বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসঃ (পর্ব-৬) ওয়ারী ক্লাব এবং উনিশ শতকে ঢাকার ফুটবল (১)

বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসঃ (পর্ব-৬) ওয়ারী ক্লাব এবং উনিশ শতকে ঢাকার ফুটবল (১)

ঢাকার ওয়ারী ক্লাবের গোড়ার ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, উনিশ শতকের শুরুর দিকেই ঢাকায় নিয়মিত ফুটবল লীগ অনুষ্ঠিত হতো। কলকাতায় ফুটবল চালু হওয়ার কিছুদিন পরই তা চলে আসে ঢাকায়। দিনে দিনে এ খেলার প্রতি প্রবলভাবে আকৃষ্ট হয়ে পরে এ অঞ্চলের তরুণরা ক্রমেই খেলাটি পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় চালু হয়ে যায়। একের পর এক স্কুল-কলেজগুলোর মাঠ ফুটবলের দখলে চলে যেতে থাকে। গড়ে ওঠে বিভিন্ন দল। ফলে একদিকে যেমন খেলোয়াড় বাড়তে থাকে অপরদিকে বাড়তে থাকে দর্শক শুরু হয় ফ্রেন্ডলি ম্যাচের প্রচলন। এক এলাকার দল আর এক এলাকায় গিয়ে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতো। ঠিক এ সময় ফুটবলের জনপ্রিয়তার কথা বিবেচনা করে একটি নিয়মিত ফুটবল লীগ চালু করতে এগিয়ে আসেন ঢাকার কয়েক জন বিত্তশালী। সেটা উনিশ শতকের গোড়াতেই।


১৯১৫ সাল থেকে ঢাকায় প্রথম বিভাগ ফুটবল লিগ শুরু হয়। ১০-১১টি দল প্রথম বিভাগে খেলত। ঢাকার বাইরেও তখন লিগ ও শিল্ডের খেলা অনুষ্ঠিত হতো। ১৯১৫ সাল থেকে ময়মনসিংহে শুরু হয় সূর্যকান্ত শিল্ড। পূর্ব বাংলার বাইরের দলও সেখানে নিয়মিতভাবে খেলেছে। উনিশ শতকের বিশের দশকে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হতো স্যার রোনাল্ডস শিল্ডের জমজমাট আসর। ১৮৯৮ থেকে ১৯০৩ সালের মধ্যে ঢাকায় গঠিত হয়েছে ওয়ারী, লক্ষ্মীবাজার, ঢাকা ফার্স, ইস্ট অ্যান্ড ক্লাব, রমনা এসি, আরমানিটোলা, হাটখোলা এসি, ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং প্রমুখ ক্লাব। এখন থেকে শত বছরেরও আগে তৎকালীন এই বাংলায় শুধু জেলা শহর নয়, অনেক মহকুমা ও থানা শহরেও ফুটবলের চর্চা ছিল। মোহনবাগান, মোহামেডান, ইস্টবেঙ্গল ও এরিয়ান্স ক্লাব বিভিন্ন সময়ে খেলেছে পূর্ব বাংলায় গত শতাব্দীর বিশ ও ত্রিশ দশকে।

প্রথম উল্লেখযোগ্য সফলতা আসে কুচবিহারে ১৯১০ সালে ওয়ারী ফুটবল দল ব্রিটিশ রাজকীয় প্রাসাদ দলকে পরাজিত করে। এই অভাবিত সাফল্য ক্লাবের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকেই বিশেষ অনুপ্রেরণা যোগায়। তারই ফলশ্রুতিতে ওয়ারী ফুটবল দল কোলকাতা ফুটবল ক্লাব এবং ডালহৌসী এ্যাথলেটিক্স ক্লাবের বিরুদ্ধে সৌজন্য ম্যাচ খেলে। আর সে সব খেলায় জয়ের সুবাদে তারা আইএফএ শীল্ড টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয় এবং ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত সে প্রতিযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে মোটামুটি সাফল্যের স্বাক্ষর রাখে। 

এ সময় ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাব ও ওয়ারী ক্লাব ছিলো ঢাকার প্রধান দুটো দল। সে আমলে এই ক্লাব দুটো শুধু ঢাকাতেই নয়, কলকাতাতেও আলোচনার ঝড় তোলে। ঢাকা এবং কলকাতার মাঠে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন দলের বিরুদ্ধে নৈপুণ্যপূর্ণ ফুটবল প্রদর্শন করে দর্শকদের নজর কাড়ে এ দুটি দল। এদের মাধ্যমেই ছড়িয়ে পড়তে থাকে ঢাকার ফুটবলের সুনাম। সে সময় এই ক্লাব দুটোতে খেলতো একঝাঁক কৃতি ফুটবলার। যাদের নাম ঘুরে বেড়াতো মানুষের মুখে মুখে।

এই উপমমহাদেশের প্রাচীনতম ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম একটি প্রতিষ্ঠানের নাম ওয়ারি ক্লাব। প্রায় শত বছরের ঝঞ্জাবহ ইতিহাসের স্বর্ণাভ পাতায় ওয়ারি ক্লাব এক উজ্জ্বল উপমা। উপমহাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে এর মধ্যে অনেক ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান অপ্রতিরোধ্য হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। তারপর হয়তো কালের আবর্তে সকলের অগোচরে ইতিহাসের মিশকালো আঁধারে বিলীন হয়ে গেছে। কিন্তু ওয়ারি ক্লাব তার চলার গতিতে ছিল দুর্বার। বার বার তার অস্তিত্বের ওপর আঘাত এসেছে, কিন্তু ক্লাব সম্পৃক্ত সকলেই একাত্মা একমন চেতনায় অশান্ত সমুদ্র মন্থন করেছেন। 

আজ থেকে শত বছর পূর্বে ১৮৯৮ সালে সদ্য বিলুপ্ত ওয়েলিংটন ক্লাবের কিছুসংখ্যক ক্রীড়াপাগল সংগঠকের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় দক্ষিণ-পূর্ব ঢাকার ওয়ারী এলাকায় ওয়ারী ক্লাবের গোড়া পত্তন হয়। এই ক্লাব প্রতিষ্ঠার পেছনে সে সময়ে অন্যতম সেরা ক্রীড়াবিদ রায় বাহাদুর সুরেন্দ্রনাথ রায়ের ভূমিকা ছিল অসামান্য। তাকে তাই এই ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়ে থাকে। শুরুতে কিন্তু ওয়ারী ক্লাবকে যথেষ্ট প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। তখন তাদের নিজস্ব কোন মাঠ ছিল না, ছিল না কোন ক্লাব ঘর। অবশ্য খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ক্লাবটি বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ১৯৩০ সালে প্রথমবারের মত পল্টন ময়দানে তারা একটি খেলার মাঠ পায় এবং সেখানেই একটা টিনের দোচালা নির্মাণ করা হয়। এরপর কেবলই সাফল্য আর উত্তরণের পালা। ওয়ারীর খেলোয়াড়রা খেলাধুলার বিভিন্ন শাখায় গভীর নিষ্ঠার সঙ্গে অংশগ্রহণ করে একের পর এক জয়মাল্য ছিনিয়ে আনতে থাকে এবং সেই সঙ্গে এই ক্লাব থেকে জন্ম নেয় তদানীন্তন বহু নামি-দামি খেলোয়াড়।

১৯১৫ সালে শক্তিশালী কাস্টমসের বিরুদ্ধে আইএফএ শিল্ডে পর পর দুদিন ড্র করার পর তৃতীয় দিনপরাজিত হলেও ওয়ারী ক্লাবের ফুটবল নৈপুণ্য কলকাতার মানুষের মুখে মুখে প্রশংসিত হয়। ১৯১৭ সালে এই ওয়ারী ক্লাব সে সময়ের লীগ চ্যাম্পিয়ন ইংরেজ দল লিংকসকে পরাজিত করে চমকে দেয় সকলকে। এর পরের বছরই তারা হারায় কলকাতার অন্যতম শক্তিশালী দল মোহনবাগানকে। সে সময়ে মোহনবাগানকে হারানো খুব সহজ কথা ছিলো না। মোহনবাগানের সঙ্গে এই ক্লাব দুবার লড়েছে ১৯১৯ ও ১৯২৩ সালে। ফলাফল সমানে সমান, একবার জিত একবার হার। প্রথম খেলায় ওয়ারী ২- গোলে জয়লাভ করে। কিন্তু দ্বিতীয়বার সেমিফাইনালে - গোলে পরাজিত হয় এ খেলায় ওয়ারীর অধিনায়ক ছিলেন কানু রায়। ১৯২৫ সালে আইএফএ শিল্ডের প্রথম খেলায় ওয়ারী শক্তিশালী শেরউডের সাথে তুমুল লড়াই করার পর দুর্ভাগ্যজনকভাবে ১- গোলে হেরে যায়। ওয়ারীর এ লড়াইয়ের ভূয়সী প্রশংসা করে সে সময়ের ইংলিশ পত্রিকাগুলোও। কিন্তু উল্লেখযোগ্য হচ্ছে যে, উপমহাদেশ সফরকারী এই শেরউড ফরেস্টার ক্লাবের নেটে একমাত্র ওয়ারীই বল ঢোকাতে সক্ষম হয়েছিল। এরপর ১৯২৯ সালে কলকাতায় সফররত ভুটানের রেঙ্গুন ক্লাবের সাথে খেলাটি ১- গোলে অমিমাংসিত থাকলে পরের দিন গড়ায়, তবে পরের দিন বৃষ্টির কারণে ওয়ারীর কপাল পোড়ে 


আগের পর্বের লিংক এখানে

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন