কেন ধুঁকছে রিয়াল মাদ্রিদ?

কেন ধুঁকছে রিয়াল মাদ্রিদ?

গত দুই সিজনে দুইবার ইউরোপ শ্রেষ্ঠতের মুকুট, এই বছরের ক্লাব ওয়ার্ল্ড কাপ বাদ দিয়ে ধরলে বগলদাবা করেছে ৭ টি ট্রফি। সেই রিয়াল মাদ্রিদই কিনা লীগে অবস্থান চতুর্থ! ইউভেন্টাসের নিশ্ছিদ্র রক্ষণকে যে রোনালদো ইস্কোরা গুণে গুণে ৪ টি গোল দিয়েছেন, তারাই কিনা হিরোনা, বেটিসের মতো দলের বিপক্ষে গোল খুঁজতে ব্যর্থ হচ্ছে!


জিনেদিন জিদানের অদম্য রিয়াল মাদ্রিদ যেন নিজেদের ছায়া হয়ে নিজেদেরকেই খুঁজছে। অবশ্য এর পিছনে কিছুটা দায়ভার ফরাসি কিংবদন্তিকেও নিতে হবে। ছোট ছোট বালুকণা, বিন্দু বিন্দু জল যেমন গড়ে তোলে মহাদেশ, মহাসমুদ্র, অচল তেমনি ছোট ছোট ভুল থেকেই মারাত্মক বিপত্তির জন্ম নেয়।


দলবদলের সময় ভুল সিদ্ধান্ত


স্যার এলেক্স ফার্গুসন-

"আপনি যদি এক মৌসুমে লীগ জেতেন পরবর্তী মৌসুমে ব্যাঙ্ক ভেঙে ফেলতে হবে"


১৩ বার লীগজয়ী ফার্গুসনের এই উক্তিকে শুধুমাত্র বুড়ো আঙুল দেখাতে পেরেছেন গার্দিওলা, কারণটা সোজা- টিকিটাকা একটি ক্লান্তিহীন সিস্টেম। লীগ জয়ী মৌসুমে খেলোয়াড়দের যে পরিমাণ বার্ন আউট হয় তা নতুন ট্রান্সফার দিয়ে পূরণ করতে হয়। অথচ মাদ্রিদ হাত থেকে হামেস, মোরাতা, ডিয়াজ তিন তিনটা গোলস্কোরিং অস্ত্র ছেড়ে দিয়েছে। অন্তত দুইজনকে রাখার চেষ্টা করতে হতো, বিনিময়ে ফিরিয়ে এনেছে মায়োরালকে যিনি কিনা ভল্ফসবুর্গের মূল একাদশে সুযোগ পেতেই ব্যর্থ ছিলেন!


রোটেশন পলিসির অভাব


গত মৌসুমে জিদানের অন্যতম কৌশল ছিল রোটেশন, ২২ জন খেলোয়াড় ১০০০+(প্রায় ১১ ম্যাচ) মিনিট পেয়েছেন। কিন্তু এই মৌসুমে জিদানের রোটেশন বেল, ভাস্কেজ, এসেন্সিওর(ক্ষেত্রবিশেষে থিও) মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। সেবায়েস, কাস্তিয়া কোচ থাকাকালীন প্রিয় ছাত্র ইয়রেন্তেকে যেন ভরসা করতে পারছেন না, না পারছেন থিতু হতে না পারছেন এগোতে।


ইস্কো-এসেন্সিওর সিদ্ধান্তহীনতা এবং ভাস্কেজের ফর্মহীনতা


গত মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদের সাফল্যের অন্যতম কারণ ছিল এই তিনজন। বিশেষত প্রথম দুইজনের অসাধারণ ফর্মের নৈপুন্য রোনালদোবিহীন অনেক ম্যাচ জয় করেছে মাদ্রিদ। এবারও সুপার কাপে রোনালদো ছাড়া প্রায় ১৭০ মিনিট শাসন করেছে এই দুইজন বার্সেলোনাকে।


কিন্তু এসেন্সিও বর্তমানে লাগামহীনভাবে শট নিয়ে যাচ্ছেন, এমনকি পাস দেওয়ার অবস্থানে থাকলেও শট নিচ্ছেন। জিদান অব্যশই চাইছেন এসেন্সিও স্কোরারে পরিণত হোক, যেটা একটা ভালো সিদ্ধান্ত, কিন্তু দল বাঁচা মরা অবস্থায় অন্তত নয়।


ইস্কোর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আরেকটু অন্য মাত্রায়। ড্রিবল করছেন ঠিকই কিন্তু বলটা রিলিজ করার প্রয়োজন তখন করছেন না।


বেঞ্জেমা-রোনালদোর ফর্মহীনতা


সপ্তাহ দুয়েক আগে ইউরোপের শীর্ষ ৫ লীগে বেঞ্জেমা আর রোনালদোর কনভার্সন রেট ছিল এতটাই নিম্ন ছিল যে ইতালিয়ান লীগের তলানির দলের স্ট্রাইকারের সাথে তুলনা জুটেছিল!


রোনালদোর মতো পরীক্ষিত খেলোয়াড় যিনি কিনা প্রিমিয়ার লীগের ও লা লীগার এক মৌসুমে সর্বোচ্চ গোলের আসনে যথাক্রমে ১ম ও ২য় তিনিই লীগে গোলক্ষরায় ভুগছেন! যার কাছে মৌসুমে ৫০ গোল মুড়ি মুড়কির ব্যাপার তিনিই ভুগছেন জালের দেখা পেতে।


ফর্মেশন নির্বাচনে ভুল


জিদান বর্তমানে মাদ্রিদে ৪-৪-২ ফ্ল্যাট প্রয়োগ করছেন।কিন্তু ৪-৪-২ খেলার জন্য আদর্শ হলো ট্র‍্যাডিশনাল উইঙ্গার অর্থাৎ যারা কাট ইন করেন না যেমন (গিগস, ফিগো, রবার্তো, ভাস্কেজ, বার্নাদো সিলভা, বেকহাম)। কিন্তু ইনভার্টেড উইঙ্গার যারা কাট ইন করতে চান (যেমন পিরেস, রোনালদো, নেইমার, রোবেন) সেক্ষেত্রে ৪-৪-১-১ বানাতে হয় একটা ক্রিয়েটিভ/সেকেন্ড স্ট্রাইকার (যেমন বার্গক্যাম্প, দেল পিয়েরো, রুনি) দলে যোগ করে।


ইউনাইটেডে রোনালদোর মতো কাট ইন উইঙ্গার আর গিগসের মতো ট্র‍্যাডিশনাল উইঙ্গার একসাথে খেলানোর জন্য ফার্গুসন ফোরল্যানকে বাদ দিয়ে রুনির মতো সৃজনশীল স্ট্রাইকারকে খেলাতেন।

আবার দুই ট্র‍্যাডিশনাল উইঙ্গার বার্নাদো সিলভা আর আন্দ্রে গোমেজকে নিয়েও ফার্নান্দো সান্তোস ৪-৪-২ ব্যবহার করেন পর্তুগালে, কারণ আক্রমণভাগে রোনালদো(বর্তমান রোনালদো) আর সিলভা কেউই ক্রিয়েটিভ স্ট্রাইকার না। এজন্য সান্তোস এভারেজ পারফর্মেন্সের পরেও গোমেজকে খেলান ন্যানির(যে ইনভার্টেড উইঙ্গার) পরিবর্তে। 


ইস্কোর সেরা প্রদর্শনী অধিকাংশই সেন্টারে (ইউভে ম্যাচে ৩-৫-২ খেলায় ইস্কো ২ vs ১ সিচুয়েশনের ফায়দা নিচ্ছিলেন, যেটা রোনালদো পারছিলেন না)। তাকে উইঙ্গে খেলানো মানে তার সৃজনশীলতা সম্পূর্ণ ব্যবহার না করা। আর এসেন্সিও ইনভার্টেড উইঙ্গার, তাকে এতটা নীচে খেলালে সেরাটা পাওয়া যাবে না। বিস্ময়কর ভাবে এই ফর্মেশনের জন্য আদর্শ ভাস্কেজ, কিন্তু কেন যেন ব্যাপারটা খাপে খাপ হচ্ছে না।


রিয়ালের জন্য উপযুক্ত হয় ৪-২-১-৩ এই লাইন আপ, যেখানে ইস্কো স্ট্রাইকারের পিছনে, রোনালদো আর এসেন্সিওও ফিরে পাবেন তাদের উইঙ্গ। যেহেতু ক্যাসেমিরো পাসিং এ উন্নতি করেছেন তাকে ডাবল পিভোটে খেলানোই যায়।


নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন