লিজেন্ডস প্রথম পর্ব

লিজেন্ডস প্রথম পর্ব

আপনাকে যদি বলা হয় একজন গ্রেট বক্সারের নাম বলুন তাহলে কার নাম বলবেন?
- গ্রেট মোহাম্মদ আলী

যদি বলতে বলা হয় একজন গ্রেট বাস্কেটবল প্লেয়ারের নাম, তাহলে?
- মাইকেল জর্ডান

যদি বলা হয় একজন গ্রেট ক্রিকেটারের কথা?
- ডন ব্র্যাডম্যান

যদি বলা হয় ফুটবল গ্রেটের কথা?
- পেলে, ম্যারাডোনা

এই লোকগুলার খেলা আপনি নিজ চোখে দেখেননি, সবগুলা খেলা আপনি ফলোও করেননা, এমনকি নিয়ম ও জানেন না ঠিকমত! কিন্তু তারপরেও জানেন এদের নাম, শ্রদ্ধার সাথেই নেন এদের নাম। কারা উনারা? যাদের নাম এতো বছর পরেও আপনি শ্রদ্ধার সাথে স্বরন করেন!!!

- দে আর কলড লিজেন্ডস!!! 
.
- দ্যান হোয়াট ইজ লিজেন্ড? হু ক্যান বি কলড এ্যাজ লিজেন্ড?!?

"লিজেন্ড" - মানে কিংবদন্তী, কালজয়ী মহানায়ক, দ্যা গ্রেটেষ্ট। সোজা বাংলায় যুগের পর যুগ যাদের কীর্তি যাদের, নাম অমর হয়ে থাকে তাদেরকেই কিংবদন্তি, লিজেন্ড বলা হয়ে থাকে। উপরে যাদের নাম নিলাম তারা সবাই নিজ নামে নিজ রাজত্বের কিংবদন্তী! তাদের খেলাটা যতদিন বেচে থাকবে, তারাও ততদিন স্বমহিমায় অমর হয়ে থাকবেন।

তা এই লিজেন্ড এর মানে কি তা নিয়ে এতো কথার দরকারটা কি?!? আমরা তো জানিই কারা লিজেন্ড!!! 
- সমস্যাটা এখানেই যখন আমরা বর্তমানের অনেককেই আবেগের বশে লিজেন্ড বলে ফেলি, কিংবা কাউকে ছোট করতে ক্লাব লিজেন্ড বলি, আর কাউকে কাউকে গোনাতেই ধরি না!!! . তাহলে আসলে লিজেন্ড কারা?

বর্তমান দেখে আবেগের বশে অনেককেই লিজেন্ড মনে হতে পারে। তবে লিজেন্ড সেই হবে যে পেলে, ম্যারাডোনা, মোহাম্মদ আলী, মাইকেল জর্ডানদের মতন কালজয়ী হবেন। অর্থাৎ যাদেরকে তার নিজের যুগের না, সব যুগের মানুষই মনে রাখবে। 
তা এই ফুটবলের লিজেন্ড হওয়ার জন্য কি সবচেয়ে বেশি জরুরি?!? যা করলে যুগের পর যুগ মানুষ মনে রাখবে???
সহজ উত্তর - বিশ্বকাপ জিতা!!! পেলে, ম্যারাডোনা, বোকেনবাওয়ার, জিদান, লিমাদের মতো বিশ্বকাপ জয়ীরাই তো ফুটবলের বড় লিজেন্ড! ফুটবলের খোজ খবর না রাখলেও উনারা মানুষের মনে যুগ যুগ থাকবেন।

ব্যাক্তিগত উদাহরন দেই . . . আমার বাবা খেলাধুলার খবর কমই রাখেন, ক্রিকেট খেলাটাই দেখেন যখন বাংলাদেশের খেলা থাকে। অনেক কিসু না বুঝলে আমার কাছ থেকে বুঝে নেন। কেবল বিশ্বকাপ এলেই ফুটবলটা দেখেন, তাও কালেভদ্রে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা কিংবা বড় কোন ম্যাচ। গত ২-৩ টা বড় আসরে বেশ কয়েকবারেই আমাকে একটা প্রশ্ন করসেন,”এই রোনালদোটা (ক্রিশ্চিয়ানো) কে?!? আগে না ব্রাজিলে একটা রোনালদো ছিল ন্যাড়া মাথার! ওই রোনালদো কই এখন?!?” - আমি উত্তর দেই এই রোনালদোও ওই রোনালদোর মতোন ভালো খেলে, আর ওই রোনালদো এখন খেলে না অবসরে গেসে!
আমার বাবা তাও কিসু খবর রাখেন, বড় চাচা তাও না। অনেক ধার্মিক মানুষ, খেলাধুলার জগত থেকে বহুত দুরের মানুষ। এই উনি ২০১০ বিশ্বকাপ চলার সময় আমাকে প্রশ্ন করেন,”ম্যারাডোনা কি এখনো খেলে?!?” - ১৬ বছর আগে যাকে শেষবারের মতোন বিশ্বকাপ খেলতে দেখা গেসে, সে এখনো খেলে কিনা সেই প্রশ্ন শুনে প্রথমে হাসি পাইসিল। তাও ভাগ্য ভালো যে উত্তর দিতে পারসিলাম ম্যারাডোনা এখন আর্জেন্টিনার কোচ!!!

অবশ্য এখানে হাসার কিসু নাই, আমার চাচা যেহেতু কোন খেলাধুলার ধারে কাছেও নাই তাই উনার জানার কথা না একজন প্লেয়ার কতোবছর খেলেন। কিন্তু তাও তিনি ম্যারাডোনার নাম জানেন! এইখানেই ম্যারাডোনার গ্রেটনেস যে আমার চাচার মতো ফুটবল থেকে অনেক দুরের মানুষরাও ম্যারাডোনার নাম শ্রদ্ধার সাথেই স্মরণ করেন! 
এই যে ম্যারাডোনাকে মনে রাখা, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর নাম শুনলে রোনালদো লিমার কথা ভাবা - এইগুলা কোথা থেকে আসে? - কারন এই ম্যারাডোনা, লিমারা ফুটবলের গ্রেটেস্ট স্টেজ অফ অল “বিশ্বকাপ” মাতানো তারকা, বিশ্বকাপ জয়ী তারকা!!! ক্রিশ্চিয়ানো আর লিমার মধ্যে পার্থক্য আকাশ পাতাল না, ক্রিশ্চিয়ানো ক্লাব লেভেল এবং ইউরোপের হিসেবে অল টাইম গ্রেটদের একজন এবং সর্বশেষ ইউরো জিতা নায়ক ও! তারপরেও যারা ফুটবলের খোজ রাখেন না, বিশ্বকাপের সময় টুকিটাকি ম্যাচ দেখেন - তাদের কাছে রোনালদো নাম শুনলে ন্যাড়া মাথার ওই লোকটার কথাই মাথায় প্রথমে আসবে! (অবশ্য ইউরো জিতার পর এবং তারপরে বিশ্বকাপটাও যদি জিতেন তাহলে হয়তোবা ক্রিশ্চিয়ানোর নাম বেশি আসবে সবার মুখে!)।

বিশ্বকাপ হলো ফুটবলের গ্রেটেস্ট স্টেজ - আর কোন কিছুর খবর না রাখুক এই ফুটবল বিশ্বকাপ এলে বিশ্বের সবাই কম বেশি খবর রাখে। এই বিশ্বকাপ যারা মাতান স্বাভাবিক ভাবেই তারা সাধারন দর্শকদের মনে জায়গা করে নেন বেশি। এর জন্যই পেলে, ম্যারাডোনা, রোমারিও, লিমা এমনকি চুলের স্টাইলের জন্য ভালদেরামা, খেলার থেকেও ঢুশের জন্য জিদান সাধারনের মনে বেশি স্থায়ী হন!

কথা হলো বিশ্বকাপ তো ক্রুইফ, পুস্কাসের মতো লিজেন্ডরা জিতেন নাই! স্টেফানো, বেস্টরা তো খেলেনই নাই! হালের মেসিও ফাইনালে উঠে জিততে পারেন নাই, পরের টা জিতবেন কিনা তারও নিশ্চয়তা নাই! তাহলে ক্রুইফ-পুস্কাস-স্টেফানো-বেস্ট-মেসিরা কি লিজেন্ড না?!? তাদের কে কি মানুষ মনে রাখবে না, কিংবা বিশ্বকাপ জয়ীদের থেকে কম মূল্যায়ন করবে??

হ্যা, তাদের অবশ্যই মনে রাখবে! বিশ্বকাপের সময়েই শুধু যারা খেলার খবর নেন তারা বাদে সবাই মনে রাখবেন। ক্রুইফকে কেউ ভুলে নাই, স্টেফানো ভুলে নাই, বেস্টকে ভুলে নাই, পুস্কাসকে ভুলে নাই, মেসিকেও ভুলবে না! কিন্তু আরো অনেক নাম আসে, যাদের হয়তোবা ক্রুইফ-স্টেফানো দের মতোন মনে রাখা না হলেও মনে রাখা হবে। মনে রাখার সংখ্যায় কম-বেশি হবে, কিন্তু মনে রাখবে! বিশ্বকাপ না জিতেও, বিশ্বকাপ না খেলেও অনেকে কিংবদন্তী থেকে যাবেন - সবার কাছে না হোক, নির্দিষ্ট ফ্যানবেজের কাছেতো অবশ্যই!

ব্যাক্তিগত পর্যবেক্ষণ দেখসি থেকে এই ৫ ক্যাটেগরিতে যারা থাকে তাদেরকেই মানুষ বেশি মনে রাখেঃ ১. ওয়ার্ল্ডকাপ স্টার, ২. রেকর্ড অওনার, ৩. টিম লিজেন্ড, ৪. পজিশনাল লিজেন্ড এবং ৫. অল টাইম লিজেন্ড।

১. ওয়ার্ল্ডকাপ স্টারঃ আগেই বলসি, বিশ্বকাপ মাতানোদের ফুটবলের খোজখবর না রাখারাও মনে রাখে। বিশ্বকাপ জিতলে ভালো করে মনে রাখে, না জিতলেও পারফর্মেন্সের জন্য মনে রাখে। যেমন জার্মানির ক্লোসা - জার্মানির অল টাইম বেস্ট স্ট্রাইকার নন, নিজ সময়ে লিমা-রাউল-নিস্তলরুলয়-ইব্রাহিমোভিচ-ভিয়াদের ও পিছনে থাকবেন, ক্লাবেও আহামরি রেকর্ড নাই - কিন্তু ৪ বিশ্বকাপে করা ওই ১৬ গোলই তাকে ওয়ার্ল্ডকাপ লিজেন্ডের কাতারে নিয়ে গেছে। অদ্ভুদ কিংবা সুন্দর সেলেব্রেশন তো অনেকেই করে, কয়টাই বা কে মনে রাখে! কিন্তু রজার মিলারের সেই নাচ, বেবেতোর “বেবি রকিং” সেলিব্রেশন তো তাদের কীর্তির থেকেও বেশি জনপ্রিয় এই বিশ্বকাপের মহিমায়!!! আবার বিশ্বকাপ জিতলেই যে সবাই মনে রাখবে তা কিন্তু না - বিশ্বকাপ জয়ী টিমের বেস্ট এলিভেনের অনেক প্লেয়ারকেও আমরা ভুলে যাই দলের এক্সট্রা অরডিনারি কিছু না থাকার জন্যে। ব্যাজ্জিওকেই দেখেন - ৯৪ এর ব্রাজিলের সবার কথা মনে না থাকলেও, ৯৪ বিশ্বকাপের সেই পারফর্মেন্স এবং তার থেকেও বেশি ফাইনালের সেই পেনাল্টি মিসের জন্য এই ট্র্যাজিক হিরোকে কি কখনো ভুলা যাবে?!?

২. রেকর্ড অওনারঃ এভাবে বলা যায় - “ম্যান ডাইস, রেকর্ড লিভস!” আবার এটাও ঠিক - “রেকর্ডস আর মেইড টু বি ব্রোকেন!” রেকর্ড সব সময় ভাঙ্গাগড়ার মধ্যে দিয়েই যায়, আবার কিছু কিছু রেকর্ড খুব কমই ভাঙ্গে! রেকর্ড যতদিন টিকে থাকে রেকর্ডের মালিক ও সবার মাঝে ততদিন থেকে যান। যেই রেকর্ডের মহত্ব যতো বেশি, সেই রেকর্ড অওনারের মহত্বও ততো বেশি। রেকর্ড হতে পারে সবচেয়ে বেশী শিরোপার, সবচেয়ে বেশি বর্ষসেরার, সবচেয়ে বেশি ফিফা এলিভেন কিংবা বেস্ট এলিভেনে স্থান পাওয়ার, সবচেয়ে বেশি গোলের, সবচেয়ে বেশি এসিস্টের, সবচেয়ে বেশি ক্লিন শিটের, সবচেয়ে বেশি ম্যান অফ দ্যা ম্যাচের, কিংবা সবচেয়ে বেশি কার্ডের! এই রেকর্ড হতে পারে বিশ্বকাপে, ইউরোতে, কোপাতে কিংবা চ্যাম্পিয়ন্স লীগে, লা লীগাতে, ইপিএলে, সিরি আ তে, বুন্দেলসলীগাতে। অথবা হতে পারে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ইতালি, জার্মানি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডের মতন ঐতিহ্যবাহি জাতীয় দল কিংবা রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, ইউনাইটেড, লিভারপুল, বায়ার্ন, ২ মিলানের মতোন ক্লাবগুলায়। ফ্রান্সের সেরা ৩ জনের মাঝে না থাকলেও এক বিশ্বকাপে ১৩ গোল করা যা ফন্টেইন যেমন, ক্লোসার কথাতো আগেই বললাম, এমনকি শুধুমাত্র ধ্রুততম গোল করার হাকার সুকুরের নামটাও মনে থাকবে সবার। ন্যাশনাল টিমে সর্বচ্চো গোল যেমন ইরানের আলী দায়ির, জাতীয়তা যাই হোক এই রেকর্ডের কথা আসলে তার নাম নিতেই হবে। টপ লেভেলের প্লেয়ারদের হিসেব নিলে পুস্কাস, পেলে, ককসিস, মুলাররা তো আছেই। তেমনি নাম নিবে চ্যাম্পিয়ন্স লীগে মেসি-রোনালদোর মধ্যে যে সর্বচ্চো গোল স্কোরার হিসেবে শেষ করবে। বুন্দেলসলীগায় জারড মুলার, সিরি আ তে আলতাফিনি, ইপিএলে শিয়ারার, লা লীগায় মেসির নাম নিবে।

৩. টিম লিজেন্ডঃ এইখানেই হয়তোবা ক্লাব লিজেন্ড কথাটা আসবে, কিংবা ন্যাশনাল টিম লিজেন্ড ও! আমি এটা দেখি ওয়ান টীম লিজেন্ড হিসেবে। সেই টীমটা হতে পারে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা-জার্মানি -ইতালির মতো ন্যাশনাল টীম কিংবা সুইডেন, আইভরি কোস্ট, ডেনমার্ক, ইরানের মতো দলও। হতে পারেন তিনি বার্সেলোনা-রিয়াল-ইউনাইটেডের অলটাইম লিজেন্ড, আবার হতে পারেন আস্টন ভিলা, এস্পানিয়ল, পালেরমোর মতো ক্লাবেরও লিজেন্ড! এই টিম লিজেন্ডদের সেই টিমের ফ্যানবেজরা ভালো করেই মনে রাখে, আর কেউ মনে না রাখুক। ঐতিহ্যবাহী ন্যাশনাল টিম কিংবা ক্লাবের সেরা ২-৩ জন খেলোয়াড় তো ফুটবলেরই অলটাইম লিজেন্ড হয়ে থাকেন। ক্লোসার কথাতেই আবার আসি - সেরা স্ট্রাইকারদের একজন না হয়েও এক জার্মানির জন্য বিশ্বকাপে যা করসেন তার জন্য তিনি অল টাইম জার্মান লিজেন্ড। নিজ সময়ে ক্রুইফ, জিকোদের পিছনে থাকলেও বিশ্বকাপ জিতে কেম্পেস আর দীর্ঘকাল আর্জেন্টিনার টপ স্কোরার থাকা বাতিস্তুতা যেমন আর্জেন্টিনার, রাউল যেমন স্পেন-মাদ্রিদের, ফিগো যেমন পর্তুগালের। ইব্রাহিমোভিচ যেমন সুইডেনের, নেদভেদ যেমন চেক রিপাবলিক-জুভেন্টাসের, শেভচেঙ্কো যেমন ইউক্রেন-মিলানের, বুলগেরিয়ান লিজেন্ড হ্রিস্টো স্টকচয়েভ যেমন বার্সেলোনা লিজেন্ড। আইভরি কোস্টের বেস্ট প্লেয়ার, সময়ের সেরা স্ট্রাইকারদের একজন হলেও দ্রগবা হয়তোবা অলটাইম গ্রেটদের কাতারে পড়বেন না। কিন্তু চেলসি ফ্যানদের কাছে অলটাইম লিজেন্ডই থাকবেন। কোন প্রিমিয়ার লীগ টাইটেল নামের পাশে নাই, নিজ সময়ের জিদান, সিডরফ, ফিগো, ব্যাকহ্যাম, জাভি, ইনিয়েস্তা, পিরলোদের মতো মিডফিল্ডারদের থেকে পিছনে থাকবেন - কিন্তু ওই এক চ্যাম্পিয়ন্স লীগ আর লয়্যালটির জন্য জেরারড ও লিভারপুল ফ্যানবেজের কাছে লিজেন্ড থাকবেন। লয়্যালটির কথা বললে টট্টির নাম ও আসবে, যেই মানের খেলোয়াড় ছিলেন খুব সহজেই পারতেন মিলান, রিয়াল, ইউনাইটেডের মতো ক্লাবে মুভ করে নিজের নামের পাশে আরো অনেক টাইটেল যোগ করতে! কিন্তু ওই লয়্যালটির জন্যই রোমা ফ্যানরা কখনো ভুলতে পারবে না। ইন্টার ফ্যানরা যেমন পারবে না জ্যানেত্তিকে, মিলান ফ্যানরা মালদিনিকে, ইউনাইটেড ফ্যানরা গিগস-স্কোলসকে, কিউল ফ্যানরা পুয়োলকে। এই লিস্টে আরো অনেক অখ্যাত, তারকাদ্যুতিহীনরাও আছে যাদের জন্য ট্রফি না - লয়্যালটিই ফ্যানদের হৃদয়ে স্থান পেতে যথেষ্ট!

৪. পজিশনাল লিজেন্ডঃ ফুটবলে গোলকিপার থেকে শুরু করে স্ট্রাইকার পর্যন্ত ১১ জন খেলে ১১ টা ভিন্ন পজিশনে। আমরা হয়তোবা সবার সামনের দিকে যেই ২-৩ জন এটাকার থাকে তাদের নিয়েই বেশি মাতামাতি করি, সর্বকালের সেরা কিংবা সময়ের সেরা বিতর্কেও ওই স্ট্রাইকার - বড়জোর এটাকিং মিডফিল্ডার কাউকে নিয়েই পড়ে থাকি। কিন্তু সামনের ওই ২-৩ টা পজিশন বাদেও আরো পজিশন আছে, যেই পজিশনের কথা উঠলে ওই পজিশনের বেস্টদের নাম আমাদের সামনে আসবে। গোলকিপারদের মধ্যে যেমন - লেভ ইয়াসিন, দিনো জফ, সেপ মায়েররা অলটাইম বেস্ট। সর্বকালের সেরা সিবির নাম নিলে যেমন - বোকেনবাওয়ার, বারেসি, ববি মুর, ক্যানাভারোদের নাম চোখে ভাসবে। সেরা রাইট ব্যাকে যেমন কাফু, কার্লোস আলবার্তো, জ্যানেত্তি, থুরাম। লেফট ব্যাক শুনলে কোন সন্দেহ ছাড়াই যেমন মালদিনির নাম সবার আগে আসবে, কার্লোস-সান্তোস-ফাচেত্তিদের নাম ও আসবে। ফুটবলে সবচাইতে অদৃশ্য কন্ট্রিবিউশনের পজিশন হলো ডিফেন্সিভ মিডফিল্ড কিংবা সেন্ট্রাল মিডফিল্ড। এরা গোল করে কম, এসিস্ট ও খুব বেশি করে না, আবার ডিফেন্ডারদের মতো গোল সেভিং ট্যাকল ও করে কম। কিন্তু পুরা মাঝমাঠ তথা পুরা খেলাটাই নিয়ন্ত্রন করেন এরা! এই পজিশনে সবার আগে যেই নামটা আসে তা হলো জার্মান মেশিন লোথার ম্যাথাউস। আর আসবেই না কেনো - অন দ্যা ফিল্ড ম্যারাডোনা দি গ্রেটকে সবচেয়ে ভালোভাবে সামলানো প্লেয়ার তিনি! আপনি ভুলতে পারবেন না সীমিত প্রতিভা নিয়েই নিজের রোলটাকে “মাকেলেলে” রোল নামে বিখ্যাত করা ক্লদিও মাকেলেলেকে, গ্লাস পড়ে খেলতে নামা এদ্গার ডাভিডসকে, ডাচ লিজেন্ড ফ্রাঙ্ক রাইকারডকে, ইউনাইটেড লিজেন্ড রয় কিনকে। সেন্ট্রাল মিডের প্লেয়াররা আবার অলরাউন্ডার টাইপ, এই সেন্ট্রাল মিডের কথা নিলে আপনার মনে আসবে ব্রাজিলিয়ান লিজেন্ড ফ্যালকাও, দিদি, জাভিদের নাম। এটাকিং মিডের বেলায় গ্রেট ম্যারাডোনা থেকে শুরু করে ক্রুইফ, জিদান, জিকো, স্টেফানো, প্লাতিনির মতো মহারথিদের নাম মনে আসবে। আর আক্রমন ভাগে তো পেলে, ইউসেবিও, পুস্কাস, বেস্ট, বাস্তেন, মুলার, রোমারিও, লিমা, দিনহো, মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো - অভাব নাই নাম, কাকে রেখে কার কথা বলবেন আগে!!! একটা ব্যাপার লক্ষণীয় - ম্যাথাউস, বোকেনাবাওয়াররা গোলের পর গোল করেন নাই, মালদিনি বিশ্বকাপ ও জিতেন নাই, তারপরেও উনারা তাদের পজিশনে বেস্ট! নিজেদের পজিশনটা অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেসেন বলেই না তাদের লিজেন্ড হতে ভূরি ভূরি গোল কিংবা বিশ্বকাপ দরকার হয় নাই। ফ্যানরা সব সময় তাদের পজিশনে বেস্ট হওয়ার জন্যেই বেশি করে মনে রাখসে! 
অল টাইম গ্রেটঃ এইবার আসি অলটাইম গ্রেটদের কোথায় . . . উনারা কোন নির্দিষ্ট যুগের না, কোন নির্দিষ্ট পজিশনের না, কোন নির্দিষ্ট দলের না, কোন নির্দিষ্ট কীর্তিরও না! ফুটবল লিজেন্ডদের নাম নিলে উনাদের নাম সবার আগেই আসে। তারাই বেস্ট অফ অল! এদের মাঝেই বিতর্ক চলে কে সর্বকালের সেরা, কে সর্বকালের সেরা ৩, সেরা ৫ কিংবা সেরা ১০ এর একজন। কতগুলা লিংক দিলাম, সর্বকালের সেরা ২০ জনের। এই লিংকের সবাই যে একদম নিখুতভাবে রেংকিং করসে তা না, কিন্তু এই ২০ জন, প্রথম ১০ জন, সেরা ৫ জনের লিস্টে কিছু নাম সবখানেই কমন। তারমানে ধরে নিতে পারেন এই কমন ৩ জন অথবা ৫ জন অথবা ১৫ জন সত্যিকার অর্থেই ফুটবলের অলটাইম গ্রেট কোন বিতর্ক ছাড়াই।

এদের সবাই যে আবার বিশ্বকাপ জিতসে তা না! কেউ সুজোগ পেয়েও পারেননি, কেউ সুজোগই পাননি। তাদের অলটাইম গ্রেটের খেতাব পাওয়ার জন্য বিশ্বকাপ-গোল-রেকর্ড বাদে আরেকটি সুত্রে ফেলি . . . .
সুত্রটা হলো “যুগের সেরা” - অর্থাৎ নিজ যুগের সেরা প্লেয়ার, প্লেয়ারদ্বয় অথবা সেরা ৩ জন। বিশ্বযুদ্ধের আগে গেলাম না, বিশ্বযুদ্ধের পরে ১৯৫০-৫৮ এই সময়টার সেরা প্লেয়ার কিংবা সেই যুগের সেরা প্লেয়ার কে? কিংবা সেই সময়টাকে কার যুগ বলা যায়??? - পুস্কাস যুগ! তারপরে ফুটবলের নতুন রাজা বলা যায় গ্যারিঞ্চাকে! অবশ্য গারিঞ্চা যুগ বেশিদিন টিকলো না নতুন ফুটবল সম্রাট পেলের কাছে! ১৯৫৮-৭০ পুরাটাই এক কথায় “পেলের যুগ”। নাম নিতে হবে এই সময়ে ইউরোপের রাজা ডি স্টেফানো, কালো চিতা ইউসেবিও, ইউনাইটেড বরপুত্র জর্জ বেস্টের কথাও। পেলে না থাকলে উনাদের সব যোগ্যতাই ছিল সেই সময়ের রাজা হওয়ার। এরপর ১৯৭০-৮২; এই যুগ কিংবা এই দশকটাকে বলা যায় টোটাল ফুটবলের নায়ক ক্রুইফের যুগ। ক্রুইফের পর সেই যুগের প্রতাপশালীদের নাম নিতে হলে সবার আগে আসবে বোকেনবাওয়ার, মুলারের নাম। তারপর ১৯৮০-৯৪; এই যুগটা পুরোপুরি ম্যারাডোনার যুগ। এই যুগের বেশিরভাগ সময়ের সেরা ফুটবলারের সিংহাসনে ছিলেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা। যদিও যুগটা শুরু হয় প্লাতিনি-জিকোদের রাজত্ব দিয়ে, আর এরপর যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী মার্কো ভ্যান বাস্তেন তো ছিলেনই! ১৯৯০-৯৬; এই সময়ে ম্যারাডোনার রাজত্ব শেষ হয়ে রাজত্ব আসলো রোমারিও কাধে। ফুটবলের নতুন রাজা ব্রাজিলকে এনে দিলেন ২৪ বছরের অধরা বিশ্বকাপ! ৯৬ এর পরে তার কাছ থেকে রাজত্বটা কেড়ে নিলেন আরেক ব্রাজিলিয়ান ওয়ান্ডার বয় ন্যাড়া মাথার রোনালদো লিমা। এই রাজত্বে আবার কিছুদিন পর ভাগ বসালেন জিনেদিন জিদান। আবার শেষদিকে সেই রাজত্বের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন জাদুকর রোনালদিনহো গাউচো। এই সময় অনেক ট্যালেন্টেড, অনেক ওয়ার্ল্ড ক্লাস প্লেয়ার থাকলেও ১৯৯৬-২০০৬ এই যুগটা লিমা-জিদান-দিনহো যুগ! ২০০৬-বর্তমান; শুরুটা রিকারডো কাকাকে দিয়ে হলেও তিনি এরপর হারিয়েই গেলেন। তাই বর্তমান যুগটা আর কারো না - শুধুমাত্র মেসি-রোনালদো যুগ! এই ২ জনের সাথে বাকিদের দূরত্বও যেন একযুগেরই!

লক্ষ্য করুন, ১৯৫০-২০১৬ পর্যন্ত যারা দীর্ঘ সময় জুড়ে নিজ যুগের সেরা ছিল তারা সবাই ঘুরেফিরে অলটাইম গ্রেটদের সেরা ২০ এ আছেন। এবং এই ২০ জন ব্যালন বলেন, ফিফা বর্ষসেরা বলেন -কমপক্ষে একবার হলেও জিতেছেন এবং একাধিক বার জিতার রেসে ছিলেন। কোন যুগে কোয়ালিটি ফুটবলার বেশি ছিল তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু এই যুগের সেরারা যে অলটাইম গ্রেট তা নির্দ্বিধায় বলা যায়! অনেকে তাদের যুগের অনেক ভালো প্লেয়ার ছিলেন, তারাও শিরোপা জিতেছেন রেকর্ড ও গড়েছেন, কিন্তু অলটাইম গ্রেটদের তালিকায় আসতে পারেন নাই। তারা হয় তাদের ট্রফি কিংবা টিমের জন্য ওই টিমের ফ্যানবেজদের কিংবা ওই সময়ের দর্শকদের মনে থাকবেন, কিন্তু অলটাইম গ্রেট লিস্টে না। অলটাইম গ্রেট হতে হলে শিরোপা, গোল, রেকর্ড, প্রতিভার সাথে নিজ যুগের রাজাও হওয়া লাগে . . . . .

আবার কিছু প্লেয়ার আসে জারা তাদের নির্দিষ্ট কিছু স্কিলের জন্য কালজয়ী হয়ে থাকবেন। শুধুমাত্র নিখুত ফ্রী-কিকের জন্য যেমন জুনিনহো, মিহাজলোভিচ, ব্যাকহ্যামরা। আবার গোলকীপার হয়েও নিয়মিত ফ্রী-কিক, পেনাল্টি নেওয়ার জন্য খ্যাত পাগলাটে চিলাভারটকেও ভুলা যাবে না।

মাঠে খেলার বাইরেও অনেকে কোচ হিসেবেও খেলাটাকে মহিমান্বিত করেছেন। টোটাল ফুটবলের কর্ণধার জোহান ক্রুইফ তো খেলোয়াড় প্লাস কোচ, 

২ রোলের জন্যেই অনেকের থেকে বেশি এগিয়ে আছেন! খেলোয়াড় প্লাস কোচ হিসেবে বিশ্বকাপ জেতা বোকেনবাওয়ার ও

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন