প্রিমিয়ার লীগ মনে রাখবে পিটার চেককে!

প্রিমিয়ার লীগ মনে রাখবে পিটার চেককে!

রূপকথা কিংবা ইতিহাসে হ্যামলেট, ম্যাকবেথ কিংবা ওডিপাস নামের গুটিকয়েক ট্র্যাজিক হিরোর নাম শোনা যায়। পিটার চেক ঠিক আসলে সে অর্থে ট্র্যাজিক হিরো হয়ত না, কিন্তু চেক দেশে পিটার চেক হয়ত সত্যিই কোন এক সৈন্য সামন্তহীন দুঃখী সম্রাট। নেদভেদের হাত থেকে চেক প্রজাতন্ত্রের নিশানবাহী সেই রাজকুমার এখন নিজের ক্যারিয়ারেরও পড়ন্ত বেলায়।  ক্লাব ফুটবল সত্যিই কিছু কিছু ক্ষেত্রে জাতীয় দলের উর্ধ্বে। না হয় একজন পিটার চেকের কি-ইবা করার থাকতে পারে চেক প্রজাতন্ত্রকে নিয়ে! নিকট অতীতে তার সেরা টিমমেট তো থমাস রসিস্কি, যাকে অবশ্য চোখ বন্ধ করে বসিয়ে দেয়া যায় হ্যামলেট কিংবা ম্যাকবেথের আসনে, প্রবল সম্ভাবনা ছিল একজন কিংবদন্তী হওয়ার, কিন্তু ভাগ্য তার জন্য লিখেছিল অন্য কিছু। ইঞ্জুরিতেই জর্জরিত ক্যারিয়ার সাবেক ঐ গানার্স নাম্বার সেভেনের। যাই হোক, যদি প্রিমিয়ার লীগের ইতিহাসের সেরা পাচঁজন গোলকিপারের তালিকা করা হয় তবে সেখানে খুব ভালভাবেই উঠে আসবে চেকের নাম, অন্তত তার গ্ল্যামার না হোক, রেকর্ড তো কথা বলে।


১৯৮২'র মে তে জন্ম নেয়া এই চেক কিংবদন্তী ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগে আসেন ২০০৪ এ। রানিয়েরির হাত ধরে ফরাসি রেনেস থেকে চেলসির ইতিহাসের সবথেকে দামী গোলকিপার হিসেবেই পদার্পন করেছিলেন, পয়সাও ফিরিয়ে দিয়েছেন দস্তানা হাতে। দারুন রিফ্লেক্স, পজিশনিং আর শক্ত মনোবল, যথেষ্ট ছিল চেকের জন্য। প্রমান দিয়েছিলেন নিজের প্রথম ইপিএল ম্যাচেই। ইউনাইটেডের সাথে রেখেছিলেন ক্লিনশিট। ঐ ২০০৪-০৫ সিজনেই ১০২৫ মিনিট গোল হজম না করার রেকর্ড গরেন চেক, যদিও পরবর্তীতে ভ্যান ডার স্যার সে রেকর্ড ভেঙ্গে দেন। সেবার লীগে ২১ টি ক্লিনশিট রেখে এক সিজনে সর্বোচ্চ ক্লিনশিট রাখার নজির গড়েন তিনি। স্বীকৃতি স্বরূপ পেয়েছিলেন গোল্ডেন গ্লাভসও। ঐ সিজনে চেলসি লীগে মাত্র ১৫ গোল হজম করে, যে রেকর্ড অক্ষুন্ন রয়েছে আজ অবধি।

কিংবদন্তী হওয়ার পথে ব্লুজদের হয়ে খেলেছিলেন ৪৮৬ ম্যাচ, ভীনদেশি হয়ে চেলসির গায়ে সর্বোচ্চ আর ক্লাব ইতিহাসের তালিকায় ছয় নম্বরে। শুধু চেলসির হয়েই জিতেছেন ৪ টি প্রিমিয়ার লীগ, ৪ এফ এ কাপ, ৩ লীগ কাপ, ১ ইউরোপা লীগ, ১ চ্যাম্পিয়ন্স লীগ।

হেড ইঞ্জুরি এবং প্রত্যাবর্তনঃ

হয়ত অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে পিটার চেকের মাথায় হেডগার্ড কেন? আজকে যে পিটার চেক প্রিমিয়ার লীগ ইতিহাসে সর্বোচ্চ ক্লিনশিটের অধিকারী, তার ক্যারিয়ার এমনকি জীবন শেষ হয়ে যেতে পারতো ২০০৬ তেই। মাজেস্কি স্টেডিয়ামে রেডিংয়ের বিপক্ষে ম্যাচের প্রথম মিনিটে স্টেফান হান্টের সাথে মাথায় সংঘর্ষে অজ্ঞান হয়ে মাঠ ছাড়েন চেক, সে ম্যাচে চেলসির দ্বিতীয় গোলকিপারও ইঞ্জুর্ড হলে বিরল এক দৃশ্যের আবির্ভাব হয়. জন টেরিকে দেখা গিয়েছিল সে ম্যাচে দস্তানা হাতে। যাই হোক, ইঞ্জুরি আক্রান্ত চেকের মেডিকাল রিপোর্ট তার পক্ষে কথা বলছিল না। ডাক্তারের মতামত ছিল ফুটবল ছেড়ে দেওয়া, কিন্তু চ্যাম্পিয়নরা কি এমন হয়? যুদ্ধ জয় করে ফিরে আসাই তো তাদের সাথে মানায়, প্রায় ৬ মাস পর মাথায় হেডগার্ড নিয়ে লিভারপুলের বিপক্ষে মাঠে নামেন চেক।


চ্যাম্পিয়ন্স লীগ শিরোপাঃ

চেক তার ক্যারিয়ারে একবার ক্লাব পর্যায়ের সবথেকে সেরা এই শিরোপা জিতেছেন। বায়ার্নের বিপক্ষে ১১-১২' র ফাইনালে সাবেক সতীর্থ রোবনের অতিরিক্ত সময়ে নেয়া পেনাল্টি সহ শ্যুটআউটে আরও ২ টি পেনাল্টি সেভ করে অনন্য নজির গড়েন এবং ফাইনালে সমর্থকদের ভোটে ম্যান অব দ্যা ম্যাচ নির্বাচিত হন। ২০১৫-১৬ মৌসুমে চেক এবং চেলসির দীর্ঘ ১১ বছরের সম্পর্ক শেষ হয় এবং চেকের নতুন ঠিকানা হয় রসিস্কির আর্সেনাল৷ আর্সেনালে গিয়ে প্রথম শিরোপাই জিতেন চেলসিকে হারিয়ে। সে ম্যাচেও ক্লিনশিট রাখেন তিনি।

চেকের যত অর্জনঃ

-প্রিমিয়ার লীগ ইতিহাসে সর্বকালের সর্বোচ্চ ক্লিনশিট - ১৯০ টি ( গত সিজন পর্যন্ত)

-চেলসির ইতিহাসে সর্বোচ্চ ক্লিনশিট ২২০টি৷

-এক সিজনে সর্বোচ্চ ক্লিনশিট ২১ টি (যৌথভাবে ) 

-প্রিমিয়ার লীগের সেরা গোলকিপার ৪ বার।

-চেক প্রজাতন্ত্রের সেরা ফুটবলার-৯ বার।

-উয়েফা ক্লাব ফুটবল বেস্ট গোলকিপার-৩ বার ৷ 

-ইউরোপের সেরা গোলকিপার - ৩ বার।

একজন গোলকিপার হিসেবে ব্যক্তিগত অর্জনের দিক থেকে ইকার, বুফন কিংবা নয়্যারদের চেয়ে হয়ত খুব একটা পিছিয়ে নেই তিনি। হয়ত জাতীয় দলটা চেক বলেই ফুটবলের কোন এক ট্র্যাজিক হিরো তকমা পেয়েই যাবেন দস্তানা যুগল খুলে ফেলবার পরে.. ভাল থাকবেন কিংবদন্তী!

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন