জুভেন্টাসের দশ নাম্বার জার্সি

জুভেন্টাসের দশ নাম্বার জার্সি

৫০ দশকে ওমর সিভারিকে নিয়ে দুর্দান্ত সময় পার করার পর ষাটের দশক জুভেন্টাসের ট্রফি খরার অন্যতম দশক। এই দশকে ওল্ড লেডিরা ডি স্টেফানোর মাদ্রিদ থেকে দলে ভিড়ায় এক স্প্যানিশ জিনিয়াসকে- লুইস ডেলা সউল।

পেস, স্ট্যামিনা ও ভিশন- এই তিনের সমন্বয়ে সারা মাঠ কাভার করতেন সাথে ছিলো অসাধারন বল ডিস্ট্রিবিউশন, তাই আলফ্রেড ডি স্টেফানো লুইস ভেলা সউলের নাম দিয়েছিলেন 'দ্য পোস্ট ম্যান'। ওমর সিভারি নাপোলিতে চলে যাওয়ার পরেই ১০ নম্বর জার্সিটা তাকে দেওয়া হয়। টানা আট মৌসুম ওল্ড লেডিদের মাঝমাঠের কান্ডারির ভুমিকায় থেকে যদিও মাত্র একটা সিরি এ জয়ের স্বাদ পান, তারপরেও বিয়ানকোনেরাদের মন ঠিকই জয় করে নেন এই নাম্বার টেন।

কোচিং ক্যারিয়ারে মিলান লিজেন্ড হলেও গুরু কিন্তু খেলোয়াড় হিসাবে জুভেন্টাস লিজেন্ড, খেলেছিলেন সত্তর এর দশকে জুভেন্টাসের 'কোপা শামসু' জেনারেশনে। জ্বি হ্যা, ফ্যাবিও ক্যাপালোর কথা বলছি। ছয় বছরের জুভেন্টাস ক্যরিয়ারে ১০ নম্বর জার্সি ধারি এই ডিপলাইং প্লে-মেকার তার ট্রিকি ও হার্ডওয়ার্কিং মিডফিল্ড অপারেশন দিয়ে ওল্ডলেডি ফ্যানদের বুদ করে রাখেন তিনটি সেরি আ টাইটেলসহ।

                                

৫০ এর দশকের ইউরোপের "ম্যাজিকাল ট্রিও" খ্যাত ত্রয়ী তে লিজেন্ড গাম্পারারো বোনাপার্তি এবং জন চার্লস এর সাথে ছিলো এক ল্যাটিন জাদুকর নাম ওমর সিভারি। এই "ম্যাজিকাল ট্রিও" নিয়ে ওল্ড লেডিরা অর্ধ যুগ ইতালি শাসন করে। জন চার্লস ও বোনাপার্তির ঠিক পেছনে বল স্কিল ট্রেকোয়েস্তা (সেন্টার এটাকিং মিডফিল্ডার) হিসেবে খেললেও এই ১০ নম্বর জার্সিধারি ওমর সিভারি গোল পোস্ট খুব ভালোই চিনতেন। জুভুদের হয়ে ২১৫ ম্যাচে ১৩৫ গোল তার নিদর্শন।

                               

১৯৬১ সিজনে ইন্টারকে হারানো ৯-১ গোলের ম্যাচ একাই করেছিলেন ছয় গোল অর্থাৎ ডাবল হ্যাট্রিক। অত্যন্ত উচ্চ ভিলাসী ছিলেন তাই ৫৮ এর বিশ্বকাপ নিজ দেশ আর্জেন্টিনার হয়ে না খেলে ইতালীর হয়ে খেলার সিদ্ধান্তে আর্জেন্টাইনদের কাছে 'গাদ্দার' ট্যাগ খান। পরে অবশ্যই বিয়ানকোনেরাদের হৃদয় ভেঙ্গে নাপোলিতে নাম লেখান তার পরেও ১০ নম্বর জার্সির কথা মনে এলে এই ব্যালন ডি অর জেতা ওমর সিভারির নাম এখনো বিয়ানকোনেরাদের মনে ভাসে।

ম্যান ইউনাইটেড এবং ম্যান সিটি ক্যারিয়ারে সফল সময় পার করলেও মেজাজ ও কোচের সাথে ক্যাচালের জন্য টিকতে পারেননি শেষমেশ এসে নাম লেখান ওল্ড লেডিতে। হুম, কার্লোস্ তেভেজ। এই 'এপাচি ওয়ার চিফ' লুকিং তেভেজ এমন একটা সময় জুভেন্টাসে আসেন যখন লেজেন্ড দেল পিয়েরো দল ছাড়েন। এবং যখন সেরি আ একটি ব্লাস্টিং নম্বর টেন এর অভাবে ধুকছিলো । ওল্ডলেডিরা তার হাতেই ১০ নম্বর জার্সি তুলে দিয়ে ভুল করেননি। তেভেজ তার সহজাত টেকনিক, স্কিল, হার্ড ওয়ার্ক এবং এগ্রেশন এর ব্লাস্টিং শো করে ওল্ডলেডিদের আস্থার ভালোই প্রতিদান দেন। কখনো সেন্টার ফরোয়ার্ড, কখনো সেকেন্ড স্ট্রাইকার কখনো বা ত্রেকোয়েস্তা রোলে।

সমকালিন ওয়ার্ল্ড রেকর্ড ৮ মিলিয়ন ট্রানসফার ফি তে জুভেন্টাসে নাম লিখান এবং পান ১০ নাম্বার জার্সি যেখান থেকে মিশেল প্লাতিনির ফেম এর উত্তাপ তখনো যায়নি। জ্বি হ্যা, রবার্তো ব্যাজিও। বিশিষ্ট খাটের(!) ও মাঠের খেলাড়ি গুইসেপ মিয়েজ্জার পরে ইতালির সব চেয়ে স্কিলফুল ফরোয়ার্ড হিসেবে ধরা হয় রবার্তো ব্যাজিওকে।

                                      

ব্যাজিওর জুভেন্টাস ক্যারিয়ার বিচার করা আসলে কঠিন ছিলো বিশেষ করে তার পজিশন ইন্ডিকেট করা। অত্যন্ত ভার্সেটাইল ছিলেন তার পজিশনিংয়ে। মূলত, ইতালির চিরাচরিত ত্রেকোয়েস্তা রোলই প্লে করতেন। কিন্ত ব্যাজিওকে দিয়ে তৎকালিন কোচ ফ্রি রোল প্লে করাতেন যা কিছুটা এখনকার ফলস নাইন টাইপ ছিলো। ভিশন, পাসিং, ট্রিকারি, দুই পায়েই ড্রিবলিং এ দক্ষ ছিলেন এই জাদু কর শুধু ভাগ্যটা সাথে একটু কম ছিলো এই আর কি। জুভেন্টাসে ১০ নম্বর জার্সিধারিদের টপ লিস্টে অনায়াসে যায়গা করে নিয়েছেন রোবার্তো ব্যাজিও।

সেই রোমান সম্র্যাজ্যের আমল থেকেই ফরাসীদের সাথে ঐতিহাসিক রাজনৈতিক জাতিগত সাঁপে-নেউলে সম্পর্ক। ১৫শ শতক ষোড়শ শতকে বিভক্ত ইতালীকে ফরাসীরা যতবার আক্রমন করেছিলো তার সর্বপ্রথমে কচু কাটা লুটপাট সহ যাবতীয় কোপের মুখে পড়তো তুরিন। এই তুরিনবাসির মনেই এক কোকড়া চুলের ফরাসি জাদুকর আজীবন আসন পাকা করে রেখেছেন তিনি আর কেউ নন তিনি যে মিশেল প্লাতিনি যিনি দশ নম্বর জার্সি পরেই ওল্ডলেডির যাবতীয় জারিজুরি ইতালীর বাইরে নিয়ে আসেন। জ্বি হ্যা, ওল্ডলেডিদের প্রথম ইউরোপিয়ান কাপ তথা আজকের উচল জয়ের মূল কান্ডারি ছিলেন এই এটাকিং মিডফিল্ড লিজেন্ড। ওল্ডলেডিদের হয়ে হ্যাট্রিক ব্যালন ডি'অর জেতা এই জাদুকর প্লে-মেকার তার সহজাত ভিশন ক্রিয়েটিভিটি, চান্স ক্রিয়েশন ও ইনক্রেডিবল ড্রিবলিং দিয়ে অল টাইম ফুটবল গ্রেটদের কাতারে নিজেকে নিয়ে গিয়েছিলেন। গোল স্করিং এ এরিয়াল ও ফুট উভয় ক্ষেত্রে সমান দক্ষ ছিলেন এই গ্রেট নম্বর টেন।

কিছু কিছু প্লেয়ার আছে যারা কেবল ফুটবলশৈলি দিয়ে ফ্যানদের মনে স্থান পান না তারা হয়ে যান ফ্যানদের আবেগের প্রতিশব্দ, ইয়েস বিয়ানকোনেরা দের কাছে আবেগের প্রতিশব্দ একটাই তা হল আলেসান্দ্রো ডেল পিয়েরো।

                                      
জুভেন্টাস ইয়ুথের অনুর্দ্ধ ২০ স্কুদেত্তা জিতে কোচ ত্রাপাতিনির নজরে পড়ে যখন মূল দলে ঢাক পান তখন অলরেডি ব্যাজিওকে নিয়ে মাতোয়ারা জুভেন্টাস, ডেব্যু হবার পরের ম্যাচে বদলি হিসাবে নেমেই গোল করেন আর তৃতীয় ম্যাচে স্টার্টিং ইলিভেন এ চান্স পেয়েই হ্যাট্রিক করে বুঝিয়ে দেন সামনে আরো বহুপথ চলতে এসেছেন- যেই পথ টানা ১৯ টি সিজন ৫১৩ ম্যাচে ২০৮ গোলে উচল সহ আঠারোটা মেজর ট্রফি নিয়ে তার পর শেষ হয়। লিপ্পি কোচ হয়ে আসার পরেও আবার শুরু হয় জুভেন্টাসের ডমেনেশন আর তার মধ্যমনি ডেল পিয়েরো তার নেতৃত্ব দেন দশ নম্বর জার্সি বুঝে নিয়ে। এত কম বয়সে তাকে যে দশ নম্বর জার্সি দিয়ে ভুল করেননি কোচ সেটি বুঝিয়ে দেন ১৯৯৬ সিজনে ইউসিএল জিতিয়ে। ভাগ্য সহায় হলে আরো অন্তত দুইটা ইউসিএল তার ঝুলিতে থাকতো।

২০০৬ এর ম্যাচ ফিক্সিং কেলেঙ্কারিতে সিরি বি তে অবনমনের কারনে যখন অর্ধেক এর ও বেশি স্টার দল ছাড়ার তোড়জোড় শুরু করে তখন জুভেন্টাস ছাড়ার বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলে ছিলেন-

"A true gentleman never leaves his lady"

"No color will ever be brighter for me than black and white"

দেল পিয়েরো তার ওল্ডলেডিকে ছেড়ে যাননি বরংচ পরম মমতায় এবং দায়িত্বে আগলে রেখে পরের মৌসুমেই সিরি বি চ্যাম্পিয়ান করে সিরি আ তে তুলেছেন দল কে।

খেলোয়াড় হিসাবে ডেল পিয়েরোও একজন ভারর্সেটাইল ফরোয়ার্ড এবং যথারীতি ইতালিয়ান ত্রেকোয়েস্তা। তবে দেল পিয়েরো আরেকটু উপরেই সেকেন্ড স্ট্রাইকার রোলে প্লে করতে পছন্দ করতেন। চান্স ক্রিয়েটিং ভিশন, প্লেমেকিং, ফার্স্ট মুভ, ক্লোজ কন্ট্রোল, ড্রিবলিং, ক্লিনিকাল ফিনিশিং, কার্লি ফ্রিকিক এবং বক্সের বাইরে থেকে কোনাকুনি এঙ্গেল থেকে ট্রেডমির্ক ফিনেস শট যেন মুখস্ত শটে গোল হত।

 কেউ কি পারবে জুভেন্টাসের ১০ নম্বর জার্সি পরে এই ভদ্রলোক দেল পিয়েরো কে ছাড়িয়ে যেতে?

কিছদিন আগে জুভেন্টাসের দশ নাম্বার জার্সি পগবা কে দেওয়া হয়েছিলো স্রেফ পগবা কে খুশি রাখার জন্য। এইবার ডিবালা কে খুশি করার জন্য ১০ নম্বর জার্সি দেওয়া হচ্ছে যা মোটেও জুভেন্টাস সমর্থক হিসেবে ভালো লাগছে না। ল্যাটিন সেনশেসনদর উপর মিডিয়া হাইপ বেশি থাকে। 'লাল নীল বাতির আলো' এর আবেদন কে উপেক্ষা করে ক্লাবে থাকার মানসিকতা তাদের কম। মন বলে বার্নাডেশিওকেই এই দশ নম্বর জার্সি দিলে ভালো হত। ইতালীয়ান রক্ত বলে কথা, ক্যারিয়ারের বেস্ট ফর্মে আসলে ইপিএল এর জাকজমক বা বার্সা-মাদ্রিদে খেলার ছোট বেলার স্বপ্ন তার মধ্যে পয়দা হবার সুযোগ কম।

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন