ট্যাক্টিকাল প্রোফাইলঃ কেভিন ডি ব্রুইনা

ট্যাক্টিকাল প্রোফাইলঃ কেভিন ডি ব্রুইনা

রাইনাস মিশেল আর জোহান ক্রুইফের টোটাল ফুটবলের থিউরি কি ছিল বলতে পারেন?
এ সিজনে ম্যানচেস্টার সিটির ইপিএল তথা ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগে একছত্রভাবে ছড়ি ঘোরানো অবাক লাগেনা? ইংলিশ লীগের মত কঠিন একটা কম্পিটিশন, যেখানে এক এক দলকে ম্যানচেস্টার সিটি প্রায় ম্যাচেই রীতিমত উড়িয়ে দিয়ে জিতে চলেছে। 
গত সিজনে ম্যানচেস্টার সিটিতে নতুন রেভ্যুলুশন শুরু করের পেপ গুয়ার্দিওলা। কাগজে কলমে যেভাবেই খেলুক না কেন, ম্যাচের সময় ইনভার্টেড ফুলব্যাক ট্যাকটিক্সে তা হয়ে দাঁড়াত প্রায় সময়েই ২-৩-২-৩ ফরমেশন। এ নিয়ে লিখা আছে আরেকটি পোস্টে, পড়তে ক্লিক করুনঃ ইনভার্টেড উইংব্যাক এবং গুয়ার্দিওলার গত সিজনের ম্যানচেস্টার সিটি এনালাইসিস

যাইহোক, যা বলছিলাম, টোটাল ফুটবল হলো এমন এক থিউরি, যেখানে গোলকিপার বাদে মাঠের যেকোন ফুটবলার, যেকোন প্লেয়ারের রোল প্লে করতে পারত। অর্থাৎ, সেন্টার ডিফেন্ডার গিয়ে মিডফিল্ডে খেলছে বা, সুইপার তথা লিবেরো বা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার স্ট্রাইকারের মত উপরে বসে গোল দিচ্ছে। আর যখন কোন প্লেয়ার নিজের পজিশন ছেড়ে অন্য যায়গায় যাবে, তখন এটাতো স্বাভাবিকই যে সেই প্লেয়ারটার যায়গা ফাঁকা হয়ে থাকবে। টোটাল ফুটবলে সেই ফাঁকা স্থান পূরণ করতে অন্য এক প্লেয়ার জুড়ে বসবে। এভাবে মাঠের সব পজিশনেই কোন না কোন ফুটবলার থাকবেই, কেউ যায়গা ছেড়ে উপরে যাক আর নিচেই নামুক, কোন অসুবিধা নাই। এখন হতে পারে, কোন ডিফেন্ডার সেই যায়গা নিচ্ছে। আবার এও হতে পারে, কোন স্ট্রাইকার নিচে নেমে ডিফেন্ডারের যায়গা নিচ্ছে। এইতো, এটাই সহজ অর্থে। অর্থাৎ একজন প্লেয়ার একাধারে, ডিফেন্ডার, মিডফিল্ডার আবার স্ট্রাইকারও।
কিন্তু এই টোটাল ফুটবলের সফলতা কিংবা ব্যর্থতা নির্ভর করে, দলের প্লেয়ারেরা এই ট্যাকটিক্স কতখানি এডপ্ট করতে পারবে অর্থাৎ মানিয়ে নিবে। আবার, কত দ্রুত নিজেদের স্থান পরিবর্তন করতে পারবে। এই ট্যাকটিক্সে যেমন খুবই টেকনিকাল প্লেয়ার লাগে, তেমনই লাগে ফিজিকাল প্লেয়ার, কারণ আপনি করিম বেঞ্জেমা বা মেসুত অজিলকে সারা মাঠ দাঁপিয়ে যায়গা পরিবর্তন করে খেলাতে পারবেন না।

ক্রুইফ না থাকলেও, ক্রুইফের এই টোটাল ফুটবল থিউরি এ যুগে যিনি সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করতে পেরেছেন বা করে চলেছেন, তিনি হলেন পেপ গুয়ার্দিওলা। টোটাল ফুটবল থিউরি থেকে মডিফাই করে নিজের Juego de Posicion তথা পজিশনাল প্লে ট্যাকটিক্সের উদ্ভাবক তিনি নিজেই। 
শুরুতেই বলেছি, গত সিজনে ম্যানচেস্টার সিটিতে গুয়ার্দিওলা ইনভার্টেড উইংব্যাক ট্যাকটিক্স খাটান। এ সিজনে এখন অব্দি তার নতুন আরেক আবিষ্কার 'ফ্রি রোলের নাম্বার ৮', যা করেন দলের দুই মেইন প্লে মেকার, ডি ব্রুইনা আর ডেভিড সিলভা কে নিয়ে। এ লিখায়, মূলত আলোচনা করব এ সিজনের বেস্ট মিডফিল্ডার এবং মতান্তরে ইংলিশ লীগের সেরা প্লেয়ার ডি ব্রুইনাকে নিয়ে।
গত সিজনে, ডি ব্রুইনার কাজ ছিল মূলত উইং প্লে তে সাহায্য করা আর প্লে মেকিং করা। কিন্তু এ সিজনে সেই ডি ব্রুইনা হয়ে গেলেন একবারে কমপ্লিট ফুটবলার, প্রেসিং, ট্যাকলিং, বিল্ড আপ, প্লে মেকিং, গোলস্কোরিং, একটা প্লেয়ারের পক্ষে যা যা সম্ভব, তার কোনটাই বাকি নেই সম্ভবত। চলুন, বিস্তারিত তে যাই।


ডিফেন্সে অবদান:
১) প্রেসিং: গুয়ার্দিওলা এবং ম্যানচেস্টার সিটির সিস্টেমে বল দখলের জন্য প্রেস করা শুরু হয় একদম উপর থেকে। বল যখন কোন প্লেয়ারের পায়ে থাকবে তখন তার পাস দেওয়ার সকল সম্ভাব্য দিক বা প্লেয়ারকে ব্লক করে দেওয়া হয়। এখন যদি ব্লক থাকার পরও পাঁচ ছ জন প্লেয়ারের মাঝখানে আটকা পড়া প্লেয়ারটা বল পাস করতে চায় নিজ প্লেয়ারকে, তখন বলটা ম্যানচেস্টার সিটি প্লেয়ারদের পায়ে চলে আসে বিশেষ ভুল না হলে। 
আর এভাবে পুরো ম্যাচ প্রেস করার জন্য সে রকম ফিজিকালি স্ট্রং প্লেয়ারের দরকার পরে। ডি ব্রুইনা ফিজিকালি বেশ ভালো, এবং পুরো ম্যাচ জুড়ে সে অনবরত প্রেস করতে পারে বিপক্ষ দলকে।

আবার, ডি ব্রুইনার প্রেসিং এর আরেকটা ধরণ হলো কাউন্টার প্রেসিং। চেলসির সাথে ম্যাচটায় ধরুন; ডেভিড সিলভা বাঁ দিক দিয়ে বল নিয়ে এগুতে গিয়ে বল হারিয়ে ফেলে। সাথে সাথে ডি ব্রুইনা যে প্লেয়ারের কাছে বল আছে, তার কাছে ছুটে যায় ট্যাকল/প্রেস করতে। ফলে সে কোন দিকে পাস দিবে বুঝে উঠতে পারেনা। ফলাফল = ভুল পাস, এবং এবং আবারো সিটির পায়ে বল।
২) অন্যান্য ডিফেন্সিভ ডিউটি: ডি ব্রুইনা গত যেখানে খেলছিল মূলত এটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবে, কখনো বা ফলস উইংগার হিসেবে, যাতে বিপক্ষ দল কনফিউজড হয়ে যায়।


এ সিজনে ডি ব্রুইনার রোল অনেক বেশি ডিফেন্সিভ। এর কারণ হতে পারে সিটির দুই উইংগে স্টার্লিং-সানের ধারাবাহিক ভাবে ভালো করা। আবার হতেও পারে গুয়ার্দিওলার মাস্টার স্টোক। 
শুরুতেই বলেছি ইনভার্টেড উইংব্যাকের কথা, যারা কোয়ার্টার ব্যাক বা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের পজিশনে চলে আসে পাসিং দিয়ে বিল্ড আপে সাহায্যের জন্য। রাইট ব্যাক কাইল ওয়াকার দুর্দান্ত গতি দিয়ে প্রায়ই সেই পজিশন ছেড়ে ওভারল্যাপ করে উইং এর দিকে, এবং তার রেখে যাওয়া ফাঁকা যায়গাটা তখন পূরণ করেন কেভিন ডি ব্রুইনা। হয়ে যান, কোয়ার্টার ব্যাক/ ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার, আর এ রোলে তার প্রধাণ কাজ থাকে ট্যাকল করে বল নেওয়া, মূলত ইন্টারসেপশন এবং উপরে উঠে যাওয়া।

এ সিজনে ডি ব্রুইনার স্ট্যাটিক্টিক্স গত সিজনের সাথে তুলনা করলে দেখা যায়, তার ইন্টারসেপশন এবং ট্যাকলের হার গত সিজনের থেকে বেশ ভালো এ সিজনে।


মিডফিল্ডে:
১) প্লে-মেকার: অপোজিশনের উইংব্যাকরা বেশিরভাগ সময় নিচে নেমে থাকে সিটির বিপক্ষে, কারণ সিটির দুই খুবই স্পিডি এবং টেকনিকাল উইংগার। এ সময় উপরে সাহায্য করতে ইনভার্টেড উইংব্যাকদের কেউ উপরে যখন উঠে যায়, তখন ডি ব্রুইনা তাদের স্থান দখল করে, এটা আগেও বলেছি। কিন্তু অপোজিশনের উইংব্যাকরা যখন এত নিচু নেমে থাকে তখন স্বাভাবিক ভাবেই মিডফিল্ডে অনেক বেশি স্পেস পেয়ে থাকে ডি ব্রুইনা। এই স্পেসটা আরো বাড়িয়ে দিতে আরেক প্লে মেকার, ডেভিড সিলভা চলে যায় উপরে, যে পজিশনের নাম, 'জোন ১৪' কিংবা দ্যা হোল। যেটাকে এটাকিং মিডফিল্ড পজিশনও বলা হয়ে থাকে, অর্থাৎ যেখানে থেকে বেশিরভাগ গোলের সৃষ্টি হয়ে থাকে। এখন ধরা গেল, এমন একটা সিচুয়েশন তৈরি হয়ে গিয়েছে, যেখানে সিলভা এবং কাইল ওয়াকার উপরে উঠে গিয়েছে। তখন, ডি ব্রুইনের হাতে সামনে পাস দেওয়ার অপশন থাকে পাঁচটি। যদি তাকে কেউ এসে কঠিন ভাবে প্রেস করে তবুও সে বল বাড়িয়ে দিতে পারবে পাশেই থাকা ফার্নান্দিনহোকে, যে ২-৩-২-৩ এর হ্যাফ ব্যাকদের একদম মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে। সাধারণত দেখা যায় মাঠের এত উপরে অর্থাৎ নিজেদের গোল পোস্ট থেকে এত উপরে কেউ প্রেস করতে আসেনা। তখন ডি ব্রুইনা চাইলে ডেভিড সিলভাকে পাস দিতে পারে, লং বল দিতে পারে দুই উইংগার কে। অথবা কাইল ওয়াকারের সাথে ওয়ান টু পাস করতে করতে অথবা অন্য কোন প্লেয়ারের সমন্বয়ে তিন জনের ট্রায়াঙ্গেল পাসিং জোন তৈরি করে নিজেও উইং এ চলে আসতে পারে এবং ক্রস করতে পারে স্ট্রাইকারের কাছে। এক কথায় বলা যায়, বহুত অপশন।


এছাড়া উপরে ওভারল্যাপ করা উইংব্যাক, সানে বা স্টারলিং এর সাথে মিলে বিপক্ষ দলের উইংব্যাকের সাথে ২ বনাম ১ জন সিচুয়েশন তৈরি করতে পারে। এ ক্ষেত্রে যেটা ডি ব্রুইনা কে সাহায্য করে, তা হল, তার সুন্দর বল ডিস্ট্রিবিউশন, এবং পজিশনিং সেন্স। এর সাথে স্ট্যামিনা তো অবশ্যয় আছে।
সিলভা আর ডি ব্রুইনার মাঝে এখন অব্দি কম্পেয়ার করলে দেখা যাবে, দুজনের চান্স ক্রিয়েশন প্রায় এক সমান হলেও ওপেন প্লে থেকে সিলভার প্রায় দ্বিগুণ বেশি ডি ব্রুইনার চেয়ে। এর মূল কারণ, ডি ব্রুইনার ডিপ থেকে বল নিয়ে বিল্ড আপ করা, এবং সিলভার এটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবে 'দ্যা হোলে' বসে অপারেট করা।


২) অন্যান্য মিডফিল্ডার রোল:
সিটিকে যখন অপোজিশন প্রেস করে, তখন সবচেয়ে বেশি যেটা কাজে লাগে, সেটা হলো ডি ব্রুইনার বল কন্ট্রোল আর ড্রিবলিং। বল পায়ে অসাধারণ কনট্রোল থাকায় মূহুর্তেই মার্কারদের বিট করে বল নিয়ে উপরে উঠে যায় ডি ব্রুইনা।
এছাড়া লিংক আপ প্লে অর্থাৎ পাস দিয়ে বিল্ড আপ করার সময় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শুরুটা হয় ডি ব্রুইনা থেকে। নিজেদের মাঝে পাস করতে করতে উপরে উঠে যায়, সাথে নিজের ড্রিবলিং কাজে লাগিয়ে প্লেয়ারদের বিট করে আবারও কোন প্লেয়ারকে পাস দিয়ে দেয়। ডি ব্রুইনা হলো ম্যানচেস্টার সিটির ডিফেন্স আর অফেন্সের মাঝের লিংক আপ, সিটির ম্যাচ গুলোতে দেখা যাবে বল উপরে নিয়ে যাওয়ার জন্য, হয় জন স্টোন্স বা এডারসন লং পাস দিচ্ছে, নয়ত ডি ব্রুইনা বল নিয়ে উপরে যাচ্ছে এবং এটাকের সূচনা করছে।



    এটাকে:
    এসিস্ট মেকারঃ ডি ব্রুইনা ডিপ থেকে অপারেট করলেও এ পর্যন্ত ৬৮ টি চান্স ক্রিয়েট করেছেন, আর কি পাস ৫৮ টি। অন্য দিকে আরেক প্লে মেকার সিলভার চান্স ক্রিয়েট আর কি পাস যথাক্রমে ৪১ এবং ৩৩ টি। কিন্তু এসিস্ট করার দিক দিয়ে দুজনই প্রায় সমান, ডি ব্রুইনাএ এসিস্ট যেখানে ২২ ম্যাচে ৯ টি, সেখানে সিলভার ১৯ ম্যাচে ৮ টি। এর মূল কারণ সিলভার এটাকিং মিডফিল্ড জোনে খেলা। তা সত্তেও ডি ব্রুইনার চান্স ক্রিয়েট থেকে শুরু করে এসিস্ট, সব সন্তোষজনক হওয়ার একমাত্র কারণ, ডি ব্রুইনার অসাধারণ লং পাস, সেট পিস, ক্রস এবং মিডফিল্ড থেকে বল নিয়ে ড্রিবল করা। যেখানে সিলভার খেলার স্টাইল বল পায়ে নিয়ে 'la pausa' তথা দ্যা পস স্টাইলে খেলা। সে বল পায়ে নিবে, খানিকখন দেখবে, এবং এক টাচে চান্স ক্রিয়েট করবে বা গোল দিবে, অর্থাৎ ধীরেসুস্থে। অন্যদিকে ডি ব্রুইনা হলো হাইব্রিড প্লেয়ার। টেকনিকালি ফিজিকালি দু দিকেই অসাধারণ একজন মিডফিল্ডার। 


    স্কোরার: দলের যখনই দরকার হয়, তখনই ডি ব্রুইনা উপরে উঠে বিল্ড আপের পাশাপাশি নিজেও দারুণ সব গোল করতে পারে। চেলসির সাথে জেতা টাইট ম্যাচটিতেই দূর থেকে দারুণ শটে করা গোল কিংবা ব্রিস্টল সিটির বিপক্ষে গতকালকের ম্যাচে ইজ্জত বাঁচানো গোল, ডি ব্রুইনা যখন দরকার, তখন সামনে এগিয়ে আসবেই।

    সবশেষে, পেপ গুয়ার্দিওলার গত সিজনে ডি ব্রুইনাকে যেভাবে ব্যবহার করেছিলেন, দেখে মনে হয়েছিল, ডি ব্রুইনা হয়তবা ইনিয়েস্তা ভল্যুম ২.০ হিসেবে খেলছে। কিন্তু এ সিজনে দেখা গেলো, ডি ব্রুইনা আরো হাইব্রিড এবং মডিফাইড। একজন মিডফিল্ডারের পক্ষে যা যা করা সম্ভব, তা এ মূহুর্তে ডি ব্রুইনার চেয়ে ভালো কেউ করছেনা তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

    নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

    আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন