলেও অন্তত আমি অবাক হব না।

 

 

 

 

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন