মাইকেল বালাক - একজন জার্মান সিংহ

মাইকেল বালাক - একজন জার্মান সিংহ

বর্তমান সময়ে সবাই ইনিয়েস্তা, পগবা, ক্রুস, থিয়াগোদের নিয়ে ব্যস্ত। ৭-৮ বছর আগের কথাই যদি ধরি, তাহলে ডিপ মিডফিল্ডার বলতে সকলেই পিরলো, জাভি, জেরার্ডদের নাম নিবে। মাইকেল বালাক নামক কমপ্লিট মিডফিল্ডারটির কথা খুব কম সংখ্যক ফুটবলপ্রেমী মনে রেখেছে। যারা নতুন ফুটবল দেখা শুরু করেছে, তারা অনেকে হয়তোবা মাইকেল বালাকের নামটাও জানেনা। কে এই মাইকেল বালাক? 

রেকর্ড ৩ বার জার্মান প্লেয়ার অফ দ্যা ইয়ার। ১৯৯৯-২০১০ সাল পর্যন্ত জার্মানির হয়ে খেলেছেন। জার্মানির অধিনায়ক ছিলেন ২০০৪-২০১০ পর্যন্ত। জাতীয় দলের ইতিহাসের অন্যতম সেরা স্কোরার; ৯৮ ম্যাচে ৪২ গোল। জার্মানির হয়ে মোট চারটি মেজর টুর্নামেন্ট খেলেছেন। সে চারটি টুর্নামেন্টের সেরা একাদশেই তিনি ছিলেন। ফুটবলার হিসেবে তিনি ছিলেন কমপ্লিট প্যাকেজ। পাসিং, লং পাস, ক্রস, ভলি শট, লং শট, শট পাওয়্যার; কী ছিলনা তার খেলায়? শুধু একটা জিনিসই ছিলোনা তার সাথে। সেটা হল "ভাগ্য।"

১৯৯৮ সালে কাইজার্স্লৌটার্নের হয়ে খেলার সময় মাইকেল বালাক সকলের নজরে আসেন। কাইজার্সউটার্ন আগের সিজনেই অর্থাৎ ১৯৯৬/৯৭ সিজনে দ্বিতীয় বিভাগ থেকে বুন্দেসলিগায় কোয়াফিলাই করে। সবাইকে রীতিমতো চমক দেখিয়েই ১৯৯৮/৯৯ সিজনের বুন্দেসলিগা জিতে যান তারা। বালাক ছিল সে দলটির মেরুদণ্ড। 

মাইকেল বালাক এরপরের সিজনে নাম লিখান বায়ার লেভারকুসেনের হয়ে। তার একক নৈপুণ্যে লিভারকুসেন ২০০১/২ সিজনের UCL ফাইনাল খেলেন। লিভারপুল, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মত বিশ্বসেরা ক্লাবদের হারিয়েই চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে ওঠে বালাকের লেভারকুসেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রিয়াল মাদ্রিদের হাতেই থেমে যায় তাদের রূপকথা। ফাইনালে বায়ার লেভারকুসেনকে ২-১ গোলের ব্যবধানে পরাজিত করে রিয়াল মাদ্রিদ। ঠিক সে সিজনেই, বুন্দেসলিগা জিততে লেভারকুসেন প্রয়োজন ছিল শেষ তিন ম্যাচে মাত্র পাঁচ পয়েন্ট। বায়ার লেভারকুসেন শেষ তিন ম্যাচে সেই ৫ পয়েন্ট নিতে অসক্ষম হয়। ফলে, ডর্টমুন্ড সেবার লিগ জিতে যায়। তার দল সেবার প্রতিটা টুর্নামেন্টের শেষে "তিরে এসে তরি ডুবিয়েছিল।" তবে, বালাক ছিল অপ্রতিরোধ্য। জিতে নেন ইউয়েফা মিডফিল্ডার অফ দ্য ইয়ারের পুরষ্কার। এরপরের সিজন শুরু হওয়ার পূর্বে সকলের ধারণা ছিল যে, মাইকেল বালাক রিয়াল মাদ্রিদে আসবেন। সবাইকে চমকে দেখিয়েই বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে নাম লিখান এই মিডফিল্ডার।

সে বছরেই ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলেন তার জার্মানি। ফাইনালে বালাকবিহীন জার্মানিকে ২-০ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় ব্রাজিল। কোয়ার্টার ফাইনাল এবং সেমিফাইনালে হলুদ কার্ড দেখার কারণে ফাইনাল মিস করেছিল এই মিডফিল্ড মায়েস্ট্রো।

ঐ বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা প্লেয়ার ছিলেন এই মিডফিল্ড কিংবদন্তি। বালাকের একমাত্র গোলেই কোয়ার্টার ফাইনালে যুক্তরাষ্ট্রকে হারিয়ে জার্মানি সেমিতে চলে যায়। এরপর, সেমিতেও তার একমাত্র গোলেই স্বাগতিক কোরিয়া রিপাবলিককে পরাজিত করে জার্মানি ১২ বছর পর চলে যায় বিশ্বকাপ ফাইনালে। ম্যাচের ৭৩ মিনিটের মাথায় একটা ট্যাক্টিকাল ফাউলের জন্য তাকে হলুদ কার্ড দেখতে হয়। হলুদ কার্ড দেখার কয়েক মিনিট পরই ম্যাচের একমাত্র গোলটাও করেন বালাক। গোল দেয়ার পরপরই তার চোখ দিয়ে গড়গড় করে পানি পড়ছিল। তৎকালীন জার্মান কোচ রুডি ভোলার ঐ ট্যাক্টিকাল ফাউলটির সম্পর্কে বলেন, "বালাক তার দেশের জন্যই ওত বড় স্যাক্রিফাইস করেছিল। ফাউলটা না করলে জার্মানি হয়তোবা সেবার ফাইনালই খেলতে পারতোনা।" বিশ্বকাপ শেষে দেশে ফেরার পর ঐ ফাউলটির জন্য তাকে জার্মানিতে "STANDING OVATION" দেয়া হয়।

বায়ার্নের হয়ে চার সিজন খেলেছেন । ১০৭ ম্যাচে করেছেন ৪৪ গোল। প্রথম দুই সিজন এবং শেষ সিজন জিতেছেন ডাবল।

২০০৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয় জার্মানিতে। জার্মানি সেবার ৩য় স্থান অর্জন করে। বালাক ঐ বিশ্বকাপের সেরা একাদশের মেম্বার ছিল। সেমি-ফাইনালে ইতালির কাছে হেরে যাওয়ার পর তার কান্নাভরা মুখ দেখে জার্মানির প্রতিটা দর্শকই কেঁদেছিল সেই রাতে।

২০০৬ বিশ্বকাপের পর ফ্রি এজেন্ট হয়ে পাড়ি দেন চেলসিতে। তার চেলসি ক্যারিয়ার ওতটা সফল ছিলোনা। তবে, দিনেদিনে বালাক চেলসির একজন গুরুত্বপূর্ণ প্লেয়ার হিসেবে পরিণত হয়ে উঠছিলো। এসিয়েন-ল্যাম্পস-জো কোল-বালাকদের নিয়ে একটা ফরমিডেবল মিডফিল্ড গঠন করে চেলসি। ২০০৭/০৮ সিজনের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে তার দল চেলসি টাইব্রেকারে পরাজিত হয় ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কাছে। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের স্বাদ আর পাওয়া হলনা এই মিডফিল্ড কমান্ডারের । ২০১০ বিশ্বকাপের কিছু আগের কথা; চেলসির হয়ে এফএ কাপ খেলার সময় কেভিন প্রিন্স বোয়াটেং এর ফাউলে সে মারাত্মকভাবে ইঞ্জুরড হয়। সেখানেই তার বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন সেখানেই মাটিতে মিশে যায় সেবার; ঐ ম্যাচটি ছিল চেলসির হয়ে বালাকের শেষ ম্যাচ।

২০০৮ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে স্পেনের কাছে তার দল জার্মানি ১-০ গোলে পরাজিত হয়। সেবারও মেজর কোন ট্রফি জিতা হয়নি এই লিজেন্ডের। 

অস্ট্রিয়ার সাথে তার দেয়া ফ্রি-কিক গোলটির কথা ফুটবলপ্রেমীদের আজীবন মনে থাকবে। আমার দেখা অন্যতম সেরা গোল ছিল । কমেন্টেটর ঐ গোলটি হওয়ার পর চিৎকার করে বলছিল,

"Its Michael Ballack. Michael Ballack scores for Germany. 4 minutes into the 2nd half. That's just an absolute brilliant strike by Michael Ballack. Marvelous Freekick. A screamer fron Michael Ballack & Germany have never lost a game when he has scored."

চেলসি মিশন শেষ করে আবারও ফিরে যান লেভারকুসেনে। সেখানে দুই সিজন খেলার পর ফুটবলকে আলভিদা জানান এই কিংবদন্তী মিডফিল্ডার। ২০১২ সালের ২য় অক্টোবার ফুটবল থেকে আজীবনের বিদায় নেন।

তার সম্পর্কে কিছু লিজেন্ডের উক্তিঃ

Bastian Schweinsteiger: " Ballack is my Idol."

ফ্যাঙ্ক ল্যাম্পার্ড: "সে টিম-মেট হিসেবে অসাধারণ।"

অলিভার কানঃ "২০০১-২০১০ পর্যন্ত মাইকেল বালাক ছিল জার্মানির সেরা প্লেয়ার।"

Thierry Henry: "Ballack is one of the greatest midfielders of his time."

Andre Schurrle: "He is my favourite player of all time."

রুডি ভোলার: "মাইকেল বালাককে ছাড়া জার্মান দল চিন্তা করাও অসম্ভব।"

খুজলে এমন অনেক উক্তিই পাওয়া যাবে মাইকেল বালাক সম্পর্কে। খেলার ধরণ, ব্যক্তিত্ব, নেতৃত্ব গুণের সমন্বয়ে মাইকেল বালাক তার সময়ের অন্যতম সেরা ব্যাক্তিত্ব। আসলে ভাষা দিয়ে মাইকেল বালাকের মতো একজন ডেকোরেটেড ফুুুটবলারকে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। যারা তাকে খেলতে দেখেছে, তারাই জানে, সে কতোটা ডিস্ট্রাকটিভ প্লেয়ার ছিল। 

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন