বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাস(পর্ব- ৩): উপমহাদেশে ফুটবল চর্চা্র শুরু

বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাস(পর্ব- ৩): উপমহাদেশে ফুটবল চর্চা্র শুরু

এই উপমহাদেশে ফুটবলের আবির্ভাব সম্পর্কে জানা যায়, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর আমলে গঙ্গার ঘাটে নোঙ্গর করা বিলেতি জাহাজে করেই এসেছিলো ‘ফুটবল’ নামের এই আজব খেলার বীজ। একদিন সকালবেলায় একটি পুরনো কেল্লার মাঠে জাহাজের ফুটবল নিয়ে নামলো বিলেতি নাবিকরা । তারা যখন ফুটবল খেলছিলো তখন কেল্লার সৈনিকদের চোখ তো ছানাবড়া। এ আবার কি খেলা রে বাবা! তারা নাবিকদের খেলা দেখতে লাগলো অবাক চোখে এবং একসময় নিজেরাও যোগ দিলো নাবিকদের সাথে। উপমহাদেশে হলো কালজয়ী ফুটবলের গোড়াপত্তন। এটা হচ্ছে লোকমুখে চালান হয়ে আসা একটা অলিখিত ইতিহাস। আমার মা দেখলেও তখন হয়ত বলত,”এ কেমন খেলা রে বাপু। লাথি মারিস নে বলে দিলু্ম। পরে ঠ্যাঙ ভাঙলে চালে ঝুলিয়ে রেখে দিব বলে দিলুম হ্যা.........”।

কাগজে-কলমে এর কোনো অস্তিত্ব নেই। তবে নথিপত্র  ঘাটলে দেখা যায়, এসপ্লানেড ময়দানে ১৮৫৪ সালের এপ্রিল মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রথম ফুটবল খেলা অনুষ্ঠিত হয়। খেলাটিতে কলকাতার শীর্ষস্থানীয় রাজপুরুষদের সাথে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হন ব্যারাকপুরের ইংরেজ সাহেবরা। এ খেলায় অংশ নেয়া দল দুটির একটির নাম ছিলো ‘ক্যালকাটা অফ সিভিলিয়ানস’ আর অপরটি ‘জ্যান্টলম্যান অফ ব্যারাকপুর’। এই খেলাটির পর পরবর্তী ১৪ বছর আর ফুটবলের কোনো অস্তিত্ব নথিপত্রে মেলে না। এরপর আবার ফুটবলের সাক্ষাৎ মেলে ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পর। সিপাহী বিদ্রোহের জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ড থেকে বেড়িয়ে ইংরেজরা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে আবার খেলাটির দিকে মনোযোগ দেয়। বলা যায়, এখান থেকেই ফুটবল উপমহাদেশে তার যাত্রা শুরু করে।

১৮৬৮ সালে এসপ্লানেড ময়দানে অনুষ্ঠিত হলো এক প্রীতি ম্যাচ। এতে ‘আইসিএস’দের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ইংল্যান্ডের বিখ্যাত বিদ্যালয় ইটনের সাবেক ছাত্রদের নিয়ে গঠিত ‘হটোনিয়াস ক্লাব’। এ খেলায় হটোনিয়াস ৩-০ গোলে জয়লাভ করে। হটোনিয়াস ক্লাবের হয়ে চমৎকার নৈপুণ্য প্রদর্শন করেন খোদ কলকাতার সে সময়ের গভর্ণর রবার্ট ভ্যানসিটার্ট। তিনি একাই ২টি গোল করেন । অপর গোলটি করেন ডব্লু এইচ ট্রান্ট।

দু’বছর বন্ধ থাকার পর ১৮৭০ সালে আবার ফুটবল শুরু হলো এসপ্লানেট মাঠে। এ সময় লড়াই হতো পাবলিক স্কুল হ্যারো, ইটন, উইনচেস্টারের ছাত্রদের সাথে প্রাইভেট স্কুল মিসটিনার ছাত্রদের। এদের খেলা দেখার পর খেলাটি খেলতে বেনিয়া সাহেবদেরও সাধ জাগে। তারা দল গঠন করে খেলতে নামে এবং প্রথম খেলাতেই হেরে যায় আইসিএস-এর কাছে।

বলাবাহুল্য, ব্রিটিশ সম্রাজ্যের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র ছিলো বলে সে সময় কলকাতার বন্দরে ভিড়তো বড় বড় জাহাজ, আর এসব জাহাজের নাবিকদের সাথে কেল্লার সেনাদের ফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হতো।

১৮৭২ সালে গঠিত হয় এক ফুটবল ক্লাব। যে ক্লাবের খেলোয়াড়রা ফুটবল খেলতো অনেকটা রাগবির মতো করে। জানা যায়, শুধু ফুটবল খেলার জন্য ট্রেডস ক্লাব নামে একটি ক্লাব গড়ে ওঠে ১৮৭৮ সালে। উদ্যোগটা ছিলো ইউরোপীয় ব্যবসায়ীদের। সে সময় ডালহৌসী ইনস্টিটিউট ছিলো ক্যালকাটা ট্রেডস এসোশিয়েশনের প্রধান কর্মস্থল। আর যার কারণে পরে ট্রেডস ক্লাবটি ডালহৌসী ক্লাবে রূপান্তরিত হয়। ইতিমধ্যে ফুটবল তার কালজয়ী আলোকমালার সূচনা করে ছড়িয়ে পড়তে থাকে সরকারী ও মিশনারী স্কুলগুলোতে। এ সময় শিক্ষিত বাঙালীরা ফুটবলের প্রতি আকৃষ্ট হতে থাকেন। ১৮৭৯ সালে মি. বি ভি গুপ্ত নামের এক ভদ্রলোক গড়ে তোলেন প্রেসিডেন্সি কলেজ ক্লাব। শুরুতে ক্রিকেটের প্রতি এই ক্লাবের ঝোঁক থাকলেও পরবর্তীতে এরা ফুটবলও খেলতে শুরু করে।

বাঙালির ফুটবল উন্মাদনার ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, এর সূচনাটা ১৩৬ বছর আগে, পরাধীন ভারতে। শুরুটা করেছিলেন নগেন্দ্র প্রসাদ সর্বাধিকারী নামের এক বাঙালি ছাত্র, সেই ১৮৭৮ সালে। নগেন্দ্র তখন কলকাতা হেয়ার স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। ক্লাসের বন্ধুদের কাছ থেকে ত্রিশ টাকা চাঁদা তুলে ইংরেজদের দোকান থেকে বল কিনে যেভাবে খেলা শুরু, তাতে ফুটবলের ছিরিছাঁদ কিছুই ছিল না।

ফুটবল ইতিহাসের গবেষক শ্রীরাখাল ভট্টাচার্য নগেন্দ্র প্রসাদদের সেই খেলার একখানি চিত্র তুলে ধরেছেন এভাবে: ‘সেদিন মাঠে নামল সবাই বল নিয়ে। গোলপোস্ট-ফোস্টের বালাই নেই, এলোপাতাড়ি মার, কখনো পায়ে, কখনো হাতে বল ধরে পায়ের লাথি, আইন বা পদ্ধতির কোনো তোয়াক্কা না করেই।’

খেলার এই অদ্ভুত দৃশ্যের তামাসাগিরিও কম হলো না। মাঠের উত্তর দিক থেকে এল প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্ররা আর পূর্ব দিক থেকে হিন্দু স্কুলের ছেলেরা। পথ-চলা কিছু লোকও দাঁড়িয়ে গেল এই কিম্ভূতকিমাকার খেলা দেখতে।

কত দিন এভাবে চলেছিল, ঠিক জানা যায় না। হয়তো কয়েক দিন মাত্র। প্রেসিডেন্সির ছাত্ররাই এল তাদের অধ্যাপক বি.ভি স্ট্যাককে নিয়ে। খেলা দেখে তো তিনি হেসেই মরেন। ভাবেন, এ কোন ফুটবল? খেলোয়াড়দের বললেন, "তোমরা যা নিয়ে খেলছ, সেটি রাগবি বল। আর যা খেলছ, তা না রাগবি, না ফুটবল। আমি কাল একটা ফুটবল নিয়ে আসব আর আইনকানুনও তোমাদের শিখিয়ে দেব।" পরদিন কথামতো এলেন সেই সাহেব একখানা চমৎকার বল নিয়ে। ছাত্রদের দুই ভাগে ভাগ করে খেলার আইনকানুন বলে দিলেন। তারপর মুখে বাঁশি নিয়ে নেমে গেলেন রেফারির ভূমিকায়। এভাবেই শুরু বাংলার ফুটবলের ইতিহাস। এর উদ্ভাবক নগেন্দ্র প্রসাদ আর আঁতুড়ঘরে ধাত্রী স্ট্যাক সাহেব। সেই থেকে শুরু বাংলার ফুটবল।

১৮৭৮ থেকে ১৮৯৪—এই ষোলো বছরে বাংলার ফুটবল কৈশোর-উত্তীর্ণ এক টগবগে তরুণে পরিণত হলো। নগেন্দ্র প্রসাদ ১৮৮৪ সালে কলকাতায় ওয়েলিংটন ক্লাব প্রতিষ্ঠা করলেন। এক বছর পরে এর পরিবর্তিত নাম হলো টাউন ক্লাব। ১৮৮৫ সালেই কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হলো শোভাবাজার ক্লাব। এর স্রষ্টাও ওই নগেন্দ্র প্রসাদ। বছর তিনেকের মধ্যে বেহুদা লাথালাথিটাকে একটা ছন্দের মধ্যে এনে ১৮৮৯-এ শোভাবাজার ক্লাব ব্রিটিশ ভারতীয় উন্মুক্ত ফুটবল প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। কিন্তু শোভাবাজারের তিন বছর চেষ্টাও যথেষ্ট পোক্ত না হওয়ায় প্রথম খেলাতেই তিন গোলে হেরে বিদায়। নগেন্দ্র প্রসাদ তবু হাল ছাড়েননি। ১৮৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হলো আইএফএ বা তৎকালীন ভারতবর্ষের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। সেখানেও আছেন নগেন্দ্র প্রসাদ। ১৮৯৫ থেকেই যাত্রা শুরু হলো কেতা মাফিক উপমহাদেশের ফুটবলের। আর বাঙালিরাই এই আধুনিক ফুটবলের পথিকৃৎ।


তথ্যসূত্র ও কৃতজ্ঞ্তা প্রকাশঃ উইকিপিডিয়া, প্রথম আলো, বিশেষ কৃতজ্ঞতা “আসুন পুরাতন ঢাকার কথা বলি” 


গত পর্বের লিংক

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন