নেইমার ট্রান্সফার ও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি

নেইমার ট্রান্সফার ও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি

মাত্রই গতকাল হয়ে গেল ফুটবল ইতিহাসের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ট্রান্সফার। ২২২ মিলিয়ন ইউরোর রেকর্ড ট্রান্সফার ফি দিয়ে পিএসজি তে চলে গেলেন বর্তমান সময়ের অন্যতম সেরা ফুটলার নেইমার। তার এই ট্রান্সফার নিয়ে আপাতদৃষ্টিতে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান হলেও উঠে এসেছে একটি নতুন বিষয়। আর তা হলো এই ট্রান্সফারের সাথে মধ্যপ্রাচ্যীয় রাজনীতি জড়িত রয়েছে কি না। এতে করে অনেক জল ঘোলা করে হওয়া এই ট্রান্সফারের জল আরো একটু যে ঘোলা হওয়ার বাকি তা আর বলার অবকাশ রাখে না।

প্যারিস সেইন্ট জার্মেইন ক্লাবের বর্তমান প্রেসিডেন্ট হলেন নাসের আল খেলাইফি। ২০১১ সালে কাতারের একটি কোম্পানি 'কাতার স্পোর্টস ইনভেস্টমেন্ট' কিনে নেয় ফ্রান্সের এই ক্লাবটিকে। আর কিনে নেওয়ার সাথে সাথেই তা হতে উঠে ফ্রান্সের সবচেয়ে ধনী ক্লাব। শুধু ফ্রান্সই না তা হয়ে উঠে পৃথিবীর ধনী ফুটবল ক্লাব গুলোর মাঝে একটা। আর এই কাতার স্পোর্টস ইনভেস্টমেন্টেরও মালিক হচ্ছেন নাসের আল খেলাইফি। অর্থাৎ বুঝাই যাচ্ছে নামে ফ্রান্স ভিত্তিক ক্লাব হলেও মালিক হয়ে উঠেছে কাতারের একজন। নেইমার ট্রান্সফারের সব হিসাব-নিকাশ করলে দেখা যাবে ট্রান্সফার ফি ২২২ মিলিয়ন এর সাথে বাকি সব মিলিয়ে খরচ হবে প্রায় ৫৩০ মিলিয়ন ইউরো এর মত। আর এর সবটুকু আসবে কাতার থেকে। অনেকের মতে, এই টাকা দিয়ে নেইমারকে নিয়ে আসার সাথে সাথে কাতার একটি ২২২ মিলিয়ন ইউরো এর স্টেটমেন্ট দিয়ে দিলো মধ্যপ্রাচ্যকে।

আসুন একটু ভিতরে যাই, জুনের ৫ তারিখ থেকে সৌদি আরব ও তার সহযোগী দেশগুলো মিলে কাতারের সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে রেখেছে। তাদের এই সম্পর্ক ছিন্ন করার পিছনে কারন হিসেবে তারা দেখিয়েছে কাতারের সাথে আর্ন্তজাতিক বিভিন্ন সন্ত্রাসী সংঘটনের সম্পর্ক এবং তাদের টাকা দিয়ে সহায়তা করা। এবং এই সম্পর্ক ছিন্ন করার ফলে কাতারের উপর বিশাল চাপ এসেছে যার কারনে তারা বিষয়টিকে শীতল করে আনার জন্যে বিভিন্ন জায়গাতে লবিং করে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে তারা আমেরিকার কাছ থেকে এফ-১৫ ফাইটার জেট কিনতে যাচ্ছে, ইতালি থেকে ৭টা যুদ্ধজাহাজও কিনার কথা রয়েছে। অর্থাৎ, খুব সহজেই অনুমেয় তাদের এই বন্দি দশা থেকে কাটিয়ে উঠার জন্যে আপ্রাণ চেষ্টাই চালাচ্ছে। এখন, নেইমারের এই ট্রান্সফার কাতারের জন্যে এইরকমই একটি বিষয় হিসেবে দেখছেন অনেকে। তারা এই বিশাল অংকের টাকার খরচ করে বিশ্বকে জানান দিতে চাচ্ছে যে তারা এখনো টিকে আছে। তারা বুঝিয়ে দিতে চাচ্ছে যে তাদের এই ক্রাইসিসের সময়ও তারা ট্রেইনের লাইন থেকে লাইনচুত্য হয়ে যায়নি।

ইংল্যান্ড এর ইউনিভার্সিটি অব সালফোর্ড এর স্পোর্ট ইন্টারপ্রাইজ বিভাগের অধ্যাপক সিমন চ্যাডওইকের মতে, “Qatar has not capitulated, it is fighting back -- and the Neymar signing is part of that. It’s a charm offensive, a soft power stance -- there’s something of international diplomacy in all of this. The last thing Saudi Arabia wants is people all over the world talking about Qatar”

তার কথাগুলো বিশ্লেষণ করলে বুঝা যায় যে কাতার যে ফাইটব্যাক করছে তারই একটা নমুনা হলো এই নেইমার সাইনিং। সেই সাথে সৌদিআরব যেখানে চায় না কাতারের কথা উঠে আসুক বিশ্ব গণমাধ্যমে কিন্তু নেইমার ট্রান্সফার দিয়ে তারা জুন মাস থেকেই সেটা করতে সক্ষম হয়েছে। তাছাড়া খুব কম গ্লোবাল স্পোর্টসে এচিভমেন্ট নিয়েও কাতারের ২০২২ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের আয়োজন হওয়া নিয়েও অনেক প্রশ্ন রয়েছে। উঠেছে দূর্নীতির কথাও। সেই সাথে কাতারের ২০২২ সালের প্রস্তুতি নিয়ে এবং সেখানকার শ্রমিকদের সাথে ব্যবহার তথা তাদের থাকা ও কাজ করার পরিবেশ নিয়েও রয়েছে অনেক সমালোচনা। অনেকের মতে নেইমারের এই ট্রান্সফার হয়ত ব্যাকফায়ার করতে পারে পিএসজি তথা কাতারের ক্ষেত্রে। স্পোর্টস্কোপ মার্কেটিং কোম্পানির প্রেসিডেন্ট মার্ক গ্যানিসের মতে, যদি নেইমারের এই ট্রান্সফারের ফলে ফ্রেঞ্চ লীগের টিকেটের দাম বাড়ানো হয় অথবা দেখা যায় কম্পিটিশন কমে যাচ্ছে লীগে তাহলে অন্যান্য দলের সমর্থকরা হয়ত এটা মেনে নাও নিতে পারেন। ওই দিকে পিএসজির এই বিশাল পরিমাণ টাকার যোগানের কথা বলা হলে তারা উত্তরে বলে যে টি-শার্ট বিক্রি বেড়ে যায় নেইমার সাইন করানোর খবরে এবং তা থেকেও তারা কিছু টাকা যোগাড় করেছে, যার সত্যতা এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

এখন দেখার বিষয় বিশাল অংকের টাকা দিয়ে নেইমারের এই সাইনিং পিএসজি ও কাতারি শেখেরা ঠিক কিভাবে আয়ত্তে নিয়ে আসেন।

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন