এসি মিলানঃ সিজন প্রিভিউ(২০১৭-১৮)

এসি মিলানঃ সিজন প্রিভিউ(২০১৭-১৮)

এই ট্রান্সফার উইন্ডোতে মিলানের সরব কর্ম-কাণ্ড অনেক ফুটবল পাগল কেই চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। আগের ৪ সিজনে যেখানে তাদের সর্বোসাকুল্যে খরচ ৬ মিলিওন সেখানে এই উইন্ডোতেই তারা খরচ করে ফেলেছে প্রায় ২১৭ মিলিওনের মত এবং এখানেই না থেমে ক্লাবের কর্মকর্তারা আরও খরচ করার প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন। গত ৫ বছরের দুঃস্বপ্ন ভুলে টাই মিলান সমর্থকরা নতুন দিনের আশায় বশে আছেন যদি এই সিজন থেকে ভাল কিছু হয়। আর সেই উদ্দেশেই একেবারে দলের খোলনলচেই পাল্টে ফেলা হয়েছে। কারণ এই সময়ে অন্তত শীর্ষ পর্যায়ে লড়াই করার মত মানের কোন দল মিলানের হাতে ছিলোনা। দলের প্রতিটা জায়গায়ই ছিল নিম্ন মানের প্লেয়ার যা দিয়ে ইউরোপ তো দুরের কথা সিরি-এতেই ভরাডুবি হচ্ছিল। ফলে সমর্থকরা ক্লাবের মালিক সিল্ভিও বারলুস্কোনির উপর একেবারেই ভরসা হারিয়ে ফেলেছিল। তিনিও ক্লাবকে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা দিতে ব্যার্থ হয়ে চীনা মালিকের কাছে ক্লাব বিক্রি করে দেন। আর নতুন মালিক এসেই ক্লাবের একেবারে গোঁড়া থেকে ধরে একেবারে সব কিছু পরিবর্তন করে ফেলেন। নিয়ে আসেন ইউরোপের অন্যতম সেরা দুই এক্সিকিউটিভ মার্কো ফাসোনে আর ম্যাসিমিলিয়ানো মিরাবেল্লি কে সমর্থকরা যাদেরকে একসাথে "ফাসোবেল্লি" বলে থাকেন। জার ফলশ্রুতিতেই এই সিজনের ট্রান্সফার মার্কেটের অন্যতম সক্রিয় ও সফল ক্লাব এসি মিলান। 

এখন পর্যন্ত ২১৭ মিলিওন খরচ করলেও বলতে হবে মিলান খুব ইকোনোমিক ছিল প্রতিটি ট্রান্সফারের ক্ষেত্রে। ইউরোপের অনেক নামকরা প্লেয়ারকে সাইন করালেও কাউকেই খুব বেশি দাম দিয়ে কিনতে হয় নি। ক্লাবের রিবিল্ডিং প্রজেক্টের শুরুতে মালিক পক্ষ শুধু দেদারছে টাকা খরচ করবে এমনটা কখনোই নতুন মালিক পক্ষ রোজোনেরি লাক্স স্পোর্টস ইনভেস্টমেন্ট গ্রুপের মূলনীতিতে ছিলোনা। বরং সেরা প্লেয়ার কিন্তু হাইপ এবং দাম কম এরকম প্লেয়ার দিয়ে ইকোনোমিক খরচেই একটি ব্যালেন্সড কিন্তু ধীরে ধীরে পুরনো রুপে ফেরার পরিকল্পনা নিয়েই মাঠে নেমেছে মিলান কর্তৃপক্ষ। যার ফলে ২১৭ মিলিওনের প্রায় ১১ জন প্লেয়ার সাইন করানো হয়েছে যাদের গড় মূল্য হয়েছে প্রায় ২০ মিলিওন বর্তমান বাজারের বিবেচনায় যা খুবই কম। সব সাইনিঙ্গের ক্ষেত্রেই এমন প্লেয়ার বাছাই করা হয়েছে যাদের দাম কম হবে বা নেগোসিয়েশনে কমানো যাবে। মুলত ক্লাব কেনার আগে থেকেই নতুন     কর্তৃপক্ষ প্লেয়ার দের দিকে চোখ রেখেছিলো যে কাকে কাকে এই রিবিল্ডিঙ্গের অংশ করা হবে। ফলে এই সহজলভ্যতা। 

আগের থেকেই ঠিক করা ছিল যে টিমের কোন জায়গা গুলো সবচে দুর্বল আর কোন জায়গায় সবার আগে নতুন সাইনিং দরকার। এবং কোঁচের পরিকল্পনার সাথে কোন ধরণের প্লেয়ার সবচে ভাল সিঙ্ক্রোনাইযড হতে পারবে। যার ফলে এখনও সিজন শুরু না হলেও অধিকাংশ সাইনিং এর ক্ষেত্রেই খুব বেশি সমালোচনার সুযোগ ছিলনা। আর সবচে বড় ব্যাপার যেটা ছিল যে আগের সিজনের কোচ ভিন্সেনযো মন্তেয়ার উপর এই সিজনেও ভরসা রাখা। এবং তা করার জন্য তাকে যথেষ্ট সময় দেওয়া যা তাকে আরও আত্মবিশ্বাসের সাথে একটি পছন্দসই, ব্যালেন্সড এবং পরিপূর্ণ স্কোয়াড তৈরি করতে সাহায্য করবে। যা একটি দলের শীর্ষ পর্যায়ে খেলার জন্য খুবই জরুরী।   

এখন দেখা যাক এই সিজনের সাইনিং গুলো। ডিফেন্সে আনা হয়েছে ভিয়ারিয়ালের সেন্টার ব্যাক মুসাক্কিও। আগে থেকেই ছিলেন রোমানিওলি, গুস্তাভো গোমেয। সফল একটি সিজন শেষ করে লোণ থেকে ফেরত এসেছেন স্টেফান সিমিচ। এবং সবচে গুরুত্তপূর্ণ যে সাইনিংটী ছিল যা ডিফেন্সকে পরিপূর্ণতা দান করেছে সেটা হল জুভেন্টাসের বনুচ্চিকে সাইন করানো। এই সাইংটা অনেকটাই আচমকা হয়ে এসেছে ফ্যানদের কাছে কারণ রাইভাল দল থেকে প্লেয়ার সাইন করানো খুবই কঠিন এবং ইতালিতে প্রায় অসম্ভব যেখানে দুটি ক্লাবের রিবিল্ডিং প্রসেস চলছে। কোচের সাথে অনেক দিন থেকেই মনোমালিন্য এর ফসল বনুচ্চির এই ক্লাব ত্যাগের সিদ্ধান্ত এবং সাথে সাথেই মিলানের সুযোগ লুফে নেয়া। এর কারণ হিসেবে অবশ্য বলা যায় যে ইতালি ত্যাগ করতে না চাওয়াই এই অসম্ভব ট্রান্সফারটি হতে সাহায্য করেছে। কেননা বনুচ্চির প্রতি ইংল্যান্ড এর অনেক ক্লাবি অনেক আগ্রহী ছিল এবং মিলান থেকে অনেক বেশি অফার করেছে। কিন্তু সবচে বড় দাওটা মিলানই মেরেছে। দুই উইঙ্গে কেনা হয়েছে গত সিজনে ইউরোপের ডিফেন্ডারদের মধ্যে সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং এসিস্টদাতা আন্দ্রেয়া কন্তিকে আর জার্মান লিগের বেস্ট লেফট ব্যাক রিকারডো রড্রিগেযকে। ফলে মিলানের উইং আগে থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী আর ফ্লুইড হবে তা নিঃসন্দেহে বলাই যায়। ব্যাক আপ হিসেবে সাবেক ক্যাপ্টেন আবাতে আর অভিজ্ঞ সৈনিক আন্তোনেল্লি তো আছেই। ফলে দীর্ঘদিনের মাথা ব্যাথার কারণ মিলান ডিফেন্স নিয়ে দুশ্চিন্তা অনেকটাই কমেছে বলা যায়।    মিলানের নতুন শুরুকে নেতৃত্ব দিতে পারবেন বনুচ্চি?

মিডফিল্ডেও অনেক দিন থেকেই মিলানে বড় কোন প্লেয়ার সাইনিং হচ্ছিলনা। যার কারনেই কিনা ট্রান্সফার মার্কেট শুরু হওয়ার আগেই কেনা হয় সিরি-এর গত সিজনের সেরা আন্ডার-২১ মিডফিল্ডার ফ্রাঙ্ক কেসিকে যার উপর চেলসির অনেক আগে থেকেই আগ্রহ ছিল। কিন্তু প্লেয়ার মিলানে আসতে চাওয়ায় অনেক সহজেই মিলান ট্রান্সফারটিতে চমক দেখায়। ডীএম পজিশন শক্তিশালী করার জন্য অনেক জল্পনা-কল্পনার পর যোগ দেন লাতসিও ক্যাপ্টেন লুকাস বিলিয়া। অনেক দিন ধরেই মন্তেয়া এই পজিশনে একজন প্রুভেন প্লেয়ার চেয়ে আসছিলেন ম্যানেজমেন্টের কাছে যার ফলে সিরি-এর গত সিজনের সেরা ডিএমের এসি মিলানে আসা। মিলানের আরেকটি চমক বলা যায় জার্মান লিগের ফ্রিকিক মাস্টার বলে খ্যাত হাকান চালহানুলুকে সাইন করানো। অনেকের মতেই বর্তমানে লং ডিস্টেন্স শট, সেট পিস, ডেড বল আর ফ্রিকিকে যিনি বিশ্বসেরা। তাই ৬ মাস না খেলার পরেও যার ফ্রিকিকে গোল সংখ্যা লিওনেল মেসির চেয়ে একটি কম। আগে থেকেই দলে ছিলেন সবেধন নীলমণি হয়ে থাকা বোনাভেঞ্চুরা যার উপর ভর করেই মিলান অনেক দুর্বল দল নিয়েও শীর্ষ দশ থেকে একেবারে ছিটকে যায় নি। আর আছেন গত সিজনের মিলানের আবিস্কার লোকাতেল্লি যিনি এই সিজনে তার প্রতিভার সবটুকু বিকাশ করাতে একেবারে তৈরি। যদিও দলে এখন পর্যন্ত একজন পারফেক্ট সেন্ট্রাল মিড বা বক্স টু বক্স মিডফিল্ডারের অভাব যার কারনে বায়ার্নে জায়গা পাকা করতে না পারা রেনাতো সাঞ্চেসের উপর মিলানের চোখ। একেবারে কনফার্ম না হলেও সব ধরণের খবরাখবর থেকে এটুকু অনুমান করা যায় ব্যাতিক্রম কিছু না ঘটলে রেনাতো মিলানে আসছেন। পরতুগালের এই তরুন মিডফিল্ডারের উপর ম্যানেজমেন্টের আগ্রহ একেবারে প্রথম থেকেই। আর এই সিজনের চমক যানেয়াতোও এই সেন্ট্রাল মিডফিল্ডের চ্যালেঞ্জ নিতে সবটুকু ঢেলে দিতে প্রস্তুত। আর পুরনো যোদ্ধা মন্টীলিভো তো আছেনই নিজের শেষের সময় কে স্মরণীয় করে রাখার জন্য। ফলে বলা যায় একেবারে সর্বোশ্রেষ্ঠ মিডফিল্ড না হলেও ম্যানেজমেন্টের ইচ্ছানুযায়ী একটি ব্যালেন্সড মিডফিল্ড মিলানের হাতে এখন আছে যা দিয়ে ইউরোপায় লড়াই করার রসদ কোচ মন্তেয়া পাবে।   

এখন পর্যন্ত আক্রমণভাগই সম্পূর্ণ পরিপূর্ণতা লাভ করতে পারেনি। স্ট্রাইকার পজিশনের জন্য আনা হয়েছে গত দুই সিজন ধরে পর্তুগালের বয়সভিত্তিক দল আর পোরতোর হয়ে গোল করে যাওয়া আন্দ্রে সিল্ভাকে। যার সম্পর্কে স্বয়ং ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো প্রশংসার বাণী ছড়িয়েছেন। রাইট উইঙ্গে আছেন গত সিজন থেকে মিলানের আক্রমণ ভাগের অন্যতম ভরসা সুসো। ইঞ্জুরিতে না পরলে যিনি গত সিজনেই মিলানকে প্রায় অর্ধেক একাই টেনেছেন। লেফট উইঙ্গে দেলুফিউ ক্লাব ছাড়ায় উইং এটাকের একমাত্র সদস্য হিসেবে যিনি মিলানে আছেন। আর সেই সাথেও মিলানের লেফট উইং ঢাল-তলোয়ার বিহীন হয়ে গেছে। ফলে ম্যানেজমেন্টের এখন মূল লক্ষ্য একজন পারফেক্ট লেফট উইঙ্গার নিয়ে আসা। এই পজিশনের জন্য মিলান ম্যানেজমেন্টের রাডারে আছেন সিমোন লো ফাসো, আয়াক্সের এল গাযি, লিপজিগের এমিল ফোরসবারগ আর ব্রাযিলিয়ান রিচারলিসন। তবে এখনও কারো জন্যেই কোন কংক্রিট সিদ্ধান্তে ম্যানেজমেন্ট পৌছুতে পারেনি। ফলে এখনই এই পজিশনে কে আসছেন তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছেনা। আপাতত মন্তেয়া লেফট উইঙ্গে বারবার ব্যার্থ হওয়া নিয়াঙ্গের উপরই আস্থা রাখতে চাইছেন নতুন কোন লেফট উইঙ্গার সাইনিঙ্গের আগ পর্যন্ত। যদিও চূড়ান্ত বাজে পারফর্মেন্সের কারনে ইতোমধ্যেই সমর্থকদের কাছে চক্ষুশূলে পরিনত হয়েছেন তিনি। যদিও নতুন কোন লেফট উইংগার না আসলে তার উপর ভরসা করা ছাড়া সমর্থকদের আর কিছুই করার থাকবেনা। যদিও কিছুদিন ধরেই মন্তেয়া নতুন সিজনের জন্য নিয়াঙ্গের উপর ভরসা রাখতে চাইছেন। হয়ত তিনি বুঝতে পারছেন তরুন এই ফ্রেঞ্চের এখনও ক্লাবকে দেওয়ার অনেক কিছুই আছে। হয়ত কোন অজানা কারনে নিজের প্রতিভার সবটুকু সদব্যাবহার তিনি করতে পারেননি। আশা করা যায় মন্তেয়া সামনের সিজনে সমর্থকদের সামনে নতুন কোন নিয়াংকে উপস্থিত করবেন। তবে ব্যাকআপ স্ট্রাইকার হিসেবে এই সিজনে চমক দেখানো মিলান প্রিমাভেরা থেকে উঠে আসা প্যাট্রিক কাত্রোনে কে নিয়ে অনেকেই আশাবাদী। প্রিমাভেরায় আর প্রিসিজনে তার দুর্দান্ত পারফরমেন্স সমর্থকদের সিল্ভার সাথে আরেকটি ইনযাঘি-শেভচেঙ্কো জুটি দেখার আশা দেখাচ্ছে। যদিও সময়ই বলে দেবে এই আশা কতটা বাস্তবে রুপান্তরিত হয়। আর ইংল্যান্ডে ব্যার্থ হওয়া ফ্যাবিও বোরিনিকেও মিলান দলে এনেছে অনেকটা বাজি খেলার মতই। অনেক কম দামে ট্রান্সফারটি সম্পন্ন হওয়ায় ব্যার্থ হলে ও আফসোস অনেক কম থাকবে। আর যেহেতু ইতালিতে আলো ছড়িয়েই ইংল্যান্ডে গিয়েছিলেন, অনেকে আশা করতেই পারেন যে ইতালিতে ফেরত এসে আবার তার পুরনো পারফর্মেন্স লাল-কালো জার্সিতে ফেরত আসে কিনা। আসলে তা হবে বিশাল এক বাজি জেতার মতই আনন্দের ব্যাপার। আর এই বাজিতে আসলে বোরিনি আর মিলানের কারোরই কোন লস নেই। আর মিলান ম্যানেজমেন্ট এখনও স্ট্রাইকার পজিশনের জন্য একজন "বিগনেম" খুজে বেড়াচ্ছেন রিবিল্ডিং প্রজেক্ট আর সমর্থকদের দেয়া প্রতিজ্ঞা অনুসারে। আর এর জন্য দীর্ঘদিন ধরেই নেগোসিয়েশন চালানো হচ্ছে ডরট্মুন্ডের অবামেয়াং আর তুরিনোর বেলত্তির জন্য। যদিও তারা নিশ্চিত ভাবে আসবেই একথা এখন পর্যন্ত বলা যাচ্ছেনা। কারণ তাদের অস্বাভাবিক দাম। ক্লাবের নতুন মালিক পক্ষের "এফেক্টীভ, এফিসিয়েন্ট এন্ড ইকনোমিক সাইনিং"  মূলনীতির সাথে যা একেবারেই যায় না। 

এখন আসা যাক কোচের পরের সিজনের কৌশল কি হতে পারে তা নিয়ে। মন্তেয়ার প্রিয় ফরমেশন ৪-৩-৩। কিন্তু ইতালিয়ান হওয়ায় ৩-৫-২ আর ৪-১-২-১-২(ডায়মন্ড) ফরমেশনের উপরও তার নির্ভরতা আছে। তার দলের লাইন আপ হতে পারে এরকম:

এই সিজনেও আগের ফরমেশন থেকে সরার সম্ভাবনা কমই। আশা করা যায় লেফট উইঙ্গে নিয়াং থেকে কোচ সেরাটাই বের করে আনবে যেটা দলের জন্য খুবই দরকারই। পর্তুগালের ফর্ম সিল্ভা আশা করা যায় মিলানেও টেনে আনবে কারণ মন্তেয়া যেরকমটা চায় সিল্ভা প্রায় সে রকমই স্ট্রাইকার যিনি টার্গেট ম্যান হিসবে একেবারে উপরে বসে থাকে না। নিচ থেকে খেলা তৈরি করায় সিল্ভা অসাধারণ যা তার পাসিং আর এসিস্ট এর স্ট্যাট দেখলেই বোঝা যায়। রাইট উইঙ্গে বরাবরের মতই সুসো আছেনই যার করা ক্রস গুলো বেশির ভাগই গত সিজনে ভাল স্ট্রাইকারের অভাবে নষ্ট হয়েছে। তবে সিল্ভা এরিয়ালি ভাল হওয়ায় ধরা যায় এই সিজনে ডেড বল থেকে প্রচুর গোল আসবে। প্রিসিজনেও মন্তেয়ার খেলার ধরন থেকে যা কিছুটা আঁচ করা যায়। মিডে ডেস্ট্রয়ার পজিশনে থাকবেন বিলিয়া। এই পজিশনে তিনি গত কয়েক সিজন ধরেই সিরি-এতে সেরা। বল হোল্ড করা আর ডিস্ট্রিবিউশন দুটোতেই তিনে খুবই দুর্দান্ত। বিশেষ করে অপনেন্ট এর প্লে ব্রেক আপ করে দ্রুত বল কাউন্টারে প্লেস করায় তিনি সিদ্ধহস্ত যেটা মন্তেয়ার প্রিয় কৌশলের একটি। বক্স টু বক্স হিসেবে থাকছেন ইঞ্জিন কেসি ওয়ার্করেটের কারনে যিনি ইতিমদ্ধেই সিরিএ তে বিখ্যাত। দ্রুত ওঠা-নামার কারনে তখন দলের খেলায় এক ধরণের সামঞ্জস্যতা থাকে যেটা আচমকা বল হারানোর ফলে গোল খাওয়া থেকে বাচায়। ফলে এই রোলে তিনি একদমই খাপে খাপ মিলে জান মন্তেয়ার সাথে। আবার মিডফিল্ডে পজিশন ব্যাজ ফুটবল খেললে জায়গা হতে পারে রেনাতো সাঞ্চেসের। যিনি মিডফিল্ডে এডভান্স রোলে অনেক ভাল এবং বোনাভেঞ্চুরার সাথে মিলে একটি দুর্দান্ত পজিশন বেজড একটি মিডফিল্ড দিতে পারেন। এর ফলে মিলানের খেলায় একটা বৈচিত্র্য আসবে যেটা ট্যাকটিক্স নিয়ে পরিক্ষা-নিরীক্ষা করতে আগ্রহী মন্তেয়াকে ম্যাচ বুঝে কৌশল ঠিক করায় অনেক সুবিধা এনে দিবে যেটা সমশক্তি সম্পন্ন দলগুলোর বিপক্ষে নকআউট ম্যাচে কার্যকরী হবে। ইতিমধ্যে মন্তেয়া নিজেকে বিগম্যাচ স্পেশালিষ্ট হিসেবেও সমর্থদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন তুলনামূলক কম শক্তির দল নিয়েও ম্যাচ জেতার ক্ষমতা দেখানোয়। 

ডিফেন্সে কন্তি আর রড্রিগেযের মত উইং ব্যাক থাকায় মিলানের উইং এটাক আগের চেয়ে এই সিজনে ভাল হবে তা বলাই যায়। বিশেষ করে যখন প্লে-ব্রেকিং ট্যাকটিক্স ব্যাবহার করেন তখন। কন্তির স্পিড আর রড্রিগেযের ক্রস করার ক্ষমতা দলের ব্যাক আপ ট্যাক্টীক্স তৈরি রাখায় অনেক সাহায্য করবে। আবার অফ দা বলে ট্র্যাক ব্যাক করায়ও ডিফেন্স নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকছেনা যেহেতু কেউই মেক-শিফট উইং ব্যাক না। তবে সেক্ষেত্রে ডেস্ট্রয়ার আর সিএম মিড একটু নিচে নেমে যাবে শিল্ডিঙ্গের জন্য। আর নাম্বার ১০ কে সাথে নিয়ে দুই উইং ব্যাক সহ একটা ফ্রন্টিয়ার মিডফিল্ড বল সাপ্লাই এর কাজটা করবে আর ফ্রন্টের তিন জন টার্গেট ম্যান হয়ে যায়। তবে বেশির ভাগ সময়ই সুসো টার্গেট ম্যান এর চেয়ে বল সাপ্লাই এর মদ্ধেই বেশি থাকে। ফলে বল সাপ্লায়ার ৪ জন আর বক্সে দুই জন। এসময় সুসো কিছুটা কাট-ইন করে ভেতরে ঢুকে আর ডান পাশে দিয়ে উইং ব্যাক একেবারে টিপিক্যাল রাইট উইঙ্গারের মত সরাসরি ঢুকে যায় যার ফলে বল দেয়ার জন্য সুসোর সামনে দুইটা জায়গা খুলে যায়।একি কাজটা অবশ্য বামে হয় না কারণ নিয়াং কাট-ইন না করে বক্সে চলে আসে বেশির ভাগ সময়। ফলে বাম পাশ থেকে থ্রু-বল বা কাট ইন্সাইড ক্রসের চেয়ে বক্সের কোনা থেকে ডিরেক্ট দিফেন্সের ভিতরে বল যায় বেশি। আর রড্রিগেযও এই কাজে বেশি পারদর্শী। যদিও হয়ত সুসোর মত উইঙ্গার থাকলে বাম পাশ দিয়েও অনেক ফ্লুইড  এটাক হত যেটা শক্ত ডিফেন্স ভাঙ্গার জন্য কার্যকরী। সেটা না হওয়ায় মিলানের আক্রমনের বাম পাশটা ডান পাসের তুলনায় কিছুটা নিচে নেমে থাকবে। এবং বল স্প্রে এর বদলে বক্সের বাম কোনা থেকে সেটপিস আর ক্রমাগত লেফট ফুটেড গ্রামাটিক্যাল ক্রসই বেশি যাবে। এক্ষেত্রে একটাই সমাধান হতে পারে। সেটা হলে বাম পাশে একজন ক্রিয়েটিভ আর স্পিডী লেফট উইঙ্গার এর সংযোজন।     

আর বনুচ্চি আশায় ডিফেন্সে অভিজ্ঞতা যুক্ত হওয়ায় আগের সিজনের ভুল গুলো এবার না দেখা যাবার সম্ভাবনা প্রবল। গত সিজনে মিলান এরিয়াল এটাক থেকে অনেক গোল খেয়েছে। আর বনুচ্চি বর্তমানে পৃথিবীর অন্যতম সেরা সেন্টার ব্যাক যার এরিয়াল ডিফেন্সও টিপিক্যাল ইতালিয়ান ডিফেন্ডারদের মতই। আর তার অভিজ্ঞতা আর নেতৃত্বগুন ডিফেন্সে অবশ্যই অনেক স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে আসবে যা নতুন ডিফেন্ডারদের জন্য খুবই জরুরী।  ফলে মন্তেয়াকে এই দিকটা নিয়ে না ভাবলেও চলবে।  আর ব্যাক আপ হিসেবেও গোমেয আর সিমিচদের পারফর্মেন্সও আশা জাগানিয়া। 

আর দল বুঝে মন্তেয়া মাঝে-মাঝেই ৩-৫-২ বা ৪-৩-১-২ ফরমেশনে চলে যান। সেক্ষেত্রে আগে উল্লখিত ডিফেন্সিভ উইকনেস গুলো আর থাকবেনা। সাথে দুই স্ট্রাইকার থাকায় খেলা অনেক বেশি ডীরেক্ট বল সাপ্লাই আর রাশ-অন নির্ভর হয়ে যাবে। যেটা কিছুটা প্রেডিক্ট্যাবল। তবে অ্যাডভান্টেজে থাকলে বা মিডে অপনেন্ট ডোমিন্যান্ট করলে এ কৌশল অনেক বেশি ফ্রূটফুল। 

আর উইঙ্গারলেস খেলা দিতে চাইলে মিলানের বিখ্যাত ৪-৩-১-২(ডায়মন্ড ফরমেশনেও) চলে যেতে পারেন। এটা তখন করা হয় যখন কিছুটা দলকে ন্যারো পজিশনে খেলাতে হয় বা মিডে ক্রাঊড কনট্রোল বেশি করতে হয় বা অপনেন্ট এর উইং ডিফেন্স খুবই দুর্বল। কিছুটা আল্ট্রা এটাকিং মুডে থাকলে তখন উইং ব্যাকরা ক্রমাগত ওভারল্যাপ করতে পারেন যখন ট্র্যাকব্যাক করার প্রয়োজন দরকার হয় না বা ৪ মিডের দুইজন পিভোটীং করে ডিফেন্স শিল্ডীং এর কাজটা করে। ফলে তখন আর উইং ব্যাক দের নিচে নামার বা ডিফেন্সিভ ডিউটি কম থাকে। আর ৪ মিডফিল্ডারের জন্য মিডফিল্ডে ট্রাঞ্জিশনের কাজটাও খুব ভালভাবে হয় যেটা অপনেন্ট এর মিডের ক্রাউড কন্ট্রোল, বল পজেশন আর সামনে বল সাপ্লাই এই তিনটা কাজই সমানতালে করতে পারে। আর বক্সে দুই স্ট্রাইকার থাকায় বল দেওয়ার অপশন আর এটাক আনপ্রেডিক্ট্যাবল করার অপশন দুইই বেড়ে যায়। গত সিজনের মাদ্রিদ ঠিক এই ট্যাকটীক্সেই অন্য দলগুলোকে ধরাশায়ী করেছে। 

 সবশেষে বলা যায় গতসিজনের দুঃস্বপ্ন ভুলে মিলানের সামনে আবার সব কিছু নতুন করে শুরু করার পালা। আর মাত্র কয়েকটা সংযোজনই দলকে লিগে ভাল অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য যথেষ্ট। আর ম্যানেজমেন্টও সেখানে সম্ভাব্য সব কিছুই করে যাচ্ছে। এখন সমর্থকদের শুধু একটাই চাওয়া কোচ যাতে নিজের দর্শন প্লেয়ারদের মাঝে ছড়িয়ে দিয়ে দলকে একতাবদ্ধ আর স্ট্যাবল রেখে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য এনে দিতে পারে। যার জন্য এখন পর্যন্ত মিলান  যত রকম পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব তার সবই করার চেষ্টা করে যাচ্ছে ট্রান্সফার মার্কেটে। তারা সে কাজটিই করছে যা তাদের জন্য এই মুহূর্তে প্রয়োজন।তাই রোজোনেরিদের নিয়ে সমর্থকরা খুব বেশি আশা করলে দোষ দেয়া যাবেনা। যদিও এখনও পা মাটিতে রাখাই ভাল কারণ লিগের অন্যান্য দলও অনেক ভালও দল গড়েছে আর আর ইউরোপও এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি কম্পিটিটিভ। তবে সব কিছু ঠিকঠাক ভাবে চললে কয়েক সিজনের মধ্যেই মিলানের রাজকীয় প্রত্যাবর্তন ঘটবে। এই আশায়ই ফুটবল প্রেমীরা দিন গুনছেন এখন পর্যন্ত। তার আগ পর্যন্ত মিলানকে শুভকামনা। 

 

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন