রবার্তো মানচিনিঃ যে জাদুকর এর ছোঁয়ায় শুরু হয়েছিল ম্যান সিটির রূপকথা

রবার্তো মানচিনিঃ যে জাদুকর এর ছোঁয়ায় শুরু হয়েছিল ম্যান সিটির রূপকথা

ডাগ আউটে শান্ত ভাবে দাঁড়িয়ে আছেন, কিছুক্ষন পর অশান্ত হয়ে পায়চারী করছেন, আবার বসে পড়ছেন। গলায় সবসময় একটা স্কার্ফ বেধে আছেন এই আধাপাকাচুল ওয়ালা এই ভদ্রলোক।

জ্বি হ্যাঁ, মানচিনির কথাই বলছি..

নিজের ফুটবল ক্যারিয়ারে সাম্পাদোরিয়া লিজেন্ড ছিলেন, ১৫ বছর এর ক্যারিয়ারে লীগও জিতেছিলেন একবার ক্লাবের হয়ে, ১৫ বছর পর লাযিও তে ট্রান্সফার হয়ে আবার লীগ জিতেন, এরপর লোনে পাড়ি জমান ইংলিশ ক্লাব লেস্টারে।

বয়স ছিল তখন ৩৬, নিজের ক্যারিয়ারের শেষ টা বুঝতে পারছিলেন, তাই আধা সিজন শেষে পাড়ি জমান ফিওরেন্টিনায়, তবে খেলোয়াড় হিসাবে নয়, কোচ হিসাবে।

বয়স টা ইতালিয়ান লীগ এ কোচিং করানোর জন্য আদর্শ ছিল না,তাই স্পেশাল পারমিশন!! নিয়েই কোচিং ক্যারিয়ার শুরু করেন এই লিজেন্ডারি কোচ।



তবে কোচিং ক্যারিয়ারের শুরুটা সুখকর হয়নি, ফিওরেন্টিনাকে যদিও ঠিকঠাক মতই কোপা ইতালিয়া জিতান,কিন্ত ক্লাবের আর্থিক সংকট এবং উগ্র ফ্যানদের থেকে জীবনের হুমকি আর কয় মাস বিনাবেতন এ কোচিং করান ফিওরেন্টিনাকে, এরপর এক সিজন শেষেই বিদায় জানান ফিওরেন্টিনাকে, সাল ছিল ২০০২। আর ফিওরেন্টিনার লীগ শেষ হয় রেলিগেটেড হয়ে।

এরপর আবার কোচের দ্বায়িত্ব নিয়ে ফিরে আসেন লাযিও তে, আবারো আর্থিক সংকট এর খাড়া। উপরন্তু ক্রেস্পো, নেস্তার মত প্লেয়ার বিক্রি এবং বাকি প্লেয়ার দের বেতনের ৮০ ভাগ কর্তন, এত প্রতিকূলতা সত্বেও ০২-০৩ সিজনে উয়েফা কাপের সেমিফাইনালে নিয়ে যান, লীগ শেষ করেন ৪র্থ হয়ে, আর ০৩-০৪ সিজনে লাযিওকে কোপা ইতালিয়া জিতান আর লীগ শেষ করেন ৬ষ্ঠ হয়ে।

নিজেকে প্রমান করার সুযোগ আসে এরপর তার ভাগ্যে, ইন্টার মিলানের কোচিং এর দায়িত্ব পান, ভাগ্যটাও সুপ্রসন্ন দায়িত্ব পাবার পরপরই ইন্টার কে কোপা জিতান। ১৯৮৯ সালের পর ইন্টারের এটাই ছিল প্রথম কোন ঘরোয়া শিরোপা তাও জুভেন্টাস কে হারিয়ে, অনেক দিনের ট্রফি খরা কাটানোর পর। তবে চ্যাম্পিয়নস লিগের কোয়ার্টার ফাইনালে ৩-০ এগ্রগেটে হার মানের মিলান এর কাছে।

২০০৫-০৬ মৌসুমে লিগ শেষ করেন ২য় হয়ে,তবে শিরোপাধারী জুভেন্টাস এর শিরোপা টালমাটাল হয়ে যায় পাতানো খেলা কেলেঙ্কারিতে, শিরোপা নিজেদের করে নেয় ইন্টার, আর জুভেন্টাস নেমে যায় সিরি বিতে।
আর এই মৌসুমেও কোপা ইতালি আর ইতালিয়ান সুপার কাপ জয় করেন।

২০০৬-০৭ ছিল রেকর্ড এর মৌসুম, টানা ১৭ জয় ( লিভ্রানো এর সাথে ৪-১ দিয়ে শুরু, উদিনেস এর সাথে ১-১ গোলে শেষ),৯৭ পয়েন্ট নিয়ে টানা ২য়য় বারের মত লীগ জিতেন। কিন্ত কোপা ইতালি আর সুপার কোপা দুই জায়গার ফাইনালেই রোমার কাছে পরাস্ত হন।
২০০৭-০৮ মৌসুম, ইন্টার এর টানা ৩য় বারের মত স্কুতেত্তো জয়, কিন্ত আবারো লীগকাপ আর সুপারকোপার ফাইনালে রোমার কাছে হার।




ঘরোয়া লীগে অসাধারণ মৌসুম কাটালেও চ্যাম্পিয়নস লীগে ব্যার্থ ছিলেন, তাই টানা ৩ বার লীগ জিতার পরও মরিনহোর কাছে নিজের স্থান খোয়ানো হয়, স্যাক করা হয় তাকে, পরের এক মৌসুম অলিখিত অবসর কাটান এই মাস্টারমাইন্ড।

২০০৯-১০ মৌসুমে অনেক গুজবের পর পাড়িজমান ম্যান সিটিতে, তৎকালীন কোচ মার্ক হিউজ সিটির নতুন মালিক আল মুবারক এর ইচ্ছা পূরন এ ব্যার্থ, তাকে স্যাক করে আনা হয় মানচিনিকে, বাকিটা একটা নব ইতিহাসের সূচনা।

ম্যানচেস্টার সিটি, ফুটবল ভক্তরা যারা ইপিএল ফলো করেন তাদের কাছে নামটা অজানা নয়, কিন্ত সিটি কোন সময় শিরোপালড়াই এ শামিল হওয়া দলের কাতারে ছিল না, মাঝারি মানের দল যারা মাঝে মাঝে রেলিগেশন জোনে লড়াই করত, তেমনি একটা দল।
২০০৮ সালে আরব ধনকুবের খালাদুন আল মুবারক ক্লাবটি কিনে নেন, ইচ্ছা ইংলিশ তথা পুরো ইউরোপের জায়ান্ট ক্লাবে পরিনত করা, শুধু সমস্যা একটাই। টাকা খরচ করতে আপত্তি নেই, কিন্ত এই খরচ করা টাকায় গড়া দলটার দায়িত্ব নিতেও তো কোন মাস্টারমশাই দরকার!

হিউজ প্রত্যাশা পূরন করতে পারেন নি, পেয়ে গেলেন মানচিনিকে, যিনি ইতিহাস নতুন করে লিখতে শুরু করেন সিটির ভাগ্যে।

২০০৯-১০ মৌসুমে সিটি তার খেল দেখানো শুরু করে,অসাধারণ লড়াই করে লীগে, তবে শেষ ম্যাচে টটেনহাম এর কাছে ২-০ গোলে হেরে ৫ম হয় তার দল, হাতছাড়া হয় চ্যাম্পিয়নস লীগে খেলার স্বপ্ন, আবারাও শুরু হয় স্যাক গুজব, অবশ্য তাতে পানি ঢেলে দেন আল মুবারক নিজেই,জানিয়ে দেন আর আস্থা মানচিনিতে।

২০১০-১১ মৌসুমে কিনে আনেন বোয়াটাং, সিলভা আর তোরের মত খেলোয়াড় কে, জিতে নেন এফ এ কাপ স্টোক সিটিকে হারিয়ে, কত আরাধ্য ট্রফি সিটির ভাগ্যে তা একমাত্র ফুটবল ঈশ্বর ই জানেন,লীগ ২য় হয়ে শেষ করেন, সরাসরি জায়গা করে নেন চ্যাম্পিয়নস লীগে।

২০১১-১২ মৌসুম শুরু দলে যোগ দেন আগুয়েরো আর নাসিরির মত বিশ্বমানের প্লেয়ার, অসাধারণ দল, অসাধারণ মৌসুম। ম্যান ইউনাইটেড কে ওল্ড ট্রাফোর্ড এ নাকানিচুবানি খাইয়ে ৬-১ এর জয় তুলে নেয় সে মৌসুমে। আর লীগ শেষ করেন শিরোপা জয় করে, যে স্বপ্ন এক সময় কোন সিটি ফ্যান এর করা সম্ভব ছিল না, সেটিকেই বাস্তব এ পরিনত করে দেখান তিনি, জানিয়ে দেন এক সম্ভাবনাময় পরাশক্তির কথা, যারা শুধু টাকা নয়, অন্য দল গুলোকে নিয়েও খেলতে এসেছে।



তবে চ্যাম্পিয়নস লীগের ফাড়াটা কাটল না, উলটো মিউনিখ, নাপোলি আর ভিলারিয়াল নিয়ে গঠিত গ্রুপ অব ডেথ থেকে গ্রুপ পর্বেই বিদায় নেন।

২০১২-১৩ মৌসুমে আবারো চ্যাম্পিয়নস লীগে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেয় সিটি, তবে লীগ শিরোপালড়াইএ ২য় হয়েই এবার সন্তুষ্ট থাকতে হয় তাদের।

এতদিনে আল মুবারক এর চাহিদা আরো বেড়ে গেছে, তার ইউরোপে পরিচিতি চাই, তাছাড়া তার গম্ভীর আচরন প্লেয়ারদের কাছে অদ্ভুত হয়ে যাচ্ছে দিনদিন, তাই সব কিছু মেনে নিয়ে তাকে স্যাক করা হয় সিটির ম্যানেজার এর পদ থেকে।

তবে সিটির প্রতি তার এই কারনে কোন রাগ ছিল না, উলটো পত্রিকায় তিনি সিটি আর তাদের সমর্থক দের ধন্যবাদ জানান বিজ্ঞাপন এর মাধ্যমে, স্যাক হবার পরপরই, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন, সিটি ফ্যান রাও তাকে ফিরতি ধন্যবাদ জানাতে ভুলেন নি।

এরপর আসেন তার্কিশ ক্লাব গ্যালতাসারাই এ। ২০১৩-১৪ মৌসুমে তাদের তার্কিশ কাপ জিতালেও পরের মৌসুমেই মিউচুয়াল আন্ডারস্ট্যান্ডিং এর মাধ্যমেও গ্যালতাসারাই ছেড়ে দেন, কারন হিসাবে বলেন,

' দায়িত্ব নেবার সময় ক্লাব প্রেসিডেন্ট এর যে স্বপ্ন ছিল, তা এখন আর নেই '

এরপর আবার ইন্টারমিলানে ফিরে আসেন এই কোচিং জিনিয়াস, তবে বলারমত কোন সাফল্য নেই, তাই ইন্টারকে বিদায় জানিয়ে আপাতত রাশান জায়ান্ট জেনিথ সেন্ট পিটার্সবার্গ এর দায়িত্বে আছেন। তার কোচিং ভিশন ডিফেন্সিভ মাইন্ড এর, যার কারনে তাকে সমালোচিত হতে হয়েছে, তবে শিরোপা যেখানে শেষ কথা, সেখানে অন্য কিছু ধোপে টিকে না, তাই তার গুণগ্রাহী ও কম নয়। ম্যানচেস্টার সিটি আর রবার্তো মানচিনির কথা যদি বলা হয় তবে মানতেই হবে সিটির কাছে মানচিনি দেবতা স্বরূপ, সিটিকে লড়তে শিখিয়েছেন তিনিই। অনেকেই টাকার কথা হয়ত বা বলবেন, কিন্ত টাকা আপনাকে একগাদা প্লেয়ার দিতে পারবে, কিন্ত সেই প্লেয়ার পরিচালনার জন্য যে চালক প্রয়োজন তাকেও তো আপনার খুঁজে নিতে হবে, আল মুবারক পেরেছিলেন। এমন একজন খুঁজে নিয়েছিলেন, যিনি ম্যান সিটির ইতিহাসই বদলে দিয়েছিলেন। লীগের মধ্যভাগে লড়াই করা একটা দল কে ইপিএলের শিরোপালড়াই এ থাকা ঘোড়ায় পরিনত করেছিলেন, ম্যান সিটিকে নতুন ইতিহাসের সামনে এনে দিয়েছিলেন। আজকের ম্যানসিটির যে লড়াকু মনোভাব, শিরোপাক্ষুদার মনোভাব, তা জাগ্রত করেছিলেন এই মানচিনি। আর তার প্লেয়ার সিলেনকশান কতটা অসাধারণ তা আগুয়রো, সিলভা আর তরের দিকে তাকালেই বুঝতে পারবেন। নব্য সিটির নতুন দিনের লিজেন্ড এ পরিনত হয়েছেন তার শিষ্যরা।

শুধু ক্লাব এর বর্তমান না, ভবিষ্যৎ নিয়েও কম চিন্তা করেন নি এইভদ্রলোক। তার মস্তিষ্ক প্রসুত আজকের ১০০ মিলিয়ন ডলারে নির্মিত নতুন করে ঢেলে সাজানো ম্যান সিটির ইউথ একাডেমী। যেখান থেকে উঠে এসেছে সদ্য অনুর্ধ ১৭ বিশ্বকাপ জয়ী ইংল্যান্ড দলের সদস্য কার্তিস এন্ডারসন(জিকে), জোয়েল লাটিবিউদিয়ারে,ফিল ফোডন এর মত ভবিষ্যৎ তারকা। সময় আসবে যখন এক সময় সিটি ফ্যানরা গর্ব করে বলবে, আমাদের একজন মানচিনি ছিল যিনি আমাদের ভবিষ্যৎ এর ভিত গড়ে দিয়েছেন, আমাদের লড়তে শিখিয়েছেন। অবশ্যই সেই দিন আসবে..


নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন