ইন্টারন্যাশনাল ফ্রেন্ডলিঃ জার্মানির বিপক্ষে ব্রাজিলের জয়

নিজেদের কম্প্যাক্ট ডিফেন্স আর জার্মানির দেওয়া স্পেস কাজে লাগিয়ে অসাধারণ এক জয় তুলে নিয়েছে ব্রাজিল।

শুরুতেই দেখে নেই ম্যাচের স্কোয়াড।

ইউয়াখিম ল্যোভের জার্মানি কাগজে কলমে খেলেছিল -২-৩-১ ফরমেশনে, যেখানে গোলবারে কেভিন ট্র্যাপ ডিফেন্সে ছিল প্ল্যাটেনহার্ডট, কিমিচ, রুডিগার এবং বোয়াটেং জনের মাঝ মাঠে টনি ক্রুস, এবং গুন্দোগান, সাথে দুই উইং লেরয় সানে এবং লিওন গোরেটজকা এদের সবার সামনে একমাত্র স্ট্রাইকার হিসেবে ছিলেন প্রবীণ মারিও গোমেজ আর তার পেছনে হুলিয়ান ড্রাক্সলার।

অন্যদিকে ৪-৩-৩ ফরমেশনে খেলা ব্রাজিলের গোলবারে এলিসন, ডিফেন্সে দানি আলভেস, মার্সেলো, থিয়াগো সিলভা এবং মিরান্ডা মাঝমাঠে পৌলিনহো, ফার্নান্দিনহো এবং ক্যাসিমিরোর সাথে দুই উইং ফিলিপে কৌতিনহো, উইলিয়ান আর সবার সামনে গ্যাব্রিয়েল হেসুস

ম্যাচ শুরু হবার পর থেকে দেখা গিয়েছে জার্মানি বেশির ভাগ সময়ে খেলেছে ৪-৪-২ ন্যারো ফরমেশনে, যেখানে চার মিডফিল্ডার এক সাথে অবস্থান করে। কিন্তু এটাকের সময় দুই উইংব্যাক প্ল্যাটেনহার্ডট এবং কিমিচ উপরের দিকে পুশ করার জন্য ফরমেশন দাঁড়ায় ২-৩-৫ এ। অন্যদিকে ব্রাজিল দলে ডিফেন্সের সময় ৪-৪-২ ফরমেশনে চলে যায়, যাতে তাদের ডিফেন্স আরো স্ট্যাবল থাকে।

আগেই বলেছি, জার্মানি এটাকের সময় ২-৩-৫ ফরমেশনে চলে যায়। এ সময় তাদের দুই উইংগার ড্রাক্সলার এবং লেরয় সানে কাট ইন করে ভেতরে চলে আসে মাঝমাঠে প্লেয়ার বাড়ানোর জন্য। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে, দুই সেন্টারব্যাকের সাথে বল রোটেট করার জন্য অর্থাৎ পাসের অপশন বাড়ানোর জন্য টনি ক্রুস বেশ নিচে নেমে আসছে। এর অন্যতম কারণ ব্রাজিলিয়ান প্লেয়ারদের হাই প্রেস।
কালকের ম্যাচে অসাধারণ প্রেস করেছে ব্রাজিল, যা আগের ম্যাচ ডে স্পেন করে। ব্রাজিলের এত উপরে প্রেস করার কারণ, যাতে গোড়া থেকে বল বিল্ড আপ না করতে পারে জার্মানরা। এবং এ ক্ষেত্রে ব্রাজিল দল সফল বলা চলে।
মাঝমাঠে কাল ব্রাজিল দল অনেক কাছাকাছি অবস্থান করে, একদম মাঝমাঠের কিক অফ সার্কেলের মত। এর ফলে জার্মানির মিডফিল্ডারদের বল নেওয়ার জন্য মাঠের মাঝে চলে আসতে হয়। আর এ সময়ই জার্মানির দুই ফ্ল্যাংক অর্থাৎ বা দিক- ডান দিক ফাঁকা হয়ে যায়, যেহেতু কিমিচ এবং প্ল্যাটেনহার্ডট অনেক উপরে প্রেস করছিল এটাকের সময়। এটাকে ব্রাজিলিয়ান কোচ টিচের মাস্টারপ্ল্যান বলা চলে, যার ফলে দুই উইং দিয়ে খুব সহজে ব্রাজিল আক্রমণ করতে পারছিল।

অন্যদিকে খেয়াল করলে দেখা যাবে কাল ব্রাজিলের দুই উইংব্যাক মার্সেলো এবং ডানি আলভেজ খুব কম উপরে উঠেছে, এর কারণ কি বলুন তো?

কারণটা আগেই বলেছি, জার্মানির দুই ফ্ল্যাংক ফাঁকা থাকায় ব্রাজিলের উইংগার দুজন খুব সহজে দুই পাশ দিয়ে ঢুকতে পারছিল, ফলে সেখানে এক্সট্রা কোন প্লেয়ারের দরকার পরেনি। অন্যদিকে কালকে ব্রাজিলিয়ান কোচের মূল মোটিভ ছিল ডিফেন্স কনপ্যাক্ট রাখা। মানে হচ্ছে গোল করার জন্য সলিড এটাক লাগবে, চান্স ক্রিয়েট লাগবে। চান্স ক্রিয়েট হলে সেটা অন টার্গেট মারতে হবে। ব্রাজিলের ডিফেন্সে সব সময় চার ডিফেন্ডার ছিল, সাথে ক্যাসিমিরো এবং ফার্নান্দিনহো থাকায় তেমন ফাঁকা যায়গায় পায়নি সলিড এটাক করার জন্য জার্মানরা। আর যেগুলো পেয়েছিল সেগুলো অন টার্গেটে যায়নি শুধু মাত্র সুযোগ বা যায়গা কোনটাই না দেওয়ার জন্য।
যেহেতু ব্রাজিলের তিন মিডফিল্ডার মাঝমাঠে ছিল, সাথে দুই সেন্টারব্যাক তাদের পেছনে, মাঝমাঠ দিয়ে এটাক জার্মানরা করতে পারছিল না। একমাত্র অপশন ছিল উইং দিয়ে এটাকের। সেখানে মার্সেলোর দিক দিয়ে জার্মানির উইংব্যাক কিমিচ চেষ্টা চালালেও থিয়াগো সিলভার অসাধারণ ডিফেন্সে পাত্তাই পায়নি জার্মানির স্ট্রাইকাররা।

অনেক সমালোচিত হলেও, কালকে পৌলিনহো তাকে দেওয়া রোলটা ঠিক মত করেছে। ভেবে দেখুন তো পৌলিনহোর কাছে বার বার বল কেন যাচ্ছিল কাউন্টার এটাকের সময়?
এর কারণ, টিচে পৌলিনহোকে উপরে উঠার পারমিশন দেয়, ফ্রি ভাবে খেলতে দেয় একটাই কারণে, সে মার্কার খুব ভালো বিট করতে পারে এবং ফাঁকা যায়গায় ভূতের মত দাঁড়িয়ে থাকে। কালকে এটাকের সময় দেখা গিয়েছে যখন যেখানে বল পাস দেওয়া দরকার, সেখানে পৌলিনহো ঠিক ভাবে পৌছে গিয়েছে, এখন এরপরের ধাপটা সে হয়ত করতে পারেনাই ঠিক ভাবে, এটা অন্য কথা। কিন্তু পৌলিনহোর এত গোলের পেছনে একটাই কারণ, তার পজিশনিং সেন্স।

ব্রাজিলের আরেকটা জিনিস দেখার মত ছিল, তা হলো কাউন্টার প্রেসিং। কাউন্টার প্রেসিং হলো, ধরেন কোন প্লেয়ার বল হারালো, তা মাঠের যেখানেই হোক। এখন তার হাতে দুইটা অপশন,
১) মাঠের যে যায়গায় তার অবস্থান হওয়ার কথা সেখানে চলে যাওয়া। এটা হলো জোনাল মার্কিং, অর্থাৎ সে নির্দিষ্ট এরিয়া কভার করছে।
২) পালটা ডিফেন্স করে আবার বল নিতে চেষ্টা করা। কাল বল যেখানেই হারিয়েছে ব্রাজিল, সেখানেই পালটা বল নিতে চেষ্টা করেছে, ফলে জার্মানি অনেক বার দেখা গিয়েছে বল কিপারের কাছে ব্যাক পাস দিয়েছে অথবা গোড়া থেকে শুরু করেছে। আর একটা কাউন্টার প্রেসিং একটা ইউনিট হিসেবে করায় ব্রাজিলিয়ান প্লেয়াররা যে জার্মান প্লেয়ারের কাছে বল ছিল, তার সম্ভাব্য সকল পাস দেওয়ার অপশন ব্লক করে রেখেছিল অর্থাৎ পাসিং অপশনের পেছনে/সামনে বা এবং পজিশনে যেখানে থেকে বল নিয়ে নিতে পারবে সহজেই যদি সামনে পাস দেয়। ফলাফল, ব্যাক পাস। জার্মানির এটাকের সময় এভাবে কাউন্টার প্রেসিং এর ফলে বল যখন পেয়েছে, সাথে সাথে ব্রাজিল এটাকের সুযোগ পেয়েছে এবং করেছেও, কারণ, ওই যে, জার্মানির ডিফেন্সে মাত্র দুজন সেন্টার ব্যাক স্থায়ী ছিল।