ফিলিপ হিউজঃ জীবনযুদ্ধে পরাজিত হলেও ক্রিকেট ময়দানে চির-অপরাজিত

ফিলিপ হিউজঃ জীবনযুদ্ধে পরাজিত হলেও ক্রিকেট ময়দানে চির-অপরাজিত

হিউজনামা


ওয়ান্ড্রেসকে ব্যাখা করতে গিয়ে সঞ্জয় মঞ্জরেকার একবার বলেনঃ "ওয়ান্ড্রেসে প্রথম ঘন্টায় ১৫ বার বল ছেড়ে দিতে হয়।"


পার্থের পর সবচেয়ে বাউন্সি আর দ্রুত উইকেট ওয়ান্ড্রেসকে মনে করা হয়। এই ওয়ান্ড্রেসেই অভিষেক হয় হিউজের। ওয়ান্ড্রেসে অভিষেকে এসে খুব কমই থিতু পেরেছেন ইতিহাসে, হিউজও ব্যাতিক্রম নন। চতুর্থ বলেই ০ করে সাজঘরে ফিরেছিলেন। তবে ঘুরে দাঁড়ালেন দ্বিতীয় ইনিংসে, নড়বড়ে অস্ট্রেলিয়াকে একটা ভিত্তি দিলেন ৭৫ রানের ইনিংস খেলে।


ডার্বানে দ্বিতীয় টেস্টে বিশ্ব দেখল হিউজের ব্যাটিং আসলে কতটা শোভনীয়। স্টেইন এন্টিনিদের মোকাবিলা করে দুই ইনিংসে জোড়া শতক লাগালেন। অফ সাইডে একের পর এক বুলেট শট খেলে যাচ্ছিলেন, অভিষেক সিরিজেই সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক! তাই সাউথ আফ্রিকা থেকে ফেরার পর তার শহরের প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ ক্রিকেটারদের নামে নতুন এক এওয়ার্ড আসে- ফিলিপ হিউজ এওয়ার্ড! রাতারাতি সেলিব্রেটি হয়ে যাওয়া যাকে বলে।


যেখানে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন খোদ ব্র‍্যাডম্যানকে


হিউজ দলে ডাক পেয়েছিলেন ঘরোয়া ক্রিকেটে নিউ সাউথ ওয়েলসের হয়ে নিয়মিত ভালো প্রদর্শনীর কারণে। অভিষেক মৌসুমে ৫৫৯ রান করেন এক সেঞ্চুরী ও ৬ ফিফটি সহ।  পন্টিং ২০১০ এ ইঞ্জুরীর পর প্রায় ১ বছর পর বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে সেঞ্চুরী করেছিলেন। তখন ভোগলে বলেছিলেন


"Champion performs when it matters the most"


হিউজের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা তাই। তাসমানিয়ার বিপক্ষে যখন দল সপাটে তাসের ঘরের মতো ভেঙে যাচ্ছিল তখন অনবদ্য এক সেঞ্চুরী উপহার দেন। দলের ৫৮.৩% রানই তিনি করেন। ব্র‍্যাডমান ১৯৪০ এ, সাউথ অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে দলের ৫৮.২% রান করেন। অর্থাৎ ব্র‍্যাডম্যানকে ০.১% এ ছাড়িয়ে যান!


টেকনিক্যাল দুর্বলতা, আ্যশেজ ও যাওয়া আসা


অস্ট্রেলিয়ান হয়ে পুল শট খেলতে সমস্যা? এটা শুনলে রীতিমতো অট্টহাস্যর পাত্র হতে হবে যে কাউকে। শুধুমাত্র দুই সাবেক অসি অধিনায়ক স্টিভ ওয়াহ আর মাইকেল ক্লার্কের এই সমস্যা ছিল। তবে ওয়াহ ছিলেন যোদ্ধা আর ক্লার্কের সমস্যা প্রবল হয় তার পিঠের ইঞ্জুরীর পরে। কিন্তু হিউজ দুটোর একটাও না।


হিউজ মূলত ডানহাতি যে বামহাতে ব্যাট করতেন। অবশ্য এরকম ঘটনা বিরল না, ক্রিকেটে ভুরি ভুরি পাওয়া যাবে। কিন্তু আসলে ডানহাতি কিন্তু ব্যাটে বামহাতি হলে তাদের টপ হ্যান্ড(ডান হাত) বটম হ্যান্ডের(বাম হাত) থেকে বেশি কার্যকরী হয়, অর্থাৎ তারা অফসাইডে বেশী সক্রিয় হন লেগসাইডের তুলনায়, তবুও সময়ের সাথে শট উন্নত করে ফেলে সবাই। উপমহাদেশী হলে শর্ট বলে সমস্যা থাকে কিন্তু অস্ট্রেলিয়ানদের তা হয় না। কিন্তু হিউজ সেটারই শিকার।

০৯ এর অ্যাশেজে ব্রড আর এন্ডারসন মিলে তার এই দুর্বলতাকে একিলিস হিল করেন, ফলাফল বাজে প্রদর্শনী হিউজের এবং ওয়াটসনের কাছে জায়গা হারান। পরের দুই বছর আসা যাওয়ার মাঝে ছিলেন হিউজ।


পন্টিং এর অবসর এবং দলে কিছু সময় থিতু হওয়া


১২তে পন্টিং এর অবসরের পর দলে কিছু সময় থিতু হন হিউজ। ১৩ যদি অশুভ নাম্বার হয় হিউজের ক্ষেত্রে সেটা ৮০। প্রায় ডজনখানেক শতক ৮৬-৮৭ তে আটকে গেছে তার। ৪ বছর টেস্ট খেলার পর ওয়ানডেতে সুযোগ পান ১৩ তে। টেস্টের মতো এখানেও বাজিমাত, প্রথম ওয়ানডেতেই শতক শ্রীলংকার বিপক্ষে। এবং ওই সিরিজে যে দুটি ম্যাচ জিতেছিল অস্ট্রেলিয়া দুটিতেই হিউজের শতক ছিল! কিন্তু এরপর অ্যাশেজ আর ভারত সিরিজ ভুলে যাওয়ার মতো।


স্মিথ আর ফিঞ্চের উত্থান এবং ফের দলে জায়গা হারানো


ইংল্যান্ডের সিরিজে ওয়ানডেতে ফিঞ্চ ও টেস্টে স্মিথের উত্থানের ফলে আবারও জায়গা হারান হিউজ। হোমে অ্যাসেজ এবং দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজে এদের নৈপুন্যে জেতে অস্ট্রেলিয়া।


এবটের সেই শর্ট বলটি

এরপর ঘরোয়া ক্রিকেটে আবার রানের ছড়ি ঘুরাতে থাকেন হিউজ। সেই প্রদর্শনীর সুবাদে ভারত সিরিজে জায়গা মেলে হিউজের। ঘরোয়া ম্যাচে সিন এবটের বলে হুক শট লাগাতে না পারায় কানের নীচে লাগে বলটি। তৎক্ষণাৎ অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে যান। কোমায় চলে যান এবং আর ফেরেননি। অন্তঃ রক্তক্ষরণে মারা যান তিনি।


আজ হিউজের জন্মদিন, শুভ জন্মদিন ফিলিপ, যেখানেই থাকুন ভালো থাকুন। ৬৩ নট আউট চির জীবন।

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন