ফুটবল ট্যাক্টিক্সঃ 'কাতানাচ্চিও'কে নিয়ে একটু কাটাছেড়া

ফুটবল ট্যাক্টিক্সঃ 'কাতানাচ্চিও'কে নিয়ে একটু কাটাছেড়া

ফুটবল, শত বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য মেশানো একটা খেলা। ইন এভ্রি ডিকেড টিম গুলা গ্লোরি, সাক্সেস এর জন্য আমাদের উপহার দিয়েছে বেশ কিছু জেম। বেশ কিছু অসাধারণ ট্যাক্টিস। টোটাল ফুটবল, কাউন্টার এটাক ফুটবল, তিকিতাকা, এন্টি ফুটবল প্রত্যেক টা ট্যাক্টিস ই অনেক এনালাইসিস এর ফসল। অনেক চিন্তাভাবনা, পরিশ্রম এর ফল। হালের ট্যাক্টিস গুলার ভিড়ে কিছুটা হারিয়ে গেছে একটা অসাধারণ ট্যাক্টিকাল ভিউ। যেটা ফুটবল এ বিপ্লব এনে দিয়েছিলো। ফুটবলের জেনারেল থট, পজিশনাল সেন্স কে নাড়িয়ে দিয়েছিলো। নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছিলো ফুটবল নিয়ে মর্ডান ফুটবল কিংবা ৭/৮ বছর আগের ইতালিয়ান ফুটবল। অথবা ২০০৪ এর গ্রিসের সাফল্য। কিংবা রিসেন্ট টাইমে কন্তের জুভেন্তাস এর ট্যাক্টিস। অথবা সেই বহুল সমালোচিত এন্টি ফুটবল। সব কিছুর পেছনে জড়িয়ে আছে অনেক বড় একটা গল্প। পুরা সিনেমাটিক গল্প। একটা ইনক্রিডিবল সিস্টেম এর সুচনা, উত্থান, বিশ্বজয় আর পতনের গল্প।

কাতানাচ্চিও খুব সম্ভবত ব্যাসিক ডিফেন্ডিং ফুটবলের সুচনা। সাথে আরো কিছু নিউ সিস্টেম ফুটবল এ ইন্সটলেশন হয় এই ট্যাক্টিস এর মাধ্যমে। শব্দটা ইতালিয়ান সম্ভবত। একে the chain ও ডাকা হয়। তবে কাতানাচ্চিও এর আসল অর্থ ডোর বেল্ট। এর গল্পটা অনেক পুরান। সেই ১৯৩০ কিংবা তার আগের কথা। সুইস কোচ কার্ল রাপান এর মুল ট্যাক্টিস ছিলো WM শেপড। তো তার এই ট্যাক্টিস এ তিনি একটা সমস্যা দেখতে পান। প্রায় ই তার মিডফিল্ড ডিফেন্স লাইন ফরোয়ার্ড রা পেনিট্রেট করছে।

                                   WM ফর্মেশন

অনেক ভেবে তিনি ৪ লাইনের ডিফেনস থেকে একজন কে পিছে ঠেলে দেন। যার যায়গা ডিফেন্স লাইন আর কিপার এর মাঝখানে। পজিশন টার নাম হয় লিবেরো যা আমরা সুইপার নামে চিনি। কার্ল রাপান কতটা সফল ছিলেন সে আলোচোনায় যাবোনা। তবে আরেকজন এর কথা না বললেই নয়। টিয়েস্তিনা কোচ নেরেও রক্কো। সুইস এই ট্যাক্টিস কে ইতালি তে নিয়ে আসেন এই ভদ্র লোক। আন্ডার ডগ টিম কে ইতালিয়ান সেরি আতে দ্বিতীয় বানান। ভদ্রলোক সেবার বেশ আলাদা ট্যাক্টিস ইউস করেন। বেশিরভাগ সময়ে দেখা যায় যে তার ইউসুয়াল ফর্মেশন ১-৩-৩-৩। কখনো ১-৪-৩-২ বা ১-৪-৪-১। খেয়াল করে দেখুন। লিবেরো কে সব সময়ই ব্যবহার করেছেন তিনি। ট্যাক্টিস যাই হোক সফলতা আসলো। তবে ঘটনা এই পর্যন্ত হতে পারতো। কাতানাচ্চিও এর লিগ্যাসি এর গলায় দড়ি ওখানেই হতে পারতো। তবে গল্প শুরু হয় অন্যখানে।

৬০ এর দিকে ইন্টার এর কোচ তখন আর্জেন্টাইন হেলেনিও হেরেরা। ওর ইন্টারে দ্বায়িত্ব নেয়ার পরের সিজন গুলাতে ইন্টার অনেক গোল করতো। বাট খেতো ও অনেক। একবার সিজন শেষে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল আসলোনা। বেকে বসলো ম্যানেজমেন্ট। স্যাক এর খরগ বেচারা হেরেরা গায়ে। এই সময় রক্কো এর ট্যাক্টিসই বেছে নিলেন হেরেরা তবে কাতানাচ্চিও এর আসল গল্প এখানেই শুরু। ইন্টার এর স্বর্নযুগ এর শুরুটা ওভাবেই। এক কাতানাচ্চিও এর লাঠি তে ভড় করে দুটা ইউরোপিয়ান শিরোপা আর তিনটা লিগ। চারিদিকে আলোচোনা শুরু হলো এই ট্যাক্টিস নিয়ে।

                     

পয়সনের এন্টিডোট হয়, কিন্তু এই ট্যাক্টিস এর বিপরিত কি হবে? শত এনালাইসিস, শত মত। তবে সবাই এটাতে একমত হয় যে হ্যা এটা কাজের। একজন তো বলেই ফেলেছিলো

“The brutal defensive show on display, will repel all the romantics of the game, and will give rise to a devil."

 তো যা বলছিলাম। হালের ডিফেন্সিভ সব ট্যাক্টিস এর আব্বু কিন্ত এই কাতেনাচ্চিও । তবে ট্যাক্টিকাললি হেরেরা এর দর্শন টা কি ছিলো? আর কেমন ই বা ছিলো ইন্টার এর প্লেইং স্টাইল। কাতানাচ্চিও এর ব্যাসিক ছিলো সহজঃ 

১- লিবেরো ইউস করো

২- ম্যান টু ম্যান মার্কিং করো

৩- কুইক এটাক করো।

হেরেরার কথা ছিলো সহজ। থিংক কুইক, ডু কুইক। তিনি প্লেয়ার দের বলতেন প্রতিপক্ষের দিকে এটাকের জন্য বলে তিন টাচ ই যথেস্ট। কাতানাচ্চিও মুলত ডিফেন্সিভ কাউন্টার এটাক সিস্টেম। সিস্টেমের ব্যাসিক কম্পোনেন্ট থ্রি ম্যান ডিফেন্স লাইনের নিচে একজন সুইপার থাকবে। তার মানে ফোর ম্যান ডিফেন্স একচুয়ালি। এই সুইপার কি করতো? যদি ডিফেন্সের আগের লাইন বল হারায় সেটা রিকভার করতে হবে, স্ট্রাইকার থেকে বল কেড়ে নিতে হবে, প্রয়োজন এ ডাবল মার্ক করতে হবে এবং কাউন্টার এটাকের জন্য লং বল ডেলিভারি দিতে হবে। হেরেরার লিবেরো ছিলো পিচি। ইন্টার এর এই সপ্নীল সাফল্যের পেছনে এই লোকটার অবদান সম্ভবত সর্বোচ্চ ছিলো। সুয়ারেজ এর সাথে অসাধারন রসায়ন এর মাধ্যমে ইন্টার এর বেশিরভাগ এটাক এ সুইপার পালন করতো বেস্ট রোল। সুইপার এর উপরে তিন ডিফেন্ডার। এমনিতে ট্যাক্টিকাল ফর্ম এ এদের কাজ ম্যান মার্কিং এবং বল কেড়ে নেয়া। হেরেরার কাতানাচ্চিও তে ফ্রন্ট ডিফেন্ডার দের এই রোল এর সাথে অসাধারণ এক চেঞ্জ আনেন তিনি। লেফট ব্যাক ফাচেত্তিকে দিলেন এক নিউ রোল। সেই সময় ডিফেন্ডার রা কখনোই মিডল ক্রস করতো না। ফাচেত্তি এর অসাধারণ স্পিড,স্ট্যামিনার কথা ভেবে হেরেরা তাকে ফ্রি রোল দিলেন। জিনিস টা বাজিমাত করে। ওই সময় একজন ডিফেন্ডার হয়েও ৫০+ গোলের মালিক ছিলেন ফাচেত্তি। ইউসুয়ালি এই ট্যাক্টিস এর জন্য ১-৩-৪-২ ফরমেশন সব থেকে সুইটেবল। হেরেরার ট্যাক্টিস টা বলার আগে আমি ট্যাক্টিস নিয়ে নিজের কিছু জ্ঞান ঝারি আগে।

মিডফিল্ড এর ৪ জনের একজন অবশ্যই ডিপ লাইং প্লে মেকার থাকবে, রাইট লেফট দু পাশে দুজন থাকবে। প্রেসার অর মার্কার হিসেবে অথবা কুইক এটাকার। অল আউট ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার বা বক্স টু বক্স মিডফিল্ডার থাকা টা ও আবশ্যক অনেক টা। এগুলা তে নর্মাল সব ট্যাক্টিস এ ই থাকে। কাতানাচ্চিও এর বিশেষত্ব রিটার্নার নামক মিডফিল্ডার এই পজিশন এর কাজ প্রয়োজনে ট্রাক ব্যাক করে এসে বল রিকভার করা আবার কাউন্টার ফর্ম এ সাহায্য করা।রাইট মিডফিল্ড ইউসুয়ালি এ কাজে ইউসড হতো। কারন লেফট ফ্লাংক ছিলো হেরেরার মেইন সোর্স অফ এটাক। আর দুজন স্ট্রাইকার যারা বল পেয়ে কুইক গোল করার চেস্টা করবে।

আচ্ছা যাই হোক, গল্পের থেকে দুরে চলে আসছি। গল্পেই ফিরি। হেরেরার মিডফিল্ডের প্রান ছিলো সুয়ারেজ। তার রোল ডিপ লাইং প্লে মেকার। ট্যাগনিনকে ব্যবহার করা হতো অল আউট ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে। লেফট মিডে হেরেরা ব্যবহার করতেন পজিশন হোল্ডার আর মার্কার ফর্মে। অল আউট ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার এর কাজ মুলত প্রতিপক্ষের নাম্বার টেন কে আটকে দেয়া, তখনকার সময়ে নাম্বার টেন কে ট্রেস করতে পারলে অপসিশন এর ৫০ পারসেন্ট খেলা বিকল। সেই কাজটাই এই মিডফিল্ডার এর কাজ। আর অপসিশন স্ট্রাইকার দের মার্কিং এ ফুলব্যাক রা তো আছেই।

যেহেতু এই ট্যাক্টিস এ মিডফিল্ড এর যায়গা কমে যায়,অপসিশন ট্রাই করতো শর্ট পাস এ খেলা।শর্ট পাসিং এর জন্য যখন অপসিশন এর ডিফেন্ড ও মিড লাইন মুভেবল হতো সেই সুযোগ টা ই নিতো সুয়ারেজ আর পিচ্চি। লং বলের মাধ্যমে কাউন্টার এটাকের চান্স ক্রিয়েট করা হতো। ইউসুয়ালি হেরেরা রাইট ব্যাক, ডিপ লাইন প্লে মেকার আর অল আউট মিডফিল্ডার কে মার্কিং আর ইন্টারসেপশন এ ইউস করতেন। রাইট মিডফিল্ডার কে সব সময় রিটার্নার হিসেবে ইউস করতেন।
এই রিটার্নার ছিলো ডিফেন্সের নতুন শক্তি। এটাকিং অপসিশন কে পেছন দিয়ে আক্রমন করে বল রিকভারি সহজ করে দেয়া। আর রিটার্নার বোথ ফ্লাংক এ ট্রাক ব্যাক করতো। এতে লেফট ব্যাক (ফাচেত্তি) ইসিলি এটাক এ যেতে পারতো। এটাক এর মেইন সোর্স ছিলো লেফট ব্যাক, সুইপার এর লং পাস, সুয়ারেজ এর প্লে মেকিং আর নাম্বার টেন এর কাট ইন। লুইস সুয়ারেজ আর পিচি এর টার্গেট ম্যান ছিলো মাজ্জেলো। ইউসুয়ালি তার রোল ছিলো নাম্বার টেন বা সেকেন্ড স্ট্রাইকার। পিয়েরও টিপিকাল নাম্বার নাইন।

হেরেরা মুলত ইউরোপে আলোরন ফেলে দেন দুই ইউরোপিয়ান কাপ এ।ফাইনাল এ একবার বেনফিকা আর একবার রিয়াল মাদ্রিদ। ওই সময় টা তে দুইটাই সেরা দল। টিম স্ট্রেন্থ এ হারানো সম্ভব ছিলোনা। বেনিফিকায় তখন ইউসেবিও, মারিও কলুনা এবং এন্তোনিও সিমোয়েস। হেরেরার হাতে শুধু তার ট্যাক্টিকাল এবিলিটি। সেটাই কাজে লাগালেন। বেনিফিকার স্ট্রেন্থ ইউসেবিও এর বিল্ডাপ এই এটাক করলেন। মিড এ খুব অল্প স্পেস দিয়ে শর্ট পাসিং ব্লক করে দিলেন। অন্য দিকে নং এন্ড লব পাসে এটাক চালু রাখলেন। এক সময় গোল হয়েই গেলো। আর অনেক পসেশন হোল্ড করে ও পার্ফেক্ট এটাক বিল্ডাপ এর অভাবে হেরে বসলো বেনফিকা।
একই ভাবে রিয়াল মাদ্রিদ কে ও হারায় ইন্টার। লুইস সুয়ারেজ এর মার্কিং এ ডি স্টেফানো একেবারে অকেযো হয়ে যায়। আবারো ইউরোপ সেরা হয় ইন্টার।
ওই সময় অনেক সমালোচনা হলেও ট্যাক্টিস ডিসেবল করার সিস্টেম কেউ পাচ্ছিলো। অনেক টা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছিলো ইন্টার। বিশেষ করে কাপ ম্যাচ গুলাতে।
তারপর? তারপর পতনের শুরু।

এই ট্যাক্টিস এর এন্টিডোট কি ছিলো? মুলত হেরেরার সম্রাজ্য পুরেছিলো বা কিভাবে?

সেটার জন্য আরো দু পাতা লেখা দরকার। আরো মজার ইতিহাস। আরো কঠিন ট্যাক্টিকাল আলাপ।

কাতানাচ্চিও এর ফল ডাউন নিয়ে আরেকটা পার্ট লেখার ইচ্ছা আছে। সেখানেই বাকি জিনিস গুলা নিয়ে আলোচনা করা যাবে। 

                                                           

 

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন