কোন ভুলে ওল্ড ট্র্যাফোর্ড বিদায় রাঙাতে পারলেন না ওয়েঙ্গার? ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড বনাম আর্সেনালঃ ট্যাক্টিকাল এ্যানালাইসিস

কোন ভুলে ওল্ড ট্র্যাফোর্ড বিদায় রাঙাতে পারলেন না ওয়েঙ্গার? ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড বনাম আর্সেনালঃ ট্যাক্টিকাল এ্যানালাইসিস

আর্সেন ওয়েঙ্গারের আর্সেনালের ম্যানেজার হিসেবে শেষ ইউনাইটেড ভ্রমণ। স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন থেকে  বিদায়ী উপহার, মরিনহো, ইউনাইটেডের দর্শকদের করতালির মাধ্যমে বিদায়ী ভ্রমণ শুরু করেন ওয়েঙ্গার। তবে শেষটা সুখকর হয়নি। ২-১ গোলের হার নিয়েই ওল্ড ট্র্যাফোর্ড থেকে ফিরতে হল ওয়েঙ্গারকে। আসলেই কি ওয়েঙ্গারের ব্যার্থতা ছিল এ ম্যাচে, নাকি মরিনহো তার ট্যাক্টিকাল ব্রিলিয়ান্সে ম্যাচটি বের করে নিয়েছেন। সেটি নিয়েই আজকের ট্যাক্টিকাল এ্যানালাইসিস।

ফরমেশন ও লাইনআপঃ

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডঃ (৪-৩-৩) ডি গিয়া, ভ্যালেন্সিয়া, লিন্ডেলফ, স্মলিং, ইয়াং, হেরেরা, ম্যাটিচ,পগবা, লিনগার্ড, লুকাকু, সানচেজ।

আর্সেনালঃ (৪-২-৩-১) ওসপিনা, বেলেরিন, চ্যাম্বারস, ম্যাভ্রোপানোস,কোলাসিনাক, আইওবি, নাইলস, গ্রানিত জাকা, নেলসন, অবামেয়াং, মিখিতারিয়ান।

কাগজে কলমে ইউনাইটেড কে ৪-৩-৩ দেখালেও মাঠে তাদেরকে ৪-১-৪-১ দেখাচ্ছিল। মরিনহো মূলত ব্যাক ফোর থেকে বল মিডফিল্ডে মুভ করে এ্যাটাকিং অপরচুনিটি তৈরি করে পজেশন বেজ ফুটবল খেলাতে চেয়েছিলেন যেখানে ম্যাটিচ হোল্ডিং মিডফিল্ডারের রোল পালন করছিলেন। ব্যাক ফোর থেকে নিজেদের হাফে পজেশন ধরে রেখে এ্যাটাকে যাওয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল আর্সেনাল প্লেয়ারদের ফ্রাস্টেশনে ফেলা এবং তাদেরকে খুব তাড়াতাড়ি ক্লান্ত করা কারণ আর্সেনাল সাধারণত পজেশন বেজড টীম।

আবার যখন আর্সেনাল আক্রমণে উঠছিল তখন ইউনাইটেডের ফরমেশন শেপ দাঁড়ায় ৪-৫-১, যেখানে ৩ সেন্ট্রাল মিড আর্সেনালের মিডকে ম্যান টু ম্যান মার্ক করে রাখে এবং অপর  দুইজন প্রেস করতে থাকে যার পায়ে যখন বল যায়।

কিছুক্ষণের মধ্যেই ওয়েঙ্গার দাদু ব্যাপারটা ধরতে পারে। এবার আর্সেনাল উল্টো আরও হাই প্রেস করতে থাকে ইউনাইটেড ডিফেন্ডারদের যাতে তারা পজেশন ধরে না রাখতে পারে। ওয়াইড এ্যাটাকিং মিডফিল্ডাররা ডিফেন্ডারদের বিশেষ করে ফুলব্যাকদের প্রেস করতে থাকে, আর এদিকে আইওবি এবং অবামেয়াং পাসিং লেন অফ করে দেয় যাতে ডিফেন্ডাররা লং বল দিতে বাধ্য হয়।

আর্সেনালের হাই প্রেসিংয়ের আরও একটি কারণ হল ম্যাটিচ। তার পজিশনে সে অনেক স্পেস পাচ্ছিল বল নিয়ে আগানোয়, বল পাসিংয়ে। হাই প্রেসের ফলে ম্যাটিচ সে সময় বেশির ভাগ বল গোলকিপারের কাছে ব্যাক পাস দিতে বাধ্য হয়। 

তারপরও ইউনাইটেড তাদের ৪-৫-১ ফরমেশন স্ট্যাবল রেখে ডিফেন্ড করে যায় যেখানে উইংগাররা মিডের চেয়ে একটু উপরে ছিলেন যাতে বল দখলে আসলেই কুইক কাউন্টার এ্যাটাক করা যায়। অবশ্য এর আরেকটি সুবিধাও ছিল। জাকা কে সেন্ট্রাল মিডে পাস দেয়া ছাড়া দুই পাশে পাস দেয়ার সুযোগ নষ্ট হয়ে যায়। মানে জাকা নিষ্ক্রিয়।


এখানে তখন জাকা একটা কাজই করতে পারত। জাকা একটু ডিপে নেমে আসল। আসার ফলে ম্যাটিচ তাকে প্রেস করতে পারে নাই।  আর ইউনাটেডের ন্যারো ব্যাক ফোরের কারণে দুই উইংয়ে যে গ্যাপ তৈরি হয়েছে সেখানে সে লং বল সাপ্লাই দিয়ে গ্যাপকে এক্সপ্লয়েট করতে পারত। যা সে করতে পারেনি

 ইউনাইটেড ঠিক এমন সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিল। আর্সেনাল তাদের পজেশন রিস্ক নিয়ে হাই প্রেসিং চালিয়ে যেতে থাকে। বলের দখল হারালে ইউনাইটেড কুইক কাউন্টার এ্যাটাকে উঠে 3 vs 4 সিচুয়েশন সৃষ্টি করে। যেখান থেকে পগবার গোল।
ইউনাইটেড ১-০ আর্সেনাল!!!

আস্তে আস্তে জাকা আর্সেনাল এ্যাটাকে আরও প্রভাব রাখতে শুরু করে। তখন ম্যাটিচ জাকাকে ফোর্স শুরু করে, আরও টাইট কভারিং শুরু করে তাড়াতাড়ি বল মুভমেন্ট আর পাসিংয়ের জন্য, যাতে তার বলের উপর নিয়ন্ত্রন কমে আসে, সুযোগ কম পায়।

ম্যাটিচ জাকাকে মার্ক করায় ডিফেন্স আর মিডফিল্ড লাইনের মাঝের গ্যাপকে কাজে লাগানোর জন্য নেলসন সেই ফাঁকা পজিশনে চলে যায়মিড আর ডিফেন্সের ফাঁকা জায়গাকে কাজে লাগাতে থাকে নেলসন, আর নেলসনের জায়গা কভার দেয়ার জন্য বেলেরিন অভারল্যাপ করে উপরে উঠে আসে।

এবার ইউনাইটেড নিয়মিতভাবেই দুই উইং দিয়ে বল শিফট শুরু করল যেখানে দুই ফুলব্যাক বারবার পজেশন রিস্ক নিয়ে বিপদজনক ভাবে বারবার উপরে উঠছিলএকটা ভুল আর্সেনালের জন্য  স্পেস এবং গোল করার টাইম দিতে যথেষ্ট।

এরকম একটা টাইট গেমে যখন আপনি ডিফেন্সিভ এরিয়াতে বল হারাবেন তার জন্য আপনাকে মাশুল গুনতে হবেই। ফলাফল ও হাতেনাতে। ৫১ মিনিটে মিখিতারিয়ানের গোল...
আর্সেনাল ১-১ ইউনাইটেড!!!!!!!!!!

আর্সেনাল হয়ত এ ড্র নিয়ে খুশিই হত। ইউনাটেডের ঘরের মাঠ থেকে ড্র নিয়ে ফেরাটাও মন্দ না। কিন্তু ইউনাইটেডের পূর্ন ৩ পয়েন্ট চাই। সময় যত গড়ায় আর্সেনাল ডিফেন্ডিংয়ের সময় তাদের ফরমেশন ও ইউনাইটেডের মত ৪-৫-১ করে ফেলে। নেলসন, আইওবি,মিখি কে ডিপে ড্রপ করে, অবামেয়াং একমাত্র ফ্রন্টম্যান হিসেবে থাকে। ইউনাইটেডের মত সেম ফরমেশন করায় একটা সমস্যা কিন্তু রয়েই যায় ইউনাইটেডের মত। আর্সেনালের ও ইউনাইটেডের মত ব্যাক ফোরের ন্যারো ডিফেন্সিভ শেপের কারণে দুই পাশেই বিশাল গ্যাপ সৃষ্টি হয়। মরিনহো তার দুই ফুলব্যাক কে ওই স্পেসে পুশ করেন ওয়াইড বল প্লে আর সেই গ্যাপ এক্সপ্লয়েটের জন্য।


লুকাকুকে সেকেন্ড হাফে ইঞ্জুরির কারণে উঠিয়ে নেবার কারণে ইউনাইটেড একজন টার্গেট ম্যানের অভাব বোধ করছিল যখন বল ওয়াইড পজিশনে বা উইংয়ে যাচ্ছিল। ফেলাইনির সাব সেখানেই একটা কি ইম্প্যাক্ট ফেলে। ম্যান ইউ এখন বল ওয়াইড প্লে হোক বা যেভাবেই হোক প্রতিটি অপরচুনিটিতে বলকে বক্সে বা টার্গেট ম্যানের কাছে পাঠানোর চেষ্টা করে।

ফেলাইনিকে মূলত মিডফিল্ডে ড্রপ করা হলেও তাকে ফ্রি রোল দেয়া হয় এই ম্যাচে যাতে আর্সেনালকে যত ধরনের সমস্যায় ফেলা যায় ফেলানো এই ফেলাইনিকে দিয়ে। কিছুক্ষনের মধ্যেই ব্যাক ফোর কে প্রেসিং করা শুরু করে।

ইউনাইটেড মূলত আর্সেনালের লেফট সাইডকে টার্গেট করে আক্রমণগুলোকে সাজায় সাবস্টিটিউটের পর। কারণ মার্শিয়াল এবং ফেলাইনি টোটাল ফ্রেশ লেগ। মার্শিয়াল আর ইয়াং বক্সের ভিতর ঢুকার পরিবর্তে টাচলাইন থেকে একের পর এক ইনসুয়িং ক্রস করতে থাকে ফেলাইনির উদ্দেশ্যে বক্সে, ফেলাইনিও প্রতিবার ব্যাকপোস্টে ফরওয়ার্ড রান দিতে থাকে ক্রস আসলে। আর্সেনাল জানত আরো ক্রস আসবে, তাই ফেলাইনির সাথে মার্কার দুইজন করা হয় তাও তাকে মার্ক করা সম্ভব হচ্ছিল না ঠিকমত।

৭০ মিনিটের পর দুই সাইড থেকেই ক্রস আসা শুরু হয়। ক্লান্তি ঘিরে ধরায় আস্তে আস্তে আর্সেনাল প্লেয়াররা আর আগের মত প্রেস করতে পারছিল না। যার ফলে ইউনাইটেডের পজিশন ক্রিয়েট, ক্রসিংয়ের জন্য আরও বেশি সময় পায়। সাথে ফেলাইনির সংযোজন আরো বিপদজনক ছিল। ৮০ মিনিটের পর আর্সেনাল শুধু ফিসিক্যালি না মেন্টালিও টায়ার্ড ছিল, সমতাসূচক গোলের পর এত হার্ডলি কন্সেন্ট্রেট করার জন্য। সে সময় ফেলাইনি পুরোদস্তুর ফরওয়ার্ড হিসেবে, টার্গেট্ম্যান হিসেবে খেলছিল।

পগবাকে সে সময় ডিপে ড্রপ করে কারন সে জানে তার জন্য এখন অনেক সময় আর স্পেস আছে। আর ওই সময় ডিফেন্স ও আর্সেনাল ফ্রন্টলাইনকে পুশ করছিল। ফলে পগবা দুই উইংয়েই বল দিতে পারে বা ফেলাইনির উদ্দেশ্যেও বল দিতে পারে। আর্সেনাল তখনও ম্যান ইউ ডিফেন্ডাররা বল পজেশন পেলে হাই প্রেসিং চালিয়ে যায় ম্যান ইউ বক্সে।


৮৮ মিনিটের সময় মার্শিয়াল বক্সে ফেলাইনির উদ্দেশ্যে ক্রস করে। ক্রস করার সময় মার্শিয়ালের মার্কার বেলেরিন ছিল অনেক সামনে, আর এদিকে ফেলাইনির মার্কার চ্যাম্বারস ফেলাইনি কে পিছনে আনমার্ক রেখে সামনে চলে আসে। অনেক সময় নিয়ে ধীরেসুস্থে করা ক্রসে গোলও হয়, কিন্তু গোলটি বাতিল হয়। এ সতর্কবার্তা থেকেও আর্সেনাল শিক্ষা নেয়নি।

এবার দৃশ্যপটে ইয়াং। বক্সের কর্নার থেকে বিপদজনক ক্রসিং পজিশন থেকে দেয়া ক্রস, সামেনে অলস মার্কিং, আবার ফেলাইনির দুই মার্কারের মাঝ দিয়ে রান...এবার আর রক্ষে নেই দাদু। গোল।

ইউনাইটেড ২-১ আর্সেনাল!!!!!!!!

মূলত মরিনহোর গেম রিডিং, প্রোপার সাবের কারনেই ইউনাইটেড ম্যাচ বের করতে পেরেছে। তার চেয়েও বড় কারণ আর্সেনালের প্লেয়ারদের এক্সপিরিয়েন্স। সাব থেকে নেমে এসে ম্যাচ বের করে দিবে, ম্যাচের টেম্পো ধরে রাখবে এমন প্লেয়ার খুব কমই আছে এখন আর্সেনালে। তবে আশা ছিল আর্সেন ওয়েঙ্গারের শেষ ইউনাইটেড ভ্রমন ম্যানেজার হিসেবে আরও আকর্ষনীয় হবে। যেখানেই থাক দাদু আপনার জন্য শুভকামনা। 

 

 

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন