বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসঃ (পর্ব -৫) ফুটবল রাজনীতি ও মুসলিম সমাজের ফুটবল জাগরণ

বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসঃ (পর্ব -৫) ফুটবল রাজনীতি ও মুসলিম সমাজের ফুটবল জাগরণ

আমরা যতোই বলি না কেনো, খেলাধুলার সাথে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। সত্যি কথা হচ্ছে, ক্রীড়াক্ষেত্রে রাজনীতির একটা প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ প্রভাব সবসময় ছিলো, এখনো আছে। একটা উদাহরণ দেই, বর্তমানে চীন কে দেখুন। নিজেদের কে বিশ্ব ফুটবলে একটা অবস্থানে নেয়ার জন্য কত চেষ্টা করছে তারা। কাড়ি কাড়ি টাকা ঢালছে নিজেদের লীগে, উচ্চ মুল্য দিয়ে প্লেয়ার, কোচদের আনছে। যাতে বিশ্ব ফুটবলে  নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত হয়। চীনের নাম বাঘা বাঘা সব পরাশক্তির সাথে উচ্চারিত হয়। এর কারণ কি শুধুই নিজেদের ফুটবলকে বিশ্ব মানুষের কাছে নিজেদের ফুটবলীয় পরিচিতি জানান দেয়া? যারা চীনের সমাজব্যবস্থার খবর রাখেন, তাদের নিশ্চয় এ ব্যাপারে ধারণা আছে যে শুধু ফুটবলের উন্নয়ন এর জন্য এরা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করছে না। চীন বর্তমানে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক, সামরিক শক্তি। নিজেদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের সাথে নিজেদের শক্তিমত্তা জানান দেয়ার জন্য সবক্ষেত্রের মত খেলাধূলাতেও তারা মনযোগ দিয়েছে যাতে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব জানান দেয়া যায়। 

উনিশ শতকে ফুটবল মূলত সাহেব ও তাদের সেনা ছাউনীর সীমানাবন্দী থেকে কচ্ছপ গতিতে এগিয়েছে। বর্ণবিদ্বেষী ইংরেজরা নিজেদের খেলা বলে ফুটবল থেকে ভারতীয়দের যতোটা পারতো দূরে ঠেলে দিতো। তবে তা সত্ত্বেও এই খেলাটি দিনে দিনে ধরা দেয় ভারতীয়দের কাছে। ক্রমে ক্রমে ফুটবলকে ঘিরে গড়ে ওঠে ছোট-বড় ক্লাব। বৃটিশ শাসনামলে এদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা-খেলাধুলা সবকিছুই ছিলো হিন্দু সম্প্রদায়ের দখলে। আর তাদের এই আধিপত্যের মুখে মুসলিম সম্প্রদায় ছিলো বড়ই অসহায়। উনিশ শতকের শেষ দশকে জন্মলাভ করা কলকাতা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব ফুটবলকে মুসলিম শিবিরে প্রতিষ্ঠিত করতে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। কারো কারো মতে, এ ক্লাবটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরই তৎকালীন বাংলার পূর্বাঞ্চলে ফুটবলের জাগরণ শুরু হয়।

বৃটিশদের কু-শাসনে অতিষ্ঠ হয়ে যখন ভারতীয়দের মধ্যে আন্দোলন দানা বাঁধছিলো, ভারতীয় রাজনীতি যখন ক্রমেই উত্তপ্ত হচ্ছিলো সে সময় নবাবজাদা আজিজুল ইসলাম ফুটবলের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা দেখে এবং মুসলমান সমাজকে ফুটবলের প্রতি আকৃষ্ট করতে ১৮৮৭ সালে প্রতিষ্ঠা করেন জুবিলী ক্লাব। পরে এই ক্লাবটির নাম দু’বার পরিবর্তিত হয়েছে। প্রথমে ক্রিসেন্ট ক্লাব ও পরে হামিদিয়া ক্লাব। এই ক্লাবটি সর্বশেষ ১৮৯১ সালে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব নামধারণ করে নতুন পথে যাত্রা শুরু করে। তবে প্রথম দিকে এ যাত্রা পথ কুসুমাচ্চীর্ন ছিলো না। বরং বলা যায় প্রবল প্রতিকূলতা তাকে গ্রাস করে। বিশেষ মহলের রক্তচক্ষু আর আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে শুধু নামের অস্তিত্ব নিয়েই ক্লাবটিকে চলতে হয় প্রায় তিনটি দশক।

গত শতাব্দীর বিশের দশক থেকেই ভারতবর্ষে কংগ্রেস, খেলাফত আন্দোলন, চট্রগামের অস্ত্রাগার লুটসহ উত্তপ্ত নানা রাজনৈতিক কর্মকান্ডের প্রেক্ষাপটে হিন্দু ও মুসলিম দুই সম্প্রদায় স্বতন্ত্র আবাসভূমির দাবীতে যখন সোচ্চার হয়ে ওঠে সে সময় কলকাতা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব কলকাতা ফুটবল লীগের দ্বিতীয় বিভাগ থেকে চ্যাম্পিয়ন হয়ে প্রথম বিভাগে উন্নীত হয় এবং এখান থেকেই শুরু হয় তাদের লাগাতার বিজয় যাত্রা। ’৩৫ থেকে ’৩৮ টানা পাঁচ বছর এই ক্লাবটি কলকাতা লীগে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করলে মুসলমানদের মধ্যে নবজাগরনের সৃষ্টি হয়। এবং মুসলমানদের এই নবজাগরণ তাদের রাজনৈতিক আন্দোলনকে বেগবান করতে বিশেষ ভুমিকা রাখে। অপরদিকে মোহামেডানের এই অভূতপূর্ব সাফল্যে ঈর্ষান্বিত মৌলবাদী হিন্দু সম্প্রদায় বিচলিত হয়ে পড়ে। তারা সোচ্চার হয়ে ওঠে মোহামেডান তথা মুসলমানদের অগ্রগতি রুখতে। এ লক্ষ্যে তাদের একটা অংশ নানা অপকর্ম এবং অপতৎপরতায় লিপ্ত হয়। তারা ক্লাবটির বিরুদ্ধে ইংরেজদেরও ক্ষেপিয়ে তোলে। এক সময় ইংরেজরা ক্লাবটিকে ‘ইংরেজ বিরোধী ঘাঁটি’ হিসেবে চিহিৃত করে এর খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের ওপর নানা নির্যাতনের মাধ্যমে দমন নীতি প্রয়োগ করে। 
 

বৃটিশদের কবল থেকে নিজেকে রক্ষা করতে এই মোহামেডান ক্লাবে একবার আশ্রয় নিয়েছিলেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। এখানে আত্মগোপন করে থাকার সময় তিনি মোহামেডানকে নিয়ে একটা গানও লিখেছিলেন। একটা মজার ব্যাপার কি জানেন? কাজী নজরুল ইসলামের একটি পরিচয় অনেক এর ই অজানা। উনি নিজেও ফুটবল জগতের একজন ছিলেন।
 

কাজী নজরুল ইসলাম সম্পর্কে স্মৃতিচারণকালে  প্রথম মুসলমানদের বাংলা পত্রিকা সওগাত-এর সম্পাদক নাসিরউদ্দিন বলেছিলেন, ‘নজরুলের বয়স যখন ৭/৮ বছর তখন তার সঙ্গে আমার পরিচয়। নজরুলকে আমি ফুটবল এবং দাবা খেলতে দেখেছি। তবে ও আড্ডা মারতে বেশী পছন্দ করতো। আবার অনেক সময় দেখা যেতো বল নিয়ে সারাদিন মাঠে পার করে দিতো। এ সময় সে খাওয়া-দাওয়ার কথাও ভুলে যেতো।’

আর নিজের ফুটবল খেলা সম্পর্কে এই বরেণ্য ব্যক্তিত্ব বলেছেন, ‘মাঝে মাঝে আমিও ফুটবল খেলতাম, তবে আমাদের সময়টাতে ফুটবল ছিলো অনেকটা দুর্লভ আর যার কারণে আমরা আশেপাশের গ্রামের ছেলেরা মিলে জাম্বুরা দিয়ে ফুটবল খেলতাম।’ এ সময় সওগাত সম্পাদক ফুটবল খেলতে গিয়ে তাঁর একটি মজার ঘটনার বর্ণনা দেন এভাবে-‘ আমরা ক’জন ছেলে জাম্বুরা দিয়ে ফুটবল খেলছিলাম। অনেক চেষ্টা করেও আমি গোল করতে পারছিলাম না। যখন পায়ের কাজে ব্যর্থ হলাম তখন হঠাৎ করেই জাম্বুরাটা হাত দিয়ে তুলে গোলবারের ভেতোরে ছুঁড়ে মারলাম। গোল হলো। কিন্তু কোনো খেলোয়াড়ই আমার সে গোল মেনে নিতে চাইলো না। শেষ পর্যন্ত হৈ চৈ আর তর্কাতর্কির মধ্য দিয়ে সেদিনের খেলা শেষ হলো।’

মুসলিম সমাজের ফুটবল জাগরনে এ ক্লাব টির অবদান ছিল অতুলনীয়। 


আগের পর্বের লিংক

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন