ফাস্ট বোলিং-এ ডেঞ্জারাস বিউটি পর্ব-১

ফাস্ট বোলিং-এ ডেঞ্জারাস বিউটি পর্ব-১

এইখানে ফাস্ট বোলিং এর নিতান্ত বেসিক লেভেল নিয়ে কিছুটা কথা বলব। দুই পর্বের এই লেখার প্রথম পার্টে স্বাগতম।

ব্যাটসম্যান পপিং ক্রিজে দাঁড়িয়ে আছেন,অপর প্রান্তে লং একটা রান আপ নিয়ে একজন বোলার এগিয়ে আসছেন, প্রায় ১৪০ কিমি/ঘন্টা বেগে একটা বল, বলটা বাইরের দিকে যাচ্ছে দেখে ব্যাটসম্যান ছেড়ে দিলেন।পরের বার আবারও অফ স্টাম্পের বাইরের বল,ব্যাটসম্যান বলটাকে যেতে দিলেন। এবার একটা চকিত বাউন্সার, ব্যাটসম্যানের ক্যালকুলেশন সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেল। তারপর আবারও অফ স্টাম্পের বাইরের বল,ছেড়ে দিলেন,বোল্ড! না জানি কতবার আমরা ক্রিকেটের ২২ গজের ভিতরে এই দৃশ্য দেখেছি, দেখে চলেছি, ভবিষ্যতেও দেখব আশাকরি।

ফাস্ট বোলিং একটা আর্ট, একটা রুথলেস আর্ট। আজকে একটু এই আর্টের ভিতরে ঢোকা যাক। ফাস্ট বোলিং বা পেস বোলিং এর ফার্স্ট এন্ড ফরমোস্ট থিং হলো গতি। গতি না থাকলে আর যাই হোক ফাস্ট বোলার শব্দটা হজম করা বেশ দুরূহ। গতির সাপেক্ষে ক্রিকেট এনালিস্টরা ফাস্ট বোলিংকে মোটামুটি ৪ ভাবে ক্যাটাগোরাইজ করে থাকেনঃ

ফাস্ট মিডিয়াম: বোলার মোটামুটি ১৩০-১৪০/১৪৫ কিমি/ঘন্টা বেগে বল করে। গ্লেন ম্যাকগ্রা,ওয়াসিম আকরাম,জেমস এন্ডারসন,চামিন্দা ভাস,জশ হ্যাজেলউড,শন পলোক,রুবেল হোসেন  এই ক্যাটাগোরির উদাহরণ।

 মিডিয়াম ফাস্ট: এই বোলারদের রেঞ্জ হলো এভারেজ ১২০-১২৯ কিমি/ঘন্টা। বর্তমানের মাশরাফি(আগের মাশরাফি  না, আগের মাশরাফি  ফাস্ট মিডিয়াম ক্যাটাগোরির), ভারতের হয়ে কিছুদিন খেলা মোহিত শর্মা  ও এই ক্যাটাগোরিতে পড়ে।

ভালো কথা, অনেক ক্রিকেট এনালিস্টরা ফাস্ট মিডিয়াম এবং মিডিয়াম ফাস্টকে একই ক্যাটাগরির মনে করেন। এবং, একটার পরিবর্তে আরেকটা ব্যবহারও করে থাকেন। মানে ব্যাপারটাতে কিঞ্চিত  বিতর্ক আছে।

মিডিয়াম: এর নীচে অর্থাৎ গড়ে ১২০ কিমি/ঘন্টা বা নীচে হলে তাদের মিডিয়াম  বোলার  বলে।যেমনঃমার্ক এলহাম,জেমস হোপস,এন্ড্রু সাইমন্ডস  ।

ফাস্ট: যাদের বেগ মোটামুটি ১৪৫ এর উপরে বা ১৫০ এর আশেপাশে তাদেরকেই বেসিকালি ফাস্ট  বোলার বলে। ডেইল স্টেইন,মিচেল জনসন,স্টিভেন ফিন,শেন বন্ড  এই ক্যাটাগোরিতে পড়ে।

উল্লেখ্য এখানে আমি এভারেজ বা গড় কথাটা বেশ কয়েকবার বলেছি। এখন আপনি ফাস্ট মিডিয়াম বোলার হয়ে যদি স্লোয়ার বল করেন ১১৮ তে, তাহলে তো আর আপনি মিডিয়াম বোলার হয়ে যাবেন না, তাই না?

আল্ট্রা ফাস্ট: আরও কিছু আছে,যারা মোটামুটি ১৬০ এর মাইলস্টোন ওঠাতে পারে। এদেরকে অনেকে আল্ট্রা ফাস্ট হিসেবে ক্যাটাগোরাইজ করে(যদিও এদের নামের পাশে ফাস্টই লেখা থাকে)। ব্রেট লি,মিচেল স্টার্ক,শোয়েব আকতার,শন টেইট  এরা এই ক্যাটাগোরিতে পড়ে।

আজ পর্যন্ত সবচেয়ে ইন্টারন্যাশনাল লেভেলে ফাস্টেস্ট বল  শোয়েব আকতারের ,১৬১.৩ কিমি/ঘন্টা। যদিও এক আইপিএল ম্যাচে মরনে মরকেল  ১৭৩.৯ কিমি/ঘন্টা তুলেছিল, দুঃখের বিষয় বলটা ওয়াইড ছিল! একটু আগে যা বলছিলাম, মরকেল  মূলত ফাস্ট মিডিয়াম বোলার, কিন্তু এটা আল্ট্রা ফাস্ট ডেলিভারি ছিল। এইজন্য কখনও পিক স্পিড অথবা লো স্পিড দেখতে নেই, এভারেজ স্পিড দেখতে হয়।

ম্যাথমেটিকালি কিছুটা ধারণা দেওয়া যায় ফাস্ট বোলিং কতটা দ্রুত। ১৪০ কিমি/ঘন্টা একটা বল মিটার পার সেকেন্ডে কনভার্ট করলে ৩৮ মি/সে হয়।পপিং ক্রিজের দৈর্ঘ্য মোটামুটি ২০ মিটার হয় ( ২২ গজ)।মানে আপনাকে সেকেন্ডের অর্ধেক সময়ে বলটাকে জাজ করে, রিএক্ট করে ডিসিশন নিতে হয় কিভাবে খেলবেন! এটা তো শুধু ১৪০ ছিল, এখন কল্পনা করুন শোয়েব আকতার  ১৫০ কিমি/ঘন্টাতে এগিয়ে আসছেন আর বাউন্সার ডেলিভার করছেন, ভয়ংকর না বিষয়টা?

ফাস্ট বোলিং এর প্রাইমারি থিং হলো গ্রিপ। গ্রিপ অনেকে অনেক ভাবে ইউজ করে। মোটামুটি ইনডেক্স আর মিডল ফিঙার উপরে আর থাম্ব নীচে, এইটা কমন গ্রিপ। যদিও শোয়েব-আকরাম-ইউনুস  ত্রয়ী থাম্ব ইউজ করতেন না, তাদের ভাষ্য ছিল জাস্ট দুই ফিঙার দিতে কন্ট্রোল করতে পারলে রিস্ট দিয়েই সুইং করানো যায়, কন্ডিশন ইকুয়েশনের বাইরে রেখে, এখন এইটা কতটা সত্যি আমি জানি না। গ্রিপ জিনিসটা ইন্ডিভিজুয়াল, তাই এটা নিয়ে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই।

শোয়েব-আকরাম-ইউনুস গ্রিপ

একটু টপিকের বাইরে গিয়ে একটা কথা বলি। ফাস্ট বোলাররা দেখবেন স্বাভাবিকতই উগ্র হয়, এটা হওয়ারও যুক্তি আছে। এই আগ্রাসন আর শর্ট বল করার দক্ষতা দিয়েই ওয়েস্ট ইন্ডিজ পেস লাইন আপ ক্রিকেট-বিশ্বে মূর্তিমান আতঙ্ক ছিল। এই ত্রাশ বিষয়টা কতটা জরুরী তার একটা গল্প আছে, হোয়াইট লাইটনিং খ্যাত এলান ডোনাল্ড  ছিলেন নিতান্ত ভদ্রলোক,আগ্রাসনটা ঠিক আসত না। তাই একজন বললেন তাকে সানস্ক্রিন ব্যবহার করতে, নাহ এর কারণ ত্বক রক্ষা করা নয় বরং আতঙ্ক বিষয়টা যাতে ফুটে ওঠে। এই ত্রাশের সর্বশেষ উদাহরণ জনসন । ক্রিকেট যে মেন্টাল ব্যাটল, কথাটার অন্তর্নিহিত মর্ম আছে।
 
হোয়াইট লাইটনিং এলান ডোনাল্ড

টপিকে ফিরি,গ্রিপের পরে আসে রান আপ করে একশন।একশন জিনিসটা নিয়ে একটু বলার ইচ্ছা আছে।

একশন আর্মের হাইটের উপর ভিত্তি করে প্রকার।

১.ওভার আর্ম

২.আন্ডার আর্ম

৩.রাউন্ড আর্ম

 

ওভার আর্ম: যে একশনে বোলারের হাত ডেলিভারির টাইমে শোল্ডার হাইটের  বা কাঁধের উপরে থাকে।এখনকার বেশির ভাগ বোলাররাই এই একশন ইউজ করে। গ্লেন ম্যাকগ্রা,জেমস এন্ডারসন,ব্রেট লি এগুলোর আদর্শ উদাহরণ।
 

ওভার আর্ম একশন: গ্লেন ম্যাকগ্রা

আন্ডার আর্ম: এই বোলারের হাত কোমারের নীচে মানে ওয়েস্ট হাইট  এর নীচে থাকে। এই একশন আর প্রচলিত নয়।

এইটা ৮১ এর কুখ্যাত ইন্সিডেন্টের পরে ব্যানড হয়ে যায়।বেনসন হেজেসের ওয়ার্ল্ড সিরিজে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড ম্যাচে কিইউদের শেষ বলে ৬ প্রয়োজন ছিল।গ্রেগ চ্যাপেলের ক্যাপ্টেন্সিতে ট্রেভর চ্যাপেলের ফাইনাল বল আন্ডারআর্ম একশনে করে যাতে ছয় না মারতে পারে,কিন্তু হাস্যকর ব্যাপার ওই সময় নাম্বার টেন ব্যাটসম্যান(মানে বোলার আরকি) ম্যাককিনি ছিল।এই কুখ্যাত ঘটনার পর আন্ডারআর্ম ব্যানড হয়।
 

https://www.youtube.com/watch?v=sGHScrCxF6Y
 

রাউন্ড আর্ম: আর ডেলিভারির টাইমে যদি বোলারের হাত ওয়েস্ট হাইট  আর শোল্ডার হাইটের মাঝামাঝি থাকে তাহলে সেটা রাউন্ড আর্মমালিঙ্গা,টেইট,জনসন  এরা এই ক্যাটাগোরির পড়ে।


রাউন্ড আর্ম : মিচেল জনসন

রাউন্ড আর্মে কয়েকটা এডভান্টেজ থাকে:

১.ইয়োর্কার ভালো মারা যায়।

২.বাউন্সার/শর্ট বল আনপ্রেডিক্টেবল হয়। শর্ট বল কোন হাইটে উঠবে এইটা এন্টিসিপেট করা টাফ হয়। ঠিক এই অস্ত্রকে ব্যবহার করে মিচেল জনসন নাকানি-চুবানি দেন ইংল্যান্ডকে ১৩-১৪ এর এশেজে।

৩.বেশি স্পিড তোলা সম্ভব হয়।

আপাতত এইখানে ইস্তফা দিচ্ছি।এর পরের পার্টে ভেরিয়েশন নিয়ে, ভালো লাগলে পড়ার আমন্ত্রণ থাকল।

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন