ফুটবল ট্যাকটিক্সের অভিযোজন (দ্বিতীয় পর্ব) : পিভটম্যানের রাজত্ব

ফুটবল ট্যাকটিক্সের অভিযোজন (দ্বিতীয় পর্ব) : পিভটম্যানের রাজত্ব

ইস্তাম্বুল,২০০৫। উচল ফাইনালে মুখোমুখি কার্লোর মিলান আর রাফার লিভারপুল। নতুন করে ম্যাচটি নিয়ে বলার কিছু নেই। সেই ঐতিহাসিক কামব্যাক ফুটবল নাট্যশালাকে রোমাঞ্চিত করবে চিরকাল। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছিলেন সেই কামব্যাক কী নিছকই ভাগ্য? কিংবা আত্মবিশ্বাসের এক অবিস্মরণীয় প্রতিচ্ছবি? নাকি তার পিছনে কাজ করছে ক্ষুরধার মস্তিষ্কের কৌশলগত এক দিক যার বিবর্তন ফুটবল রেভুলেশনকে এগিয়ে দিয়েছি এক যুগ।

খেলার প্রথমার্ধে লিভারপুলের ম্যানেজার রাফায়েল বেনিতেজ মাঝমাঠের পেছনে কাকা সিডর্ফদের আটকাতে একা আলোনসোকে খেলালেন। ফলাফল? মিলান ৪৫ মিনিটের মাঝেই মোটামুটি ম্যাচ জেতা নিশ্চিত করে ফেলল। একা আলোনসো কাকা সিডর্ফ কিংবা ক্রেসপোকে সামলে রাখবেন নাকি সামনে বল থ্রু করবেন! এরপর দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে আলোনসোর সাথে মাঝমাঠের পেছনে'সেকেন্ড পিভট' হিসেবে যুক্ত হলেন ডিটমার। খেলার নকশা বদলে গেল। ৬ মিনিটের ভিতর ম্যাচের স্কোরলাইন ৩-৩। যা কিনা সম্ভব হয়েছিল বেনিতেজের সূক্ষকৌশলগত এট্রিবিউটের কারনে। দেয়ালে পিঠ ঠেকা বেনিতেজ যেন চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন সরাসরি চিরাচরিত ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার না খেলিয়ে মর্ডান যুগে ডাবল পিভটে একজন রেজিস্তাকে জায়গা করে দেওয়াটা বরঞ্চ বেশি ফলপ্রসু।



এখন সহজাত মনেই প্রশ্ন জাগে পিভট আসলে কী? এর জন্ম কার বা কাদের হাত ধরে? আসলে নির্দিষ্ট কারো হাত ধরে এর জন্ম হয়নি। এর ভাবনা এসেছে বিবর্তনের যুগে তাল মিলিয়ে ফর্মেশন ও রেজিস্তাদের অভিযোজনের ফলে। ঠিক তেমনি এর সঠিক সীমাবদ্ধ কোনো সংজ্ঞা আমার জানা নেই। তবে আশির দশকে যখন 'নাম্বার টেন'এর রাজত্ব শুরু হয় এবং ম্যারাডোনা প্লাতিনিরা ফুটবল নাট্যমঞ্চে আবির্ভাব যখন রেজিস্তা রোলকে বিবর্তনের মুখে ফেলে দেয় তখনই শুরু হয় পিভট বা ডাবল পিভটের মত 'উদ্ভট' চিন্তা। (পাশের ছবিঃ মডার্ন ৪-২-৩-১ ফরমেশন)


সে সময় চারজন ডিফেন্ডারের ঠিক সামনে একই সমান্তরালে দুজন মিডফিল্ডার (একজন ডিপ লায়িং প্লেমেকার অন্যজন রেজিস্তা) খেলানোর চিন্তা রীতিমত পাগলাটে মনে হয়েছিল ফুটবল বিশ্লেষকদের কাছে। আর সেই উদ্ভট পাগলাটে চিন্তাভাবনা থেকেই ফুটবল রেভুলেশনে এক নতুন যাত্রার শুরু হয় যাকে আমরা পিভট কিংবা ডাবল পিভট হিসেবে এখন শুনি। 


টরিনহো ছিলেন মধ্যযুগের রেজিস্তাদের পথিকৃত। খেলতেন সিরি আর সাম্পাদোরিয়ার। একই লীগে রোমায় খেলতেন সেসময়ের অন্যতম সেরা একজন প্লেমেকার ফ্যালকাও। কিন্তু ভিনসেন্টের একাদশে তার জায়গা ছিল কিনা মাঝমাঠেরও পিছনে টলিনজোর প্রায় সমান্তরালে!  হাসির পাত্র হয়ে গিয়েছিলেন তখনকার ব্রাজিলিয়ান কোচ ভিনসেন্স। কিন্তু সেই 'পাগল' ভিনসেন্টের গড়া ৮২ এর ব্রাজিল দলই নাকি বিতর্কিতভাবে বিশ্বকাপে ব্রাজিলের সবথেকে ভয়ঙ্কর দল ছিল! আরও মজার বিষয় হলো যখন শুনতে হয় সেই ব্রাজিল দলেন সাফল্য ছিল বিশ্বকাপে ৫ম!


অদৌ দলটা কতটা ভয়ঙ্কর ছিল সে বিতর্কে না হয় না যাই। কিন্তু সেই দলের সফলতার পিছনে বড় কারন কোনটি? দলে জিকো ফ্যালকাও এডেরদের মত তারকা ফুটবলারদের উপস্থিতি?? না। এর কারন ছিল টরিনহো ফ্যালকাও দুজনকে একই সমান্তরালে মাঝমাঠের পিছনে খেলানো। শুনতে অবাক লাগলেও এটাই সত্য। ক্লাসিক্যাল টেন ও নাম্বার টেনের বিবর্তন তখন ডিফেন্ডার কোচদের রাতের ঘুম হারাম করে দিচ্ছিল স্পেশালি বিপক্ষ দলে যখন প্লাতিনি, ম্যারাডোনা, ভ্যান বাস্তেন কিংবা রসির মত কেউ থাকেন তবে তো কথাই নেই। 

          • ছবিঃ 'পাগলাটে' ভিনসেন্টের ৮২' এর ব্রাজিল

সত্তর আশি দশকে একজন রেজিস্তা এবং ডিপ লয়িং প্লেমেকারের মাঝে ছিল বিস্তর ফারাক। মূলত এ পার্থক্য ফুটে উঠত রক্ষনের দক্ষতায়,দ্বায়িত্বে এবং শারীরিক ও কৌশলগত ফুটবলে। একজন রেজিস্তাদের রক্ষণের দায়িত্ব খুব একটা পালন করতে হয় না, এ কারণে একজন প্রথম শ্রেণীর রেজিস্তাকে দক্ষ ট্যাকলার বা লম্বা-চওড়া ক্ষমতাবান বা খুব ক্ষীপ্র হতে হবে এমন কথা নেই। এক্ষেত্রে ম্যানেজারদের একটু ঝামেলা পোহাতে হয়। কারণ কোন ম্যানেজার যদি একটু বেশি সতর্ক বা রক্ষণাত্মক হন তবে মাঝমাঠের পিছনে শুধু একজন রেজিস্তাকে রাখা একটু বিপজ্জনকই বটে। এ ধারনা থেকেই কোচ ভিনসেন্ট টলিনহো ও ফ্যালকাওকে একই সমান্তরালে রেখে খেলা শুরু করেন এবং গড়ে তোলেন এক অবিশ্বাস্য ফুটবল ডুয়ো। আর সেই সাথে সাথে কালের বিবর্তনে রেজিস্তা ও ডিপ লয়িং প্লেমেকারদের মধ্যকার মৌলিক পার্থক্য কমতে থাকে এবং মর্ডান ফুটবলে এ দুটো শব্দ প্রায় সমার্থক হিসেবেই ব্যাবহৃত হয়।

বর্তমান সময়ে রেজিস্তাদের সাথে তারই সমান্তরালে জুটি বাধতে দেয়া হয় একজন মারকুটে প্লেয়ারকে ফুটবলের ভাষায় যাকে 'ডেস্ট্রয়ার' বলা যায়। এর উদাহরন হিসেবে প্রায় প্রতিটি সফল দলেই এর প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। গত শতকে ইতালি বা মিলানে পিরলোর সাথে গাত্তুসো,বার্সায় জাভির সাথে বুস্কেট, আলোনসোর সাথে লিভারপুলে মাসচেরানো কিংবা মাদ্রিদে খেদিরা কিংবা ল্যাম্পার্ডের সাথে ম্যাকলেলের উপস্থিতি এসবেরই উদাহরন। শোয়েনস্টাইগার খেদিরা জুটিকেও একই দায়িত্বে দেখা গেছে ১৪ বিশ্বকাপে।  ১৩ ট্রেবল জয়ে বায়ার্নের শোয়েইনির সাথে এ কাজটি করেছিলেন মার্টিনেজ। 

যদিও ডাবল পিভটের ব্যাবহার একটি গন্ডিসীমার মধ্যেই আবদ্ধ। হাতে মাত্র একটা ফর্মেশন।  তাই Plan B অথবা Plan C মাথায় রেখে একজন কোচ যখন ছক কষেন তখন সিঙ্গেল পিভটে থাকে বেশ কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষার সুযোগ। যেমন ৪-১-৩-২; ৫-১-১-৩ কিংবা ৫-১-৩-১ যা নির্ভর করে দলের সামর্থ এবং কোচের দর্শনের উপর। 



মর্ডান রেজিস্তাদের আদর্শ পিরলো একই সাথে ডাবল পিভট ও সিঙ্গেল পিভট উভয় রনকৌশলেই ছিলেন সমান সফল। জুভেন্টাসের সিংগল পিভট সিস্টেমে সাফল্য আসার কারণ ছিল তুরিনের ক্লাবটির রক্ষণকৌশল। রক্ষণাত্মক খেলার প্রয়োজন হলে পিরলো আরো নিচে নেমে বনুচ্চির প্রায় সমান্তরালে দাঁড়িয়ে যেতেন, সেক্ষেত্রে কিয়েলিনি এবং বারজাগলি উইংয়ের দিকে সরে গেলেই রক্ষণে চারজন মানুষ দাঁড়িয়ে যেত। আবার মাঝমাঠে যদি রক্ষণাত্মক সাপোর্টের প্রয়োজন হয় সেক্ষেত্রে বনুচ্চি কিছুটা ওপরে উঠে পিরলোর ‘ডেস্ট্রয়ার’ জুটি হয়ে যেতেন। ঐ সময়ে কিয়েলিনি এবং বারজাগলি চেপে এসে সেন্টার ব্যাকের কাভার দিতেন এবং এভরা বা লিখস্টাইনারদের মাঝে যেকোন একজন উইং ব্যাক নিচে নেমে রক্ষণের বাড়তি সাপোর্ট হিসেবে প্রস্তুত থাকতেন। ওদিকে মাঝমাঠে ভিদাল, পগবা এবং মার্কিসিও - তিনজনেরই আছে সেই বাড়তি গতি এবং শক্তি যা পিরলোর দুর্বলতাগুলোকে সুন্দরভাবে ঢেকে দেওয়ার জন্য একেবারে পারফেক্ট! তবে সিঙ্গেল পিভটে সফলতার অন্যতম আরেক উদাহরন হলেন বুস্কেটস। (পাশের ছবিঃ ডিফেন্স সমান্তরালে পিরলোর পিভট রোল)

এখন প্রশ্ন আসে ট্যাকটিক্স সেন্সে পিভট কীভাবে ইউজ করতে হয়? আর এতো ইম্পরটেন্স ই বা কেন এই পজিশন এর?একজন ম্যানেজার এর তুরুপ এর সব থেকে ইফেক্টিভ তাস ই হলো হোল্ডিং মিডফিল্ডার।কিভাবে? ধরুন আপনার ম্যাচ প্রায় জেতাই হয়ে গেছে।।শুধু কয় মিনিট ডিফেন্স করতে হবে। কাকে এক্সট্রা ডিফেন্ডার ইউস করবেন? হ্যা পিভট ম্যানকে। অথবা এটাকিং ফুটবল অর অল আউট এ্যাটাক খেলবেন। কে আপনাকে নির্ভার এটাকিং এর নিশ্চয়তা দিবে? ওই পিভট ম্যান।

মাঠে পিভটদের কাজকে অনেকটা ব্রেইনের নিউরোগ্লিয়ার সাথে তুলনা দেয়া যায়। যা একসাথে সাপোর্টও দেয় এবং ফ্যাগোসাইটোসিসের কাজও করে। মানেটা হলো একই সাথে মিডফিল্ডে জায়গা কাভার করা এবং তুখোড় ডিফেন্সিভ ওয়ার্ক হলো সেই ফ্যাগোসাইটোসিস অর রেস্পিরেশন। একারনে বর্তমানে দলের সাফল্য সবথেকে বেশি নির্ভর করে পিভটদের ওয়ার্করেটের উপর। 

তবে মর্ডান ফুটবলে 'ফলস নাইন' 'ফলস টেন' কিংবা 'ইনভার্টেড উইঙ্গার'এর উত্থান পিভট রোলকে আরও কৌশলগত করে তুলেছি। মাঝমাঠের খেলায় পিভটের কাজটা অনেকটা শহরের ওয়াসালাইনের মত। অপনেন্ট যখন হাইপ্রেস করে তখন তাদের পাসিং লেনব্রেক করার দ্বায়িত্ব এই পিভটম্যানের উপরই পড়ে। কিংবা অপনেন্ট টিমকে সাইডে টেলে দিয়ে উইঙে নিয়ে গিয়ে ক্রস করাতে বাধ্য করে ডিফেন্ডারদের সামনের জায়গা কাভার করা সোজা কথায় 'জোন ১৪' সুরক্ষিত রাখাও পিভটদের দ্বায়িত্বে থাকে। এ কাজটাই বার্লিনে দ্বিতীয় হাফে টনিক্রুস করেছিলেন জুভের বিপক্ষে। ফলাফল দ্বিতীয় হাফের রেজাল্ট মাদ্রিদ ৩-০ জুভ!


                • ছবিঃ উইঙে ঠেলে দিয়ে জোন ১৪ কাভার করা সোজা কথায় সুরক্ষিত রাখা

    খুবই সূক্ষ ট্যাকনিক্যাল এট্রিবিউট না হলে এ কাজগুলো করা যায় না। আবার দলের হাফ স্পেসকে কিজে লাগানো ডিফেন্ডারদের সমান্তরালে এসে উইঙব্যাকদের পূর্ণ স্বাধীনতা দানেও পিভট রুলের সাহায্য নিতে হয়। যা দলের কাউন্টার এ্যাটাক তৈরী করতে সাহায্য করে। জিদানের মাদ্রিদে যে কাজটা করে থাকেন ক্যাসিমেরো কিংবা মতিকাকুর মাদ্রিদে যে দ্বায়িত্বে থাকতেন খেদিরা। সেন্টারব্যাকদের মাঝে সমান্তরালে ডুকে সেন্টারহাফদের দুই পাশে টেলে দেয়াটা সিঙ্গেল পিভটদের কাজ যাতে করে প্রতিপক্ষের ইনভার্সড উইঙ্গারদের কাটইন করার সুযোগ কম থাকে। ১৫ তে উচল সেমিফাইনালে মাদ্রিদের বিপক্ষে বেল রোনালদোদের থামাতে পিরলো ঠিক একই কাজ করেছিলেন। 


                  • ছবিঃ বেল রোনালদোকে কাটইন করতে বাধা দিয়ে ক্রস করতে বাধ্য করা


    এজন্যই গতিময় ফুটবলের যুগে ফুটবল কৌশলের পূজারীদের চোখে পিভট রোলটা 'কম্পলিট বিউটি'। দেখে চোখ মুখ নাক কান কলিজা সব কিছুই জুড়াবে।


    প্রথম পর্ব পড়তে ক্লিক করুন



    নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

    আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন