বার্সেলোনাকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন যিনি

বার্সেলোনাকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন যিনি

১. জানুয়ারী, ১৯৩৬। এফসি বার্সেলোনার প্রশাসনিক ভবন। প্রেসিডেন্টের রুমের সামনে দাঁড়িয়ে মনে মনে সাহস সঞ্চয় করে নিলেন রোসেণ্ড কালভেট। দরজায় টোকা দিয়ে ঢুকে পড়লেন। ধোঁয়া ভরা কক্ষে উৎকট সিগারেটের গন্ধ। দম বন্ধ হয়ে আসার মতো অবস্থা। এর মধ্যেই নির্লিপ্তভাবে উল্টো দিকে ঘুরে প্রেসিডেন্টের চেয়ারে ছোটখাটো যেই লোকটা বসে আছেন,তাকে দেখলেই নার্ভাস বোধ করেন কালভেট। যাদের হাবেভাবে উচ্চ ব্যক্তিত্বের আভা ঠিকরে বের হয় ,তাদের সামনে, পেছনে যেকোনদিকে দাঁড়িয়ে থাকাটাই অস্বস্তিকর। গলা পরিস্কার করে নিলেন কালভেট। " মি. সুনিওল !" ঘুরে সামনে তাকালেন বার্সা প্রেসিডেন্ট জোসেপ সুনিওল। রোসেন্ড কালভেটের দিকে তাকিয়ে তিক্ত হাসি খেলে গেলো সুনিওলের মুখে। অসময়ে কালভেট কখনো ভালো খবর নিয়ে আসেনা। "বলো রোসেণ্ড, খারাপ খবরটা কি? " অস্বস্তির সাথে গাল চুলকালেন কালভেট। "ব্যাংক থেকে নোটিশ পাঠালো একটু আগে। আমাদের ব্যাংক ঋণের যা অবস্থা,দেউলিয়া ঘোষিত হতে খুব বেশি দেরী নেই... " শান্তভাবে দুঃসংবাদটা প্রথমে হজম করলেন সুনিওল। "আমার সময়ে যদি বার্সা ধ্বংস হয়,তবে তো আমি ইতিহাসের চোখে খলনায়ক হয়ে থাকবো! মরেও শান্তি পাবোনা! " হাহাকার ঝরে পড়লো জোসেপ সুনিওলের কণ্ঠে।

২. আগস্ট,১৯৩৬। গুয়াদেরামা,স্পেন। পরপর কয়েকটি গুলির আওয়াজে কেঁপে উঠলো আশেপাশের এলাকা। ফ্রাঙ্কোইস্ট ট্রুপসের একজন সৈনিকের উচ্চকণ্ঠ শোনা গেলো, "জোসেপ সুনিওল ইজ ডেড ! " আরো একজন উল্লসিত গলায় চেঁচিয়ে উঠলো, "কাতালান কুকুরটা শেষ!! " মৃত্যুর আগে মানুষের মনের ভাব নাকি লাশের চেহারার অভিব্যক্তিতে বোঝা যায়। ভালোবাসার কাতালুনিয়া আর প্রাণের ক্লাব এফসি বার্সেলোনার অন্ধকার ভবিষ্যতের কথা ভেবেই কি মৃত সুনিওলের চোখে গভীর বিষাদের ছায়া খেলা করছিলো?

৩. অক্টোবর, ১৯৩৬। ডাবলিন,আয়ারল্যাণ্ড। চিনি ছাড়া কফির কাপে চুমুক দিয়েই মুখ কু্ঁচকে ফেললেন মাঝবয়সী লোকটা। মনে মনে ডাক্তারকে আর দুনিয়ার সব অসুখ বিসুখকে গালিগালাজ করে টেবিলে রাখা চিঠিটা তুলে নিলেন ভদ্রলোক। প্রেরকের জায়গায় "এফসি বার্সেলোনা" দেখে অবাক হলেননা খুব একটা। চিঠি আসবে তিনি জানতেন। এখন চিঠিতে কি লেখা সেটাই হলো জানার বিষয়। চিঠির সারমর্ম হলো, ফুটবল ক্লাব বার্সেলোনার বর্তমান আর্থিক দৈন্যদশার মধ্যে তারা কোচের বেতন পরিশোধ করতে সমর্থ নয়। তাই তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বার্সেলোনা। চিঠিটা শেষ করে চিন্তামগ্ন হয়ে পড়লেন বার্সেলোনার আইরিশ কোচ প্যাট্রিক ও'কোনেল। খুব বেশিদিন হয়নি বার্সায় এসেছেন। কিন্তু এরই মধ্যেই ক্লাবের জন্য কেমন মায়া পড়ে গেছে। তবে স্পেনের অস্থিতিশীল রাজনৈতিক অবস্থা আর এফসি বার্সেলোনার এই মহা সংকটের মুহূর্তে পেশাদারী অনিশ্চয়তার মধ্যে বার্সেলোনায় ফিরে যাওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত? ভাবতে খুব বেশি সময় নিলেননা ও'কোনেল। সিদ্ধান্ত নিলেন বিপদের সময় ক্লাবকে, ক্লাবের ফ্যানদেরকে এভাবে ফেলে রেখে যাবেননা তিনি। প্রয়োজনে কম বেতনে বা, বিনা বেতনে হলেও তিনি কাজ করবেন। এফসি বার্সেলোনা তখন তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে। গৃহযুদ্ধ, সামরিক শাসকের বিমাতাসূলভ আচরণ, আর্থিক দূরবস্থা, ঋণের বোঝা, প্লেয়ারদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে নানাধরণের হুমকি ধামকি, আর মড়ার উপর খাড়ার ঘা এর মতো জোসেপ সুনিওলের মৃত্যু। ক্লাব তখন অভিভাবকশূণ্য এক নৈরাজ্যকর অবস্থায়। সবাই জানেন, এফসি বার্সেলোনা শেষ। আর কোন আশা নেই। কোন আশাই নেই। ঠিক এমন একটা সময়েই অব্যাহতিপত্র উপেক্ষা করে বার্সেলোনার মাটিতে পা রাখলেন প্যাট্রিক ও'কোনেল।

৪. ও'কোনেল ফিরে আসায় খেলোয়াড়েরা যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেলেন। ক্লাব কর্মকর্তারাও যেন ভরসা পেলেন। এর মূল কারণ ছিলো ও'কোনেলের ক্যারিশম্যাটিক উপস্থিতি, ব্যক্তিত্ব আর সহজাত নেতৃত্বগুণ। ও'কোনেল এসেই খেলোয়াড়দের নিয়ে কাজ শুরু করলেন। আর্থিক দৈন্যদশার মধ্যে বার্সা তখন তাদের তারকা প্লেয়ারদের প্রায় সবাইকেই ছেড়ে দিয়েছে। পুরনো কিছু প্লেয়ার, সাথে স্থানীয় প্রতিভাবান অপেশাদার প্লেয়ারদের নিয়েই বার্সা নতুনভাবে শুরু করলো প্রস্তুতি। কিন্তু ঐ যে আর্থিক দূর্দশা! ঋণের বোঝা ঘাড়ে চেপে বসেছে আরো আটোসাঁটোভাবে। খেলোয়াড়দের ট্রেনিং শুরু হলেও তাই অনিশ্চয়তার ছিঁটেফোটাও কিন্তু কমেনি। সবই চলছিলো,জোসেপ সুনিওলের মৃত্যুর ধাক্কাও কাটিয়ে উঠছিলো বার্সা, কিন্তু অর্থাভাবেই ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো এফসি বার্সেলোনা। প্রচুর টাকা দরকার। আসবে কোথা থেকে? গৃহযুদ্ধের মধ্যে কোন খেলা নেই, রাষ্ট্রীয়ভাবে যথাসাধ্য অসহযোগিতা চলছে, বিনিয়োগ করার কেউ নেই। এত অর্থ কোথায় পাবে বার্সেলোনা? সেসময় আবারো ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন ও'কোনেল। একজন খেলোয়াড়ের মাধ্যমে মেক্সিকান ব্যবসায়ী ম্যানুয়েল ম্যাস সোরিয়ানোর সাথে পরিচয় হয় তার। কথা বলে তিনি তাকে বার্সেলোনার ব্যাপারে আগ্রহী করে তুলেন। বোর্ড কর্তাদের সাথে সোরিয়ানোর কয়েক দফা মিটিং হয়। সোরিয়ানো বার্সেলোনাকে মেক্সিকো সফরের প্রস্তাব দেন। বার্সেলোনা সানন্দে সেই প্রস্তাব গ্রহণ করে। বার্সেলোনার মেক্সিকো সফরের প্রচারণা শুরু হবার পর আমেরিকান ক্লাব ব্রুকলিন হিসপানোও বার্সেলোনাকে মেক্সিকো সফর শেষে আমেরিকা সফরের প্রস্তাব দেয়। বলাই বাহুল্য, এই প্রস্তাবও লুফে নেয় বার্সা বোর্ড। ১৯৩৭ সালের জুনের মাঝামাঝি সময়ে মেক্সিকোর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে বার্সেলোনা। প্যাট্রিক ও'কোনেলের নেতৃত্বে শুরু হয় এক ঐতিহাসিক সফর। বার্সেলোনা রক্ষা সফর।

৫. মেক্সিকো সফরে ও'কোনেলের তরুণ অনভিজ্ঞ বার্সা দল এত চমৎকার খেলে, যে মেক্সিকোর আরো কিছু ক্লাব বার্সাকে খেলার আমন্ত্রণ জানায়। তবে মেক্সিকো সফরের মাঝামাঝিতেই একটা বড় সমস্যা দেখা দেয়। স্পেনে এতদিন নানা প্রতিকূল অবস্থার মুখোমুখি হবার কারণে এবং জীবনের নিরাপত্তাজনিত কারনে খেলোয়াড়দের অনেকে মেক্সিকোতেই থেকে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে। দলের মধ্যে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। বুদ্ধিমান ও দূরদর্শী ও'কোনেল বুঝতে পারেন যে সব খেলোয়াড়কে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখা সম্ভব হবেনা। তবে মেক্সিকো আর আমেরিকা সফর যদি শেষ করা যায়,তাহলে যেই টাকা পাওয়া যাবে, তা দিয়ে এফসি বার্সেলোনাকে আবার নতুনভাবে গড়ে তোলা যাবে। যা বলছিলাম। মেক্সিকো সফর শেষ হবার আগেই বার্সার অনেক খেলোয়াড় মেক্সিকান স্থানীয় ক্লাবগুলোর সাথে চুক্তি করে ফেলে এবং বার্সা ছেড়ে দিয়ে চলে যেতে চায়। কিন্তু ও'কোনেল তার অসাধারণ পারসোনালিটি, নেতৃত্ব আর ম্যান ম্যানেজমেন্ট ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে খেলোয়াড়দেরকে একত্রিত রাখেন। এমনই এক প্রভাবশালী চরিত্র। দুই সপ্তাহের মেক্সিকো সফর শেষ হয় দুই মাসে। কারণ যতগুলো ম্যাচ খেলার কথা ছিলো, ও'কোনেলের টিমের দূর্দান্ত খেলায় মুগ্ধ হয়ে আরো বেশ কিছু মেক্সিকান টিম বার্সেলোনার সাথে খেলার আয়োজন করে। অর্থপ্রাপ্তির সম্ভাবনার কারণে সেসব ম্যাচ খেলতে বার্সেলোনা না করেনি একবারও। ১০ টি ম্যাচ খেলে মেক্সিকো সফর শেষ হয়, যার মধ্যে মেক্সিকান জাতীয় দলের সাথেও দুটি ম্যাচ ছিলো। মেক্সিকো সফর শেষে সেপ্টেম্বর মাসের ১ তারিখ আমেরিকান বর্ডার পার হয় বার্সেলোনা। আমেরিকা সফরেও মেক্সিকো সফরের টিমটাই ছিলো। তবে একজন বাদে। মার্টি ভেনটুইরা। সে মেক্সিকোতেই থেকে যায়। আমেরিকা সফর শুরু হয় ৬ সেপ্টেম্বর, শেষ হয় ২০ সেপ্টেম্বর। এই ১৫ দিনে ৫ টি ম্যাচ খেলে বার্সেলোনা। এই দুই ট্যুরে আয়ের সঠিক পরিমাণ জানা যায়নি। তবে লম্বা সফরে আয়ের অঙ্কটা যে মোটা ছিলো, তাতে সন্দেহ নেই। প্রায় তিনমাসের মেক্সিকো-আমেরিকা ট্যুরে খেলোয়াড়দের ধরে রাখাটাই ছিলো বিশাল চ্যালেঞ্জ। সেই গুরুদায়িত্বটা পালন করেন প্যাট্রিক ও'কোনেল। টিমকে একত্রিত রাখেন। সফলভাবে ট্যুর শেষ হয়। তবে সব প্লেয়ার নিয়ে বার্সেলোনায় ফিরতে পারেননি তিনি। ১৪ জনের দলের মাত্র ৪ জন তার সাথে বার্সেলোনায় ফিরে আসে। জোসেপ আরগেমি, হুয়ান ব্যাবোট, জোসেপ পেইজেস এবং রামোন জাবালো। তারা জন্মভূমি এবং ক্লাবের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে ও'কোনেলের সাথে ফিরে আসে বার্সেলোনায়। বাকি ১০ জনের ৭ জন মেক্সিকোতে, ১ জন আমেরিকায় থেকে যায় এবং ২ জন ফ্রান্সে চলে যায়। ১০ জন প্লেয়ার হারিয়েও হাসিমুখে ফিরে এলেন ও'কোনেল ও তার দল। যেই টাকা আয় হয় সেই সফরে, তা দিয়ে সব ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করা হয়। বাকি টাকা ক্লাবের উন্নয়নে ব্যয় হয়। অনিবার্য ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায় বার্সেলোনা। আজকের বিশ্বের অন্যতম সেরা ক্লাব বার্সেলোনা বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারতো আরো ৮০ বছর আগেই। আইরিশম্যান প্যাট্রিক ও'কোনেলের হাত ধরেই মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসে এফসি বার্সেলোনা।

৬. খেলোয়াড়ি জীবনে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের অধিনায়ক ছিলেন। ছিলেন আয়ারল্যাণ্ড জাতীয়দলের ক্যাপ্টেনও। কোচ হিসাবে রেসিং সান্তান্দেরকে স্পেনে পরাশক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেন। রিয়াল বেটিসকে এনে দেন সবেধন নীলমণি, তাদের ইতিহাসের একমাত্র লীগ শিরোপা,তাও আবার শাসক গোষ্ঠীর সমর্থনপুষ্ট রিয়াল মাদ্রিদের নাকের ডগা দিয়ে। এরপর কোচ হিসাবে বার্সেলোনায় এসে গড়েন অমর সেই কীর্তি। শেষ জীবনটা ভালো কাটেনি তার। স্ত্রীর সাথে ছাড়াছাড়ি হবার পর কোচিং পেশা ছেড়ে দিয়ে লণ্ডনে একাকী নীরবে নিভৃতে থাকতে শুরু করেন। সেখানেই তার মৃত্যু হয়। রেসিং সান্তাদের আর বেটিস সমর্থকদের কাছে প্যাট্রিক ও'কোনেল এর নাম আজও পূজনীয়। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপারটা হলো, তার সবচেয়ে বড় কীর্তি যেটি, অর্থাৎ বার্সেলোনাকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা, সেই কীর্তিটাই কালের আবর্তনে ফিকে হয়ে গেছে। এফসি বার্সেলোনা তখনকার দুরবস্থা কাটিয়ে হয়ে উঠেছে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ক্লাবগুলোর একটি। হয়ে উঠেছে বৈশ্বিক পরাশক্তি। এত সাফল্য..এত এত সাফল্যের আড়ালে প্যাট্রিক ও'কোনেলের অবদানও ঢাকা পড়ে গেছে। আজ বার্সা ফ্যানদের যদি প্রশ্ন করা হয়,বার্সার ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি কে? কেউ বলেন ক্রুইফ, কেউবা বলেন মেসি, কেউ হয়তো পেপ গার্দিওলা, এমনকি জাভি, ইনিয়েস্তার নামও বলে থাকেন। নিজের নামটা উপেক্ষিত হতে দেখে ও'কোনেল নিশ্চয়ই ওপার থেকে মুচকি হাসেন। আচ্ছা, সেই হাসিতে কি অভিমান মিশে থাকে? নাকি ব্যঙ্গ?

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন