কাকার স্মরণে – ' এক রাজপুত্রের দুঃখ বিলাসিতা '

কাকার স্মরণে – ' এক রাজপুত্রের দুঃখ বিলাসিতা '

পুরো বিশ্বকে অশ্রুজলে ভাসিয়ে ১৫ই অক্টোবর ,২০১৭ সালে  তিনি শেষ বারের মত ফুটবল মাঠে নামেন। সেই মুহূর্তে এম,এল,এস লিগের অর্লান্ডো সিটি এর হয়ে খেলছিলেন তিনি। রোনালদো-মেসি যুগ শুরু হবার আগে তিনিই শেষবার মেসি-রোনালদোকে হারিয়েই ব্যালন ডি’অর  জিতে নিয়েছিলেন। ইনজুরি আর ক্যারিয়ার নিয়ে কিছু ভুল সিদ্ধান্ত এর জন্য নিজেকে পুরোপুরি ভাবে মেলে ধরতে পারেন নি আসলে। বলছিলাম ব্রাজিল ও  এসি মিলান  লেজেন্ড  রিকার্ডো  কাকা এর কথা। 

রিকার্ডো ইজেকসন দস সান্তস লেইতে , যিনি সবার কাছে কাকা নামেই পরিচিত ১৯৮২ সালের ২২ই এপ্রিল ব্রাজিলের গামাতে জন্ম গ্রহণ করেন। ব্রাজিলের অধিকাংশ ফুটবল প্লেয়ার গরীব ঘর থেকে আসলেও কাকা এর ব্যতিক্রম ছিলেন।যার ফলে স্ট্রিট ফুটবল বা ফুটসাল থেকে বা ব্রাজিলিয়ান ধরণ থেকে বরং ইওরোপিয়ান ধরণেই বেড়ে উঠার সুযোগ হয় তাঁর।অর্থাৎ পড়ালেখার পাশপাশি লোকাল ফুটবল দলে খেলা। 

অনেক অল্প বয়সেই সাও পাওলো  যুব দলে তাঁকে  নেয়া হয় (১৯৯৪ সালে)। তাঁর ক্যারিয়ার শুরু হবার আগেই শেষ  হতে চলেছিল যখন সুইমিং পুলে আঘাত পেয়ে মেরুদণ্ড ভেঙে গিয়েছিল। কাকা সেই ব্যাপার এ বলেছেন যে তাঁর ধর্মীয় বিশ্বাসের জন্যই তিনি সুস্থ হয়ে মাঠে ফিরতে পেরেছেন ।


Image result for kaka sao paulo fc

সাও পাওলো এর অনূর্ধ্ব-১০ দল থেকে নিয়ে সিনিওর টিম পর্যন্ত কাকার পারফর্মেন্স  ছিল অসাধারণ। যার বদৌলতে ২০০৩ সালে ৮.৫ মিলিয়ন ইউরো এর বিনিময়ে এসি মিলান তাঁকে দলে ভিড়ায়। 


Image result for kaka

দলে যোগ দিয়েই কাকা নিজের নাম করে নেয় এবং সব ম্যাচেই তাঁকে কম বেশি খেলানো হত। তখন এসি মিলানে খেলত পিরলো, শেভচেঙ্কো, মালদিনি এর মত প্লেয়াররা । তাদের  উপস্থিতিতেও কাকা ফ্যানদের কাছে আলাদা করে একটা জায়গা করে নিতে সক্ষম হয়।

মিলানে যোগ দিয়েই কাকা তাঁর প্রথম সিজনে “সিরিয়া-এ ফুটবলার  অব দ্যা ইয়ার “ পুরষ্কার জিতে নেয়। তিনি তাঁর প্রথম সিজনে ৩০ ম্যাচে ১০ গোল করেন।

৬ ফিট ১ ইঞ্চি লম্বা হওয়া সত্ত্বেও কাকার ছিল অসাধারণ গতি ও ডিফেন্ডার কাটিয়ে সামনে এগিয়ে যাবার ক্ষমতা। ঐ সময়ের বাকী যেকোনো প্লেয়ারদের থেকে কাকা এটা অনেক ভালই পারত বলা যায়। তাছাড়াও সাবলাইম পাস ও ক্লিনিক্যাল ফিনিশিং এ তাঁর ছিল অসাধারণ দক্ষতা। শুন্য থেকেও চান্স তৈরি করা আর ডিফেন্ডারদের নিজের গতি এবং ড্রিবলিং দিয়ে পরাস্থ করে গোল দেয়ায় তিনি ছিলেন পারদর্শী। 

২০০৭ সালে কাকা এসি মিলানের হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতে তাও লিভারপুলকে ২-১ গোলে হারিয়ে যারা ২০০৫ এ মিলানকে মানসিকভাবে  ভেঙে দিয়েছিল। ঐ একই বছর কাকা চ্যাম্পিয়নস লিগের “উয়েফা  ক্লাব ফুটবলার অব দ্যা ইয়ার “ নির্বাচিত হন। এবং বছরের শেষে ডিসেম্বর মাসে  ' ব্যালন ডিঅর ' জিতে নেন । মেসি এবং রোনালদো এর  আগে  তিনিই শেষবারের মত এই পুরষ্কারে ভূষিত হয়েছেন তাও মেসি ও রোনালদোকে হারিয়েই।


Image result for kaka


কাকা তাঁর ক্যারিয়ারের সবথেকে ভালো ডোমেস্টিক সিজন পার করে পরের সিজনটাতে অর্থাৎ ২০০৮-০৯ সিজনে। ৩১ টি ম্যাচ খেলে কাকা ১৬ টি গোল ও ৯ টি এসিস্ট করেন।

৬৭ মিলিয়ন ইউরো এর বিনিময়ে সিজন শেষে ২০০৯ সালে কাকা এসি মিলান থেকে রিয়াল মাদ্রিদে পাড়ি দেন। 


Related image


কাকা মাদ্রিদে সেই ঝলক কখনই দেখাতে পারেননি জেতা মিলানে দেখিয়ে এসেছিলেন। মাদ্রিদে প্রথম সিজনে (২০০৯-১০) তিনি  ৯ টি গোল ও ৮ টি এসিস্ট করেন।

২০১০ সালের অগাস্ট মাসে তিনি প্রথম বড় কোন ইনজুরিতে পরেন । পায়ের হাঁটুর অপারেশন এর পর ৪ মাস তাঁকে মাঠের বাইরে থাকতে হয়েছিল। এর পরেও কয়েকবার ছোটখাটো ইনজুরিতেও পরেছিলেন কাকা। যার দরুন তিনি তাঁর ফর্মটা প্রতি ম্যাচে ধরে রাখতে সক্ষম ছিলেন না। কিন্তু ২০১১-১২ সিজনে তাঁকে আবারও খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল আগের সেই বিধ্বংসী রুপে। ঐ সিজনে মাদ্রিদকে লিগ জিতাতে কাকার ভূমিকা ছিল অতুলনীয়। ১৪ টি এসিস্ট ও ৮ টি গোল করেছিল কাকা যেটা মাদ্রিদের জার্সি গায়ে কাকার সেরা সিজন ছিল।

২০১২-১৩ সিজনের পর কাকা মাদ্রিদ ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন। মাদ্রিদের হয়ে তিনি ৪ বছরে ১২০ ম্যাচ খেলে ২৯ টি গোল করেছিলেন।

তিনি ২০১৩-১৪ সিজন আবারও এসি মিলানের হয়ে খেলেন। মিলানে দ্বিতীয় বার এসে কাকার ভালো ফর্ম দেখে বাকিদের সাথে সাথে কাকাও অবাক হয়েছিল নিশ্চয়। তিনি এবার মিলানের হয়ে ৯ টি গোল ও ৭ টি এসিস্ট করেছিলেন সিরিয়া- এ  তে।

এরপরের সিজন কাকা অর্লান্ডো সিটিতে যোগ দেন । কিন্তু প্রথমে সাও পাওলো তে লোনে যান এম,এল,এস এর সিজন শুরুর অপেক্ষায়।


Image result for kaka


অর্লান্ডো সিটিতে কাকা তিন বছর কাটানোর পর অবশেষে ২০১৭ সালে ফুটবল খেলা থেকে অবসর নেন। অর্লান্ডো সিটির হয়ে ও নিজের ক্যারিয়ার এর শেষ ম্যাচে মাঠে আবেগে কান্নায় ভেঙে পরেছিলেন এই গ্রেট প্লেয়ার এবং তাঁর এই সংবাদে বুক ভাঙ্গেনি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়াও দায় আসলে।


Image result for kaka last match


ব্রাজিলের জার্সিতে কাকা ৯২ ম্যাচ খেলে ২৯টি গোল করেছিল।২০০২ বিশ্বকাপ জয়ী দলের সদস্য ছিল কাকা। তখন তাঁর বয়স ছিল ২০ বছর। ব্রাজিলের জার্সিতে তাঁর সেরা মুহূর্তের কথা জিজ্ঞাসা করা হলে এখনও মনে পরে যায়  আর্জেন্টিনা এর সাথে ব্রাজিলের ২০০৬ সালের ম্যাচটি যেখানে কাকা মেসিকেও দৌড়ে হার মানিয়ে পিছে ফেলে বাকী পুরোটুকু মাঠ দৌড়ে যেয়ে ডিফেন্ডারকে হার মানিয়ে গোল  দিয়েছিল। বিশ্বকাপ ছাড়াও কাকা ব্রাজিলের হয়ে ২ টি কনফেডারেশন কাপ জিতেছে। 

 Image result for kaka brazil


কাকা একটি ভালোবাসার নাম । অনেক ব্রাজিল ভক্তের  অন্তরে থাকে এই কাকা। তিনিই সর্বশেষ ব্রাজিলিয়ান যিনি ব্যালন ডিঅর জিতেছিলেন মেসি রোনালদো এর হেটার থাকতে পারে কিন্তু কাকার কোন হেটার আছে বলে মনে হয় না এই যুগের ফ্যানরা হয়তো বিধ্বংসী কাকার খেলা দেখে নি ,কিন্তু কাকা কি মাপের প্লেয়ার ছিল যারা তাঁর খেলা দেখেছে তারা তা হারে হারে জানে

 আজও মনে আছে ২০০৬-০৭ এর চ্যাম্পিয়নস লিগে ওল্ড ট্রাফোর্ডে কাকা কি ভাবে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ডিফেন্সের সাথে ছেলেখেলা খেলেছিল। চ্যাম্পিয়নস লিগের ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোলটি ওইদিনই করে ছিল কাকা। গ্যাব্রিয়েল হেইনযে এর উপর দিয়ে ফ্লিক করে এগিয়ে , পেত্রিক এভ্রাকে  নড মুভমেন্টে  পিছে ফেলে ভ্যান দ্যার সার এর পাশ দিয়ে রোলিং করে বলকে বারে ঢুকিয়েছিল।

আহা স্মৃতি !!!

ইনজুরি আর ক্যারিয়ার নিয়ে যদি ভুল কিছু সিদ্ধান্ত না নিতেন আজ আরও সুখকর হত তাঁর গল্পটা।

জীবনের পরবর্তী অধ্যায়ের জন্য শুভকামনা রইলো লেজেন্ড।  শুভ জন্মদিন ।

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন